ব্যবসায় ফিরছে পর্যটন খাত

টানা ২ বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর এবার সুদিন ফিরছে পর্যটন শিল্পে। আসছে মৌসুমে কোনো ধরনের অস্থিরতা না থাকায় এই পেশা ছেড়ে যাওয়াদের অনেকেই ফিরে আসছেন নতুন উদ্যোমে। ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, গত ২ বছরের ব্যবসার ক্ষতি পুষিয়ে আসবে তাদের।
পর্যটন খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েক বছর টানা অস্থিরতায় পর্যটন ব্যবসায় মারত্মক সংকটে ছিল। ওই সময় দেশের প্রধান প্রধান পর্যটন অঞ্চলে পর্যটন ছিল প্রায় নির্বাসিত। বিভিন্ন হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টে আকর্ষণীয় ছাড় দিয়েও সেই সময় কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। তবে এবার চিত্র ভিন্ন। সাধারণত অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যটনের মৌসুম হলেও এবার ব্যবসায়ীদের প্রস্তুতি চলছে অনেক আগে থেকেই। রমজানের ঈদকে ঘিরেই এবার প্রায় ২ মাস আগে থেকেই ব্যবসায় নামছেন তারা। এই ঈদে তাদের ব্যবসায় অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে ভালো হবেই মনে করেন তারা। এই ঈদেই প্রায় ২৫০-৩০০ কোটি টাকার ব্যবসার স্বপ্নও দেখেছেন তারা।
এ বিষয়ে পর্যটনের রাজধানী কক্সবাজার হোটেল-মোটেল-গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম সিকদার যায়যায়দিনকে বলেন, গত তিন মৌসুম পর্যটন খাতে ধস নামে। এবার পরিস্থিতি স্বাভাবিক। তাই ঈদের পর পর্যটন মৌসুমকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে ২ শতাধিক হোটেল এবং গেস্ট হাউস ও কটেজ সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৯০ ভাগ হোটেলের সিট অগ্রিম বুক হয়েছে। নামি হোটেলগুলোতে কোনো সিটই খালি নেই। ঈদের এক সপ্তাহ কক্সবাজারে প্রায় আড়াই লক্ষ্যাধিক পর্যটকের সমাগম হবে। আবহাওয়া যদি অনুকূল থাকে বা বেশি ঝড়-বৃষ্টি না থাকে তাহলে এবারের ঈদে কক্সবাজারের আবাসিক খাতেই অর্ধশত কোটি টাকার লেনদেন হবে। পুরো কক্সবাজারের পর্যটন খাত মিলে সেটা শত কোটি ছাড়িয়ে যাবে। তবে কক্সবাজারে আরো বেশি পর্যটক আকর্ষণে এখানকার রুটে আরো বেশি বিমান চলাচলের পাশাপাশি বিমানের ভাড়াও সহনীয় রাখতে সরকারের প্রতি আবেদন জানান তিনি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণত প্রতিবছর ঈদে একটি লম্বা ছুটি মেলে। ভ্রমণ-পিপাসুরা এ সময়ের অপেক্ষায় থাকেন। তাই ঈদের ছুটির সঙ্গে বাড়তি কয়েক দিনের ছুটি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন দেশ ভ্রমণে। তাই এই ছুটিকে কেন্দ্র করে ঈদের আগে ও পরে লাখো পর্যটকের আনাগোনায় মুখর হয়ে উঠে কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, সুন্দরবন, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, কুয়াকাটা, সিলেটসহ দেশের দর্শনীয় স্থান। আসছে ঈদেও দর্শনার্থী বরণে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে পর্যটন সংশ্লিষ্টরা। ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড় হবে_ এমন আশা তাদের।
ঈদ উপলক্ষে হোটেল-মোটেল এবং ছোট বড় কটেজগুলোর রং পাল্টানোসহ নতুন রূপে সেজেছে। নতুন আসবাবপত্র বসানো, দেয়ালের পুরনো রংয়ের জায়গায় সোভা পাচ্ছে নতুন প্লাস্টিক পেইন্ট। রেস্তোরাঁগুলোতেও শেষ হয়েছে ধোয়ামোছা ও রং লাগানোর কাজ। বিভিন্ন পর্যটন শহরের আবাসিক হোটেল-মোটেল অগ্রিম বুকিং হয়ে গেছে। কোথাও রুম খালি নেই আর। সরকারি সার্কিট ও রেস্ট হাউসগুলোতেও বুকিংয়ে পূর্ণ। সম্প্রতি ইতোমধ্যেই এই পর্যটন নগরীর কক্সবাজার উন্নয়নে আলাদা কর্তৃপক্ষও গঠন করা হয়েছে। তাই পর্যটন রাজধানী কক্সবাজারেই শত কোটি টাকার ব্যবসায় সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
কক্সবাজার : ঈদ ও ঈদের সবচেয়ে বেশি পর্যটকের অনাগোনা থাকে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ এই সমুদ্র সৈকতটি এ সময় হয়ে ওঠে লোকে-লোকারণ্য। ঈদে এখানকার ২ শতাধিক হোটেল এবং গেস্ট হাউস ও কটেজ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠে। তাই কক্সবাজারের মহেশখালী, হিমছড়ি, ইনানী, দরিয়ানগর ও বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কসহ স্পটগুলো সেজেছে নতুন করে। বার্মিজ মার্কেটগুলোতে বিভিন্ন রকমের পণ্যের সমাহার নিয়ে পর্যটকদের অপেক্ষায় দোকানিরা। শহরের কলাতলী ও লাবনি পয়েন্টসহ আশপাশের হোটেল-মোটেল জোনের বেশিরভাগ হোটেল-মোটেল, গেস্ট হাউস, কটেজ, অ্যাপার্টমেন্ট ও রেস্ট হাউস সংস্কার, ধোয়া-মোছা ও রঙ করার কাজ শেষ হয়েছে।
এদিকে গত ৬ জুলাই পর্যটন নগরী কক্সবাজার উন্নয়নে আলাদা কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছে। এদিন কক্সবাজারকে আধুনিক পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে ‘কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন’২০১৫ খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। কক্সবাজার পর্যটন নগরী হওয়ায় এখানের উন্নয়নে কাজ করবে এই কর্তৃপক্ষ। কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করার লক্ষ্যে স্থানীয় পৌর মেয়র, স্থানীয় প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা এই কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সম্পৃক্ত হবেন। এই কর্তৃপক্ষ কক্সবাজার এলাকা জরিপ, সমীক্ষা, তথ্য সংগ্রহ, মাস্টার প্ল্যান তৈরি এবং বাস্তবায়নের পাশাপাশি নগর পরিকল্পনায় অংশ নেবেন।
সেন্টমার্টিন : পর্যটক বরণে প্রস্তুত দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। ঈদকে সামনে রেখে এবার লাখো পর্যটক আশা করছেন ব্যবসায়ীরা। ইতোমধ্যে হোটেল-মোটেল ও কটেজে ৭০ শতাংশ রুম বুকিং হয়ে গেছে। দ্বীপটির বেশি ভাগ লোকজন পর্যটক ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। পর্যটকদের আগমনকে কেন্দ্র করে হোটেল-মোটেল ও কটেজ থেকে শুরু করে সমুদ্র এলাকায় ছাতা এবং পর্যটক-নির্ভর সব ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানকে নবরূপে সাজানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
কুয়াকাটা : একই সমুদ্র সৈকত থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার অপূর্ব অভিজ্ঞতা পৃথিবীর খুব কম দেশের মানুষের ভাগ্যেই ঘটে। কুয়াকাটায় সে সুযোগ পাবেন ভ্রমণ-পিয়াসীরা। এর বাইরে গঙ্গমতিচর, ফাতরার বন (সুন্দরবনের সংস্করণ), মিশ্রিপাড়ার বৌদ্ধমন্দির (এখানে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বৌদ্ধমূর্তি সংরক্ষিত আছে), রাখাইন পল্লী, শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধবিহার, শুঁটকি প্রক্রিয়াকরণ ইত্যাদি কুয়াকাটার অন্যতম আকর্ষণ।