পোশাক কারখানা এখন আর দর্জির দোকান নয়

মূল্য সংযোজন এখন ৭৫ শতাংশের বেশি : বাংলাদেশ ব্যাংক

গেল শতাব্দীর আশির দশকের শুরুতে বাংলাদেশ যখন পোশাক রপ্তানি শুরু করে তখন শুধু সেলাইয়ের কাজটি এ দেশে হতো। কাপড়, সুতা, বোতাম-এমনকি পলিব্যাগের মোড়কটিও আমদানি করা হতো বিদেশ থেকে। ফলে পোশাক রপ্তানি করে ১০০ ডলার আয় করলে তার ৭৫ ডলার আবার বিদেশে চলে যেত কাঁচামাল আমদানির খরচ মেটানোর জন্য। অবশ্য দিন বদলে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পোশাক খাতে এখন মূল্য সংযোজন ৭৫ শতাংশের বেশি এবং সেটা প্রতিবছর কিছু কিছু হারে বাড়ছে। অর্থাৎ, এখন ১০০ ডলারের পোশাক রপ্তানি করলে ৭৫ ডলারই দেশে থাকছে, ২৫ ডলার খরচ হচ্ছে কাঁচামাল আমদানির জন্য।

পোশাক তৈরির মূল উপকরণ হলো তুলা। তুলা থেকে সুতা তৈরি হয়। সুতা দিয়ে তৈরি হয় কাপড়। সেই কাপড় সেলাই করে তৈরি হয় বিভিন্ন ধরনের পোশাক। শুরুর দিকে শুধু সেলাইয়ের কাজটিই বাংলাদেশে হতো। এ জন্য পোশাক কারখানাকে দর্জির দোকান বলা হতো। সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানও একবার পোশাক কারখানাকে দর্জির দোকান নামে অভিহিত করেছিলেন।

রপ্তানিকারকরা বলছেন, এখন সুতা তৈরি, কাপড় তৈরি, রং করা, সেলাই, অ্যাক্সেসরিজ তৈরি, ধোয়া, মোড়কজাতকরণ, মোড়ক তৈরি-সব কিছুই হয় বাংলাদেশে। অবশ্য ওভেন পোশাক তৈরির বিভিন্ন ধরনের কাপড় ও সামান্য কিছু অ্যাক্সেসরিজ বাংলাদেশকে আমদানি করতে হয়। আমদানির পরিমাণ কমে যাওয়ায় মূল্য সংযোজন বাড়ছে বলেও জানান তাঁরা।

পোশাক কারখানা এখন আর দর্জির দোকান নয়

পোশাক রপ্তানিকারকদের সমিতি বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও এনভয় গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুস সালাম মুর্শেদী কালের কণ্ঠকে বলেন, আগে আমরা শুধু সেলাই করার খরচটা পেতাম। এখন সুতা ও কাপড় তৈরি, অ্যাক্সেসরিজ তৈরি, সেলাই করা, এমব্রয়ডারি করা, ধৌত করা-উৎপাদনের সব পর্যায়ে মূল্য সংযোজন করি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘পোশাক খাতের ত্রৈমাসিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন : জানুয়ারি-মার্চ ২০১৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে পোশাক খাতে বিভিন্ন বছরে মূল্য সংযোজনের হার দেওয়া হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে ‘ব্যাক টু ব্যাক’ ঋণপত্রের মাধ্যমে কাঁচামাল আমদানি ও মোট রপ্তানি আয়ের পার্থক্যকে মূল্য সংযোজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে পোশাক খাতে কাঁচামাল আমদানিতে ৩৩২ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে। এর বিপরীতে রপ্তানি আয় হয়েছে এক হাজার ২৩৫ কোটি ডলার। ফলে মূল্য সংযোজন হয়েছে ৭৩.১২ শতাংশ। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত পোশাক খাতে কাঁচামাল আমদানি হয়েছে ৪৬৩ কোটি ডলার। এর বিপরীতে রপ্তানি আয় হয়েছে এক হাজার ৮৬৩ কোটি ডলার। মূল্য সংযোজন ৭৫ দশমিক ১৫ শতাংশ।

রপ্তানিকারকরা বলছেন, দেশে পোশাক খাতে বেশি মূল্য সংযোজন সম্ভব হয়েছে দেশে টেক্সটাইল ও নিট কম্পোজিট মিল গড়ে ওঠায়। আগে প্রায় সব কাপড়ই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো। এখন নিট পোশাকের প্রায় সব কাপড় দেশে তৈরি হয়। তবে ওভেন পোশাকের ৭০ শতাংশ কাপড়ই আমদানি করতে হয়। ৯৫ শতাংশ অ্যাক্সেসরিজ দেশে তৈরি হওয়ায় পোশাক খাতে মূল্য সংযোজন বেড়েছে।

আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, ‘এক সময় আমরা এক ডলার খরচে পোশাক ধৌত করতে বিদেশে পাঠাতাম। এখন ধৌত করার জন্য ১৫ ডলার পাই। একসময় আমি কার্টনটাও বিদেশ থেকে আমদানি করতাম। এখন প্রায় সব কিছুই দেশে তৈরি হয়। এভাবেই মূল্য সংযোজন বেড়েছে।’ বোতাম, জিপারসহ গার্মেন্ট অ্যাক্সেসরিজের সবই এখন দেশে তৈরি হয় বলে উল্লেখ করে বাংলাদেশ করোগেটেড কার্টন অ্যান্ড অ্যাক্সেসরিজ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রাফেজ আলম চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, পোশাক খাতের অ্যাক্সেসরিজের ৯৫ শতাংশ বাংলাদেশে তৈরি হয়। ২০০০ সালের দিকে অ্যাক্সেসরিজ খাতে বাংলাদেশ বেশ ভালো অবস্থান তৈরি করে। এখন এক হাজার ৩০০ কারখানা অ্যাক্সেসরিজ তৈরি করছে। তিনি বলেন, এমন কিছু নেই যা বাংলাদেশে তৈরি হয় না। তবে ক্রেতাদের শর্ত ও কিছু কম চাহিদার অ্যাক্সেসরিজ পণ্য বিদেশ থেকে আমদানি হয়। এগুলোও দেশে তৈরি হতো, যদি তার চাহিদা বেশি থাকত। কম চাহিদা হলে উৎপাদন খরচ বেশি হয়। বাংলাদেশের পোশাক খাতের এখন বড় সমস্যা ওভেন কাপড়ের জন্য বিদেশনির্ভরতা।