পর্যটন কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত

নাগরিক জীবনের শতব্যস্ততার মধ্যে একটু ছুটি মিললেই অনেকেই ছুটে যান সাগর-পাহাড়-অরণ্য ও ঐতিহ্যের সানি্নধ্যে। ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্তি্বক স্থানগুলোও মুখরিত হয় পর্যটক দর্শনার্থীদের পদভারে। এবার ঈদের ছুটিতেও পর্যটকরা ভিড় করবেন কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান কিংবা সাগরকন্যা কুয়াকাটায়। এসব দর্শনীয় স্থানও পর্যটকদের বরণ করতে ইতিমধ্যে সেরে নিয়েছে সাজসজ্জা। এরই মধ্যে বেশির ভাগ হোটেল-মোটেল আর বাংলোর রুমও বুকড হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। পর্যটন স্পটগুলো নিয়ে প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন কক্সবাজার থেকে আবু তাহের, রাঙামাটি থেকে সত্রং চাকমা, বান্দরবান থেকে উজ্জ্বল তঞ্চঙ্গ্যা এবং কুয়াকাটা থেকে খান এ রাজ্জাক। লাখো পর্যটকের পদভারে মুখর হবে কক্সবাজার ঈদের ছুটিতে লাখো পর্যটককে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত কক্সবাজার। পর্যটকদের বরণ করতে সৈকত নগরীর ৪ শতাধিক হোটেল-মোটেল-গেস্ট হাউস প্রস্তুত। এবারের ঈদের ছুটি দিয়েই কক্সবাজারে পর্যটন মৌসুম শুরু হচ্ছে বলে আশা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। কক্সবাজার সৈকতের মোটেল লাবণীর ম্যানেজার রাশেদুল হক খান জানান, ‘এবারে ঈদের পরদিন থেকে ৫ দিন পর্যন্ত মোটেলের সব কক্ষ অগ্রিম বুকিং হয়ে গেছে। আশা করছি এবারের ছুটিতে লাখো পর্যটকের সমাবেশ হবে কক্সবাজারে।’ কক্সবাজার হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সভাপতি ওমর সুলতান জানিয়েছেন, মঙ্গলবার পর্যন্ত প্রায় ৭০ ভাগ রুম বুকিং হয়েছে। তারকা মানের হোটেল ওশান প্যারাডাইসের ভারপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার মো. শাহেদ আলম জানান, বিগত তিন পর্যটন মৌসুমে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে কক্সবাজার ভ্রমণ করতে পারেনি পর্যটকরা। এখন পরিস্থিতি ভালো থাকায় ঈদের পরে রেকর্ড পরিমাণ পর্যটক আসবে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে হোটেল মোটেল ও গেস্ট হাউস মালিক এবং পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের নিয়ে বৈঠক করেছে প্রশাসন। পর্যটকের কাছ থেকে হোটেল-মোটেলগুলোতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় না করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কক্সবাজারের পুলিশ সুপার শ্যামল কুমার নাথ জানান, কক্সবাজারে পর্যটকের নিরাপত্তায় জেলা পুলিশ ও নবগঠিত টুরিস্ট পুলিশ প্রস্তুত রয়েছে। দর্শনীয় স্থান ও বিপণিকেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হবে। সমুদ্রের উন্মাদনায় মিলবে পর্যটকরা বর্ণিল সাজবেশে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সাগরকন্যা কুয়াকাটা। দর্শনীয় স্থানের নৈসর্গিক দৃশ্যের সঙ্গে পর্যটকরা বালিয়াড়িতে আছড়েপড়া বঙ্গোপসাগরে রাশি রাশি ঢেউ সমুদ্রের চিরাচরিত স্বভাব গর্জনসহ তরঙ্গের উন্মাদনায় মিলিত হবেন। ঈদের দিন পটুয়াখালী ও পার্শ্ববর্তী বরগুনা জেলার দর্শনার্থীরা কুয়াকাটায় পেঁৗছবেন। পরের দিন ঢাকা, কুষ্টিয়া, খুলনা, যশোর, বাগেরহাট, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সপ্তাহজুড়ে পর্যটক এসে কুয়াকাটায় অবস্থান করবেন। এর কারণ হিসেবে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সড়ক পথে ভালো যোগাযোগ, আবহাওয়ায় অনুকূল পরিবেশ, ফেরি পারাপারে দুর্ভোগ লাগব এবং সর্বোপরি সমুদ্রের আসল রূপ দেখার জন্য পর্যটকরা এ সময়কে কাজে লাগাবেন বলে মনে করছেন আবাসিক হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও কুয়াকাটা গেস্ট হাউসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোতালেব শরীফ। সূত্র জানিয়েছে, ঈদের সম্ভাব্য তারিখ শনিবার ধরে অভিজাত হোটেল বিচ হ্যাভেন, কুয়াকাটা ইন, বনানী, নীলাঞ্জনাসহ একাধিক আবাসিক হোটেলে দুই-তিন দিনের আগাম বুকিং দিচ্ছেন পর্যটকরা। বুকিংয়ের ক্ষেত্রে অভিজাত হোটেলের মধ্যে এগিয়ে রয়েছে কুয়াকাটা ইন ইন্টারন্যাশনাল, কুয়াকাটা গেস্ট হাউস, বনানী প্যালেস, মোহনা, বিচ হ্যাভেন, নীলাঞ্জনা, স্কাই প্যালেস, গ্রেভার ইন, বিশ্বাস সি-প্যালেস, সি-ভিউ। পিছিয়ে নেই সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত সরকারি বাংলোগুলো। এসবের মধ্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাংলো ধানসিড়ি, জেলা পরিষদের বাংলো, এলজিইডি ও বিটিসিএল বাংলোয় ঈদ- পরবর্তী এক সপ্তাহের বুকিং রয়েছে। স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীদের ধারণা, সবকিছু অনুকূলে থাকলে ঈদ-পরবর্তী এক সপ্তাহে কুয়াকাটায় লক্ষাধিক পর্যটকের সমাগম ঘটবে। এসব বিষয়ে সৈকতে বেঞ্চ ও ছাতা ব্যবসায়ী নুর হোসেন বলেন, বিগত বছরগুলোতে দেশে রাজনৈতিক সংঘাত ছিল। এ বছর নেই বলে নির্বিঘ্নে পর্যটকরা কুয়াকাটায় আসতে পারবেন। কুয়াকাটায় বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত আবাসিক হোটেল ব্যবসায়ীদের সংগঠন হোটেল মোটেল ওনার্স অ্যাসেসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, ভবিষ্যতে কুয়াকাটার পর্যটক ব্যবসায়ীদের জন্য সিজন- অফসিজন বলতে কিছুই থাকবে না। বছরজুড়ে পর্যটকদের উপস্থিতি থাকবে কুয়াকাটায়। বাংলাদেশ পর্যটক করপোরেশনের ব্যবস্থাপনায় কুয়াকাটায় পরিচালিত আবাসিক হোটেল হলিডে হোমস ও যুব পান্থনিবাসের ইউনিট ব্যবস্থাপক মো. আজাহারুল ইসলাম জানিয়েছেন, পর্যটকরা ওয়েবসাইট ও টেলিফোনে যোগাযোগ করছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে হয়ত পর্যটকদের সমাগম ঘটবে। টুরিস্ট পুলিশ কুয়াকাটা জোনের এএসপি মীর ফসিউল আলম বলেন, ঈদ-পরবর্তী অগণিত পর্যটকের সমাগমের কথা চিন্তা করেই টুরিস্ট পুলিশের পক্ষ থেকেই কুয়াকাটায় নিরাপত্তার সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সৌন্দর্যের রানী বান্দরবান পর্যটনের অপেক্ষায় এখন শ্রাবণ মাস। মেঘ, বৃষ্টি, নীলাকাশ আর উঁচু পাহাড়। এই চার সম্মিলনে অপরূপ সুন্দরের দেখা মেলে সৌন্দর্যের রানী বান্দরবানে। অন্যদিক ঈদের আনন্দ। তাই এবার ঈদের ছুটিতে সৌন্দর্যের রানী বান্দরবানের পর্যটন স্পটগুলোতে পর্যটকদের ভিড় জমে যাবে এমনটিই আশা করছেন হোটেল মালিক, গাড়িচালক ও দোকানদারসহ সংশ্লিষ্টরা। হোটেল, মোটেল, রেস্ট হাউস মালিক সমিতি জানিয়েছে, ঈদের পরদিন থেকে আগামী এক সপ্তাহ পর্যন্ত প্রায় ৬০ ভাগ রুম বুকিং হয়ে গেছে। এখন শুধু পর্যটক আসার পালা। হোটেল, মোটেল, রেস্ট হাউস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, সমিতির অধীনে ৪৫টি হোটেল, মোটেল ও রেস্ট হাউস আছে। বেশিরভাগ হোটেলগুলোতে ৬০ ভাগ বুকিং হয়েছে। হোটেলগুলোতে সাড়ে তিন হাজার লোকের জন্য সুব্যবস্থা রয়েছে। এবার ঈদে আগের রাজনৈতিক সহিংসতার সময়কার ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নিতে পারবেন। জিপ, কার, মাইক্রো, বাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. আবুল কাশেম বলেন, বেশিরভাগ চালক ও হেলপার বেকার ছিল। তেমন একটা আয়-রোজগার হয় না। আশা করছি এবার ঈদে মানুষের বিশাল সমাগম হবে। এ জন্য পর্যটকদের হয়রানি কিংবা বেশি ভাড়া আদায় না করার জন্যও চালকদের বলে দেওয়া হয়েছে। পর্যটন সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দেশের অন্যান্য জেলার চেয়ে বান্দরবান জেলায় প্রচুর পর্যটন স্পট রয়েছে। নীলাচল, নীলগীরি, স্বর্ণ জাদি, রাম জাদি, মেঘলা, চিম্বুক, শৈল প্রপাত, রিজুক ঝর্ণা, জাদিপাই ঝর্ণা, বগালেক, কেওক্রাডং, তাজিংডং, বংড (বড় পাথর) তিন্দু, রেমাক্রি, ছোট ও বড় মদক, বাংলার নায়াগ্রা নামে খ্যাত নাপাকুম জল প্রপাত, উঁচুনিচু, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথের সৌন্দর্যসহ আরও অনেক পর্যটন স্পট রয়েছে। নিকটে ও দূরে অবস্থিত পর্যটন স্পটগুলো পর্যটকদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করে। এদিকে বর্ষা মৌসুম হওয়ায় স্থানীয় থানচি উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে থানচিতে পর্যটকদের ভ্রমণে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। থানচি উপজেলা চেয়ারম্যান ক্যহ্লাসিং মার্মা বলেন, সাঙ্গু নদীর উজান বেয়ে পর্যটন স্পটগুলোতে যাওয়া পর্যটকদের প্রাণের ঝুঁকি রয়েছে। তাই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। জেলা পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ঈদের ছুটিতে আসা পর্যটকদের আনন্দকে আরও আনন্দঘন করতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ পুলিশ প্রহরা বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক মিজানুল হক চৌধুরী বলেন, ঈদকে সামনে রেখে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সবাইকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাঙামাটিতে হোটেল-মোটেল বুকড় পর্যটকদের বরণ করতে প্রস্তুত পর্যটন শহর রাঙামাটি। দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকায় এবার ঈদের ছুটিতে শহরের হোটেল-মোটেল ও গেস্ট হাউসগুলোতে অধিকাংশ রুম বকুড হয়েছে। পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, গত বছরের তুলনায় এ বছর তারা ভালো আয় করতে পারবেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভ্রমণপিপাসু পর্যটকরা প্রতি বছর প্রকৃতির রানী রাঙামাটির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে ছুটে আসেন। এ বছর বর্ষা মৌসুমে রাঙামাটির প্রকৃতি নতুন রূপে সেজেছে। শুভলং ঝর্ণা তার পুরনো রূপ ফিরে পেয়েছে। তাই সবমিলিয়ে পর্যটকরা এ বছর রাঙামাটির প্রকৃতির সৌন্দর্য অপন মনে উপভোগ করতে পারবেন। রাঙামাটি পর্যটনের আকর্ষণীয় স্পটের মধ্যে রয়েছে পর্যটনের ঝুলন্ত সেতু, শুভলংয়ের মনোমুগ্ধকর ঝর্ণা, রাজবন বিহার, জেলা প্রশাসনের বাংলো, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফের সমাধিসৌধ, বালুখালী কৃষি খামার, টুকটুক ইকোভিলেজ, সাংপাং রেস্টুরেন্ট এবং আদিবাসী শান্ত সবুজ গ্রাম ও তাদের জীবনযাত্রা। এ ছাড়া রাঙামাটি শহরের বাইরে বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকের মনোরম পর্যটন স্পট, কাপ্তাই উপজেলায় কর্ণফুলী নদীর তীরে গড়ে ওঠা আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, কর্ণফুলী পেপার মিলস ও কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান ইত্যাদি। রাঙামাটি হোটেল ও মোটেল মালিক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক ও হোটেল প্রিন্সের স্বত্বাধিকারী নেসার আহম্মেদ জানান, দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক বিরাজ করায় অন্যান্য বছরের তুলানায় এ বছর রাঙামাটিতে প্রচুর পর্যটকের আগমন ঘটবে। ইতিমধ্যে তার হোটেলের ৭৫ ভাগ রুম অগ্রিম বুকড হয়েছে। এ ছাড়া শহরের অন্যান্য হোটেলে ও মোটেলের প্রায়ই রুম বুকড হয়েছে। রাঙামাটি সরকারি পর্যটন কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা জানান, ৮ কোটি ৬০ লাখ টাকার ব্যয়ে নির্মিত ও মনোরম পরিবেশে তিন তারকা মানের নতুন রাঙামাটির পর্যটন মোটেলের সব রুম ১৯-২৪ জুলাই পর্যন্ত অগ্রিম বুকড হয়ে গেছে। জেলা পুলিশ সুপার সাঈদ তারিকুল হাসান বলেন, ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের জন্য বিভিন্ন স্পটে পুলিশি টহলের ব্যবস্থা করা হয়েছে।