১৮৭ বছর ধরে দেশের বৃহত্তম ঈদের জামাত

সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন শোলাকিয়ায়

দেশের সর্ববৃহত্ ঈদ-উল ফিতরের জামাতের জন্য ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। ভারি বৃষ্টিপাত হলে পানি যাতে সঙ্গে সঙ্গে সরে যেতে পারে সেজন্য মাঠের মধ্যে ড্রেনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। গত তিনদিনের বর্ষণে প্রস্তুতি কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। কিশোরগঞ্জ সদর ইউএনও এবং ঈদগাহ পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আবু নাসের বেগ জানান, বৃষ্টিতে মুসল্লিদের নামাজ আদায়ে যেন ব্যাঘাত সৃষ্টি না হয় সেজন্য সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে মাঠের বিভিন্ন জায়গায় বালু ফেলা হয়েছে। স্থায়ী ওজুখানা ছাড়াও  মুসল্লিদের জন্য পুকুরের ওপর মাচা বেঁধে তিনটি ওজুখানার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ মাঠের চারিদিকে ৮টি নলকূপ স্থাপন করেছে। ভারি বর্ষণ না হলে মুসল্লিদের নামাজ আদায়ে কোন অসুবিধা হবে না। প্রতি বছরের ন্যায় এবারো এখানে সকাল ১০টায় ঈদ-উল ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হবে। এটি হবে শোলাকিয়া ঈদগাহে  ঈদ-উল ফিতরের ১৮৮তম জামাত।

 

শোলাকিয়া ঈদগাহের ইতিহাস

 

শহর থেকে আধা কিলোমিটার দূরে শহরের পূর্ব প্রান্তে নরসুন্দা নদীর তীর ঘেঁষে শোলাকিয়া ঈদগাহের অবস্থান। এই ঐতিহাসিক ঈদগাহের জমির পরিমাণ ৬ দশমিক ৬১ একর। এর পশ্চিম সীমারেখা উত্তর-দক্ষিণে ৩৩৫ ফুট, পূর্ব সীমারেখা উত্তর-দক্ষিণে ৩৪১ ফুট, উত্তর সীমারেখা পূর্ব-পশ্চিমে ৭৮৮ ফুট এবং দক্ষিণ সীমারেখা পূর্ব-পশ্চিমে ৯১৪ ফুট। মাঠের বাইরে রয়েছে একটি বড় পুকুর ও ওজুখানা। সব মিলিয়ে বর্তমানে জায়গার পরিমাণ ৭ একরের ওপরে। শোলাকিয়া সাহেববাড়ীর পূর্বপুরুষ শাহ সূফী সৈয়দ আহমেদ তার নিজস্ব তালুকি জমিতে প্রথম এই ঈদগাহ প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরবর্তীকালে হয়বত নগর দেওয়ান বাড়ির জমিদার দেওয়ান হয়বত দাদ খান ১৯৫০ সালে ঈদগাহের নামে মোট ৪ দশমিক ৩৫ একর ভূমি ওয়াক্ফ করে দেন। উক্ত ওয়াক্ফনামায় উল্লেখ করা হয়, ১৭৫০ সাল থেকে এই মাঠে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। জানা যায়, ১৮২৮ সালে জঙ্গলবাড়ীর জমিদার এই মাঠে নামাজ পড়তে শুরু করেন। তখন থেকে বড় জামাত শুরু হয় এবং তখন থেকেই জামাতের সাল গণনা শুরু হয়। সে হিসাব অনুযায়ী এবছর শোলাকিয়া ঈদগাহে  ঈদ-উল ফিতরের ১৮৮তম জামাত অনুষ্ঠিত হবে।

 

শোলাকিয়া নামকরণ

 

ঈদগাহের নামকরণ নিয়ে মতভেদ ও বিভিন্ন জনশ্রুতি রয়েছে। বর্তমানে ঈদগাহটি পৌরসভার শোলাকিয়া এলাকায় অবস্থিত। এলাকার নামানুসারেই ঈদগাহের নামকরণ করা হয়। শোলাকিয়া নামের উত্পত্তি নিয়ে বিভিন্ন জনশ্রুতি রয়েছে। দীর্ঘদিন আগে একবার এই ঈদগাহে নামাজে অংশগ্রহণকারী মুসল্লির সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার অর্থাত্ প্রায় সোয়া লাখ। মুসল্লিদের উপস্থিতির সংখ্যা সোয়া লাখ থেকে সোয়ালাখিয়া এবং উচ্চারণ বিবর্তনে পরবর্তীতে শোলাকিয়া নাম ধারণ করেছে। দ্বিতীয় জনশ্রুতি হলো- পাশ দিয়ে বয়ে চলা নরসুন্দা নদীটি একসময় ছিল খুবই গভীর এবং বেগবতী। এখানে একসময় একটি নৌবন্দর গড়ে উঠেছিল। এখান থেকেই বয়ে চলা দেশি-বিদেশি নৌযান থেকে শুল্ক আদায় করা হতো। শুল্ক থেকেই পরবর্তীতে শোলাকিয়া নামকরণ হয়েছে বলে অনেকের ধারণা। প্রচলিত আরেকটি জনশ্রুতি এরকম-মোঘল আমলে উক্ত এলাকায় পরগনার রাজস্ব আদায়ের জন্য একটি ডিহি বা অফিস ছিল। সে ডিহির অধীন পরগনার রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল সোয়া লাখ টাকা। সেই সোয়া লাখ থেকে পরবর্তীতে এই এলাকা শোলাকিয়া নামকরণ হয়।

 

ঈদগাহের বর্তমান হাল

 

দেশ ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বেও শোলাকিয়া ঈদগাহের পরিচিতি ছড়িয়ে পড়েছে। এটি পরিচালনার জন্য জেলা প্রশাসককে সভাপতি এবং সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সাধারণ সম্পাদক করে একটি পরিচালনা কমিটি রয়েছে। এই কমিটির কার্যক্রম শুধু ঈদকেন্দ্রিক হওয়ায় সারাবছর এই মাঠটির দিকে কোন নজর দেয়া হয় না। শুধু ঈদ আসার পূর্বে কমিটিকে সক্রিয় হতে দেখা যায়। আট-দশদিন আগে থেকে মাঠের পরিচর্যা শুরু হয়, মিম্বর ও চারদিকের দেয়ালে চুনকাম করা হয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি কোন পরিকল্পনা গ্রহণ এখনো পর্যন্ত চোখে পড়ে না। সারা বছরই মাঠটি গরু-ছাগলের বিচরণক্ষেত্র। সামান্য বৃষ্টি হলেই মাঠে পানি জমে থাকে।

 

ঈদ জামাতের ইমাম

 

১৮২৮ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম বড় জামাতে ইমামতি করেন শোলাকিয়া সাহেববাড়ীর সুফি সৈয়দ আহমদ। ১৯৭৫ সাল থেকে একাধারে ২৯ বছর ইমামতি করেছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলেম ও হয়বতনগর আলিয়া মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল খায়ের মোহাম্মদ নূরুল্লাহ। ২০০৪ সাল থেকে ঈদের জামাত পরিচালনা করেছেন বড়বাজার জামে মসজিদের খতিব মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ। ২০০৯ সাল থেকে ঈদের জামাতে ইমামতি করছেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সাবেক পরিচালক ও বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ। এবছরও তিনিই জামাতে ইমামতি করবেন।

 

ঈদের স্পেশাল ট্রেন

 

মুসল্লিদের আসা-যাওয়ার সুবিধার্থে ঈদের দিন বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ‘শোলাকিয়া এক্সপ্রেস’ নামে দু’টি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। একটি ট্রেন ময়মনসিংহ থেকে ভোর ৫-৪৫ মিনিটে ছেড়ে যাবে এবং কিশোরগঞ্জ এসে পৌঁছবে ৮-৪৫ মিনিটে। অপর ট্রেনটি ভৈরব থেকে ছেড়ে আসবে ভোর ৬টায় এবং কিশোরগঞ্জ এসে পৌঁছবে সকাল ৮টায়। নামাজশেষে উভয় ট্রেন স্ব স্ব গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যাবে বেলা ১২টায়।

 

নিরাপত্তা ব্যবস্থা

 

ঈদগাহে নামাজ পড়তে আসা মুসল্লিদের নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে পুলিশ প্রশাসন। মাঠে চার স্তরবিশিষ্ট নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হবে। ঈদের দিন মাঠে ও মাঠের বাইরে পুলিশ বাহিনীর প্রায় ৮০০ সদস্য পোশাকধারী ও সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালন করবে। মাঠে চারটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার থাকবে। মাঠে ও মাঠের বাইরে ২৪টি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। প্রধান ফটকসহ বিভিন্ন গেট দিয়ে মুসল্লিরা প্রবেশ করার সময় মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে তল্লাশি করা হবে। পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন খান জানান, শান্তিপূর্ণভাবে নামাজ আদায় এবং আইন-শৃঙ্খলা বিঘ্নকারী যে কোন ধরনের ঘটনা এড়ানোর জন্য সর্বাত্মক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

 

সতর্কীকরণ সংকেত

 

প্রতিবছর ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহে ঈদের জামাত শুরু হয় সকাল ১০টায়। জেলা পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঠে এবং এর আশেপাশের এলাকায় উপস্থিত মুসল্লিদের প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য পাঁচ মিনিট পূর্বে ৩টি, তিন মিনিট আগে ২টি ও এক মিনিট আগে ১টি বন্দুকের গুলি ছোঁড়া হয়।

– See more at: http://www.ittefaq.com.bd/print-edition/last-page/2015/07/17/61402.html#sthash.QdN4hHEq.dpuf