সময় এখন আরো এগিয়ে যাওয়ার

শেষ ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে নয় উইকেটে উড়িয়ে দিয়ে নিশ্চিত হলো তাদের সঙ্গে প্রথম সিরিজ জয়, সঙ্গে দেশের মাটিতে টানা চার সিরিজ। তবে এখানেই অর্জনের শেষ দেখছে না বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। এই অসাধারণ সাফল্যকে পুঁজি করে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজার প্রত্যয় আরো সামনে এগিয়ে যাবার। বাংলাদেশের জন্য এটা হলো শত অর্জনের এক সিরিজ। প্রোটিয়াদের বিরুদ্ধে ২-১ ব্যবধানে জেতা সিরিজটিতে ব্যক্তিগত ও দলীয় বিচারে স্মরণীয় সব সাফল্যের বদৌলতে নিশ্চিতভাবেই এটা রঙিন হয়ে থাকবে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে।

 

সাকিব-মাশরাফির দু’শ’ উইকেটের মাইলফলক ছোঁয়া, সৌম্য সরকারের নিজেকে আলাদা করে চেনানো, প্রোটিয়াদের প্রথমবারের মতো ওয়ানডে সিরিজে হারানোর নজির গড়ার পাশাপাশি দেশের মাটিতে টানা চতুর্থ সিরিজ জিতলো বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। এসবের বাইরেও আছে ছোট-খাট আরো কিছু অর্জন। তবে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা সবচেয়ে বড় অর্জন বলে মনে করছেন নিজেদের চারিত্রিক দৃঢ়তা। জিততে জিততে জেতা নয়, হারতে হারতেও যে জেতা সম্ভব এই সিরিজে বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে তা। হারের শেকল ভেঙ্গে আবারো জয়ের ধারায় ফিরতে যে দৃঢ় মনোবল আর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রয়োজন, টাইগারদের এই দলে তার পুরোটাই আছে; সেই প্রমাণ মিললো এই সিরিজেই। মাশরাফি বড় করে দেখতে চাইছেন এ ব্যাপারটাকেই, ‘এটাকে আমি অসাধারণ এক ফেরা বলব। এটা আমাদের জন্য খুব দরকার ছিল।’

 

১৯৯৯ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত টানা ৪৭টি ওয়ানডে ম্যাচে হেরেছে বাংলাদেশ দল। সেখান থেকে একটা সময় মাঝে-মধ্যে ২-১টি ম্যাচ জেতা শুরু করল বাংলাদেশ। মাশরাফির নেতৃত্বে সেই বাংলাদেশ এখন জিতল টানা চারটি সিরিজ। হেলায় হারাল পাকিস্তান-ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকাকে!

 

জিম্বাবুয়েকে ৫-০-তে উড়িয়ে দেয়া। মাঝে বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে খেলা। এরপর পাকিস্তানকে ৩-০ হোয়াইটওয়াশ, ভারতকে ২-১ এবং সর্বশেষ শিকার প্রোটিয়ারা। ক্রিকেট বিশ্বের তিন পরাশক্তির বিরুদ্ধে এমন ধারাবাহিকতায় সন্তুষ্ট সতীর্থদের প্রিয় ‘ম্যাশ’ বলেন, ‘যখন বড় দলের সঙ্গে খেলছেন, প্রত্যাশা হয়ত বেশি থাকে। তখন জয়টা একরকম আনন্দের। বিশ্বকাপে ভালো খেলার ধারাবাহিকতা আমরা পাকিস্তানের বিপক্ষে ধরে রাখি। আর এই ধারাবাহিকতা আমরা ভারত সিরিজ হয়ে এই সিরিজ পর্যন্ত টেনে আনতে পেরেছি।’

 

মাশরাফি এটাকেই পথের শেষ মানতে নারাজ । দেশের সবচেয়ে অভিজ্ঞ এই পেসার, এবার দেখছেন এই সাফল্যকে ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ। তাই আনন্দের আতিশয্যে ভেসে না গিয়ে পা মাটিতেই রাখছেন তিনি। সতর্ক করে দিলেন সতীর্থদেরও, ‘একসময় আমরা স্বপ্ন দেখতাম, বড় বড় দলকে এভাবে হারাব। এখন সেটা পারছি। কিন্তু পেশাদার দল হিসেবে সবাইকে মাটিতে পা রাখতে বলব আমি। মাঠে বা মাঠের বাইরে সুশৃঙ্খল থেকে সবকিছু করতে বলব। কারণ, সামনে একের পর এক কঠিন চ্যালেঞ্জই আসতেই থাকবে।’ তবে সেই চ্যালেঞ্জে উের যাবার সামর্থ্য যে সাকিব-সৌম্যদের ভালোই আছে তার বড় প্রমাণ বিশ্বকাপের পর টানা তিন সিরিজ জয়। মাশরাফি মনে করিয়ে দিলেন সেটাও, ‘বিশ্বকাপে যাওয়ার পর আমি একটা কথা বলেছিলাম, যদি আমরা বিশ্বকাপে ভালো খেলি, তাহলে পুরো বছরের জন্য ঠিক হয়ে যাবে আমরা কি করব। বিশ্বকাপে ভালো খেলেছিলাম, সেই আত্মবিশ্বাস এই পর্যন্ত টেনে এনেছি। এখন চারটি টেস্ট ম্যাচ আছে (দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে)। আশা করি, ওয়ানডের এই জয়গুলো সেখানে ভালো করতে সহায়তা করবে।’

 

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতে ঢাকায় ৮ উইকেটে হারে বাংলাদেশ। পরের ম্যাচে একই ভেন্যুতে ৭ উইকেটে জিতে সিরিজ জয়ের সম্ভাবনা জাগিয়ে তোলে মাশরাফি বাহিনী। অতঃপর বুধবার চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডেটি ৯ উইকেটে জিতে আরো একটি পর্বতশৃঙ্গ মাড়ায় মাশরাফিরা। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে প্রথম সিরিজ জয় অধিনায়কের কাছে নিজেদের দৃঢ়তার প্রমাণ। কিন্তু সামনের চ্যালেঞ্জ মাথায় রেখেই হয়তো বরাবরের মতো নিজেদের উজ্জীবনী মন্ত্র ‘আমরা করবো জয়’ বাদে বেশি কিছু করেননি ‘আফ্রিকা বিজয়ীরা’। মাশরাফি নিজেই জানালেন সেটাও, ‘আমাদের উদযাপন সেভাবে হয় না। ড্রেসিংরুমে ‘আমরা করবো জয়’ গান হয়— এতেই শেষ আমাদের উদযাপন। অন্য দলগুলো অনেক কিছু করে। হয়তো রাতে একসঙ্গে বসে অনেক কিছু করে। আমাদের তেমন কিছু হয় না। যে যার যার রুমে চলে যায়।’