আইএমএফের অর্থ নিচ্ছে না সরকার

২২০০ কোটি টাকার বর্ধিত সহায়তায় নতুন শর্ত

২০১৩ সালে পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের অর্থ নেবে না বলে জানিয়েছিল সরকার। এবার আরেক প্রভাবশালী ঋণদাতা সংস্থা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলকে ইসিএফের ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা লাগবে না বলে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। সংস্থার দেয়া নানা শর্তের বেড়াজালের কারণেই সরকার আইএমএফকেও ‘না’ করে দিয়েছে। এরই মধ্যে বিষয়টি আইএমএফ’কে জানানো হয়েছে। এর মাধ্যমে আইএমএফের সঙ্গে ইসিএফ চুক্তির লেনদেনের সমাপ্তি টানল সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও বিষয়টি স্বীকার করেন। মঙ্গলবার সচিবালয়ে তিনি আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, ওরা (আইএমএফ) আমাদের বেশকিছু শর্ত দিয়েছে যেগুলোর ব্যাপারে আমাদের মতের মিল হয়নি। তাই ইসিএফের বাকি অর্থ নেব না বলে জানিয়ে দিয়েছি। শর্তগুলোর মধ্যে বিপিসির অডিট ফার্ম নিয়োগের ব্যাপারটি ছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন- হ্যাঁ, ছিল। আইএমএফ বিদেশি অডিট ফার্ম নিয়োগ করতে বলেছিল; কিন্তু আমাদের মনে হয়েছে, তার প্রয়োজন নেই।

সূত্র জানায়, ২০১২ সালের ১১ এপ্রিল থেকে ২০১৫ সালের ১ এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশের সঙ্গে আইএমএফের ইসিএফ কর্মসূচির চুক্তি হয়। চুক্তির আওতায় বরাবরই নানা ধরনের শর্ত দিয়েছে আইএমএফ। অনেক ক্ষেত্রে বিব্রতকর হলেও সরকার তা পালন করেছে। এসব চুক্তির কারণে ভ্যাট আইন সংশোধন, ব্যাংকিং খাত সংস্কার, গ্যাস-বিদ্যুতের দাম যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ, বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অনলাইন কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে। ব্যাংকিং খাত মনিটরিংয়েও জোর দেয়া হচ্ছে। সংস্থার দেয়া প্রায় সব শর্তই বাস্তবায়ন করেছে সরকার। চুক্তির আওতায় সাত কিস্তিতে মোট ১ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সংস্থাটি। এরই মধ্যে পাঁচ কিস্তির অর্থ ছাড়ও করেছে সংস্থাটি। কিন্তু ‘গোল’ বাধে ষষ্ঠ ও সপ্তম কিস্তির অর্থ ছাড় নিয়ে। এ দুই কিস্তির অর্থ ছাড়ের আগে পুরনোগুলোর সঙ্গে নতুন করে নানা ধরনের শর্ত জুড়ে দেয়া শুরু করে আইএমএফ।

সর্বশেষ সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) নিরীক্ষা করাতে হবে আন্তর্জাতিক কোনো নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান দিয়ে। সংস্থাটির ধারণা, সরকারের পক্ষ থেকে যেসব অডিট ফার্ম দিয়ে অডিট করানো হয় তা মানসম্পন্ন নয়। এতে বিপিসির অনেক অনিয়ম, হিসাবে গড়মিল, জ্বালানি তেলের মূল্যের নানা তথ্য সঠিকভাবে উঠে আসে না। আন্তর্জাতিক অডিট ফার্ম দিয়ে অডিট করানো হলে বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট হবে। বিপিসিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আরও নিশ্চিত হবে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরকার নিযুক্ত অডিট ফার্মগুলো আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন। তাই আলাদাভাবে আন্তর্জাতিক কোনো অডিট ফার্মকে অডিটের দায়িত্ব দেয়ার কোনো মানে হয় না।

বর্ধিত ঋণ সুবিধার (ইসিএফ) ষষ্ঠ ও সপ্তম কিস্তির অর্থছাড় নিয়ে সরকারের সঙ্গে আইএমএফের টানাপড়েন চলছিল অনেক দিন ধরেই। এর চূড়ান্ত রূপ পেয়েছে যখন সংস্থাটি বিপিসির অডিটসহ দু-তিনটি অযৌক্তিক শর্ত নিয়ে তোড়জোড় শুরু করে। এগুলোর মাধ্যমে সংস্থাটি বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ খাতে অযাচিত হস্তক্ষেপ করছে মনে করে সরকার। এর আগে ইসিএফের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়, চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে হবে। যেহেতু এর মেয়াদ এপ্রিল মাসেই শেষ হয়েছে এবং সহায়তার প্রয়োজনীয়তাও ফুরিয়েছে, তাই নতুন করে আর দিন বাড়াতে রাজি নয় সরকার। তাছাড়া চুক্তির মেয়াদ বাড়ালে বাংলাদেশকে কোনো টাকাও দিত না আইএমএফ। তারপরও মেয়াদ বাড়াতে সংস্থার পক্ষ থেকে চাপ অব্যাহত ছিল।

শুধু তাই নয়, আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী এ সংস্থা আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালানি তেলের দাম কমানো, কৃষিতে ভর্তুকি কমানো এবং ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে চাপ দিয়ে আসছিল। স্পর্শকাতর এসব বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি সরকার। জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে সংস্থাকে জানানো হয়েছে, বিপিসি সৃষ্টির পর থেকেই লোকসানে ছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমায় এখন প্রতিষ্ঠানটি লাভ করছে। তাই তেলের দাম সমন্বয় করার জন্য কিছুদিন সময় দরকার। আর কৃষিতে ভর্তুকি কমাতে নারাজ সরকার। এটা স্পষ্ট জানিয়ে দেয়া হয়। ভ্যাট আইনের ব্যাপারেও বলা হয়েছে, আগামী বছরের আগে তা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। সব মিলিয়ে সংস্থার সঙ্গে সরকারের টানাপড়েন বাড়ছিলই।

টানাপড়েনের কারণে সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়, ইসিএফের ষষ্ঠ ও সপ্তম কিস্তির টাকা ছাড় করতে সময় লাগবে। শেষ মুহূর্তের এসব ঝামেলার জন্য ষষ্ঠ ও সপ্তম কিস্তির ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা নেবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে সরকার। এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাংকের পর অপর প্রভাবশালী ঋণদাতা সংস্থা আইএমএফের কর্তৃত্বও মানল না সরকার। তবে ইসিএফের কারণে আইএমএফের সঙ্গে সরকারের সম্পর্কে কোনো ফাটল ধরবে না বলে জানিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একটি সূত্র।