নতুন উচ্চতায় শেখ হাসিনার নেতৃত্ব, পিছিয়ে দল

উনিশ শতকে লাতিন আমেরিকা মহাদেশের যে ২০টি রাষ্ট্র, বিশ শতকের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৪৫ পরবর্তী) সময়ে এশিয়া এবং আফ্রিকা মহাদেশের যে শতাধিক রাষ্ট্র স্বাধীনতা অর্জন করেছে সেগুলোর প্রায় সবকটিই ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই, সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত করেই সফল করা সম্ভব হয়েছে। এ সব লড়াই সংগ্রাম ও যুদ্ধে জনগণের অংশগ্রহণ যেমন একটি জাতীয়তাবাদী আধুনিক রাষ্ট্র রাজনীতির স্ফুরণ ঘটিয়েছে, একইভাবে আপন জনগণ এবং মাটি থেকে বেড়ে উঠেছেন স্বীয় ইতিহাস সৃষ্টিকারী জাতীয় অবিসংবাদিত নেতা ও নেতৃত্ব। এটি আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার শুরু হিসেবে একটি অসাধারণ স্তর, যার গুরুত্ব উপলব্ধি শুধু ভাবাবেগ দিয়ে করলে অস্থায়ী হতে বাধ্য, জ্ঞানার্জন ও চেতনা নির্মাণ দিয়ে করলে শুধু স্থায়ী নয়, চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছানোও সম্ভব। তবে বাস্তবতা হচ্ছে স্বাধীনতার মূল নেতৃত্ব শুধু দেশেই নয়, তৎকালীন আন্তর্জাতিক বাস্তবতায়ও অনেক বেশি দেশপ্রেমী, সৎ, নিবেদিত প্রাণ, প্রজ্ঞাবান, রাষ্ট্রচিন্তক ও রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন। ইতিহাসের জন্য দুর্ভাগ্যজনক শিক্ষা হচ্ছে, এসব রাষ্ট্র নায়কের অনেককেই নিজ নিজ রাষ্ট্র বিনির্মাণের সময় এবং সুযোগ দেয়া হয়নি। দেশের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক মহলে নানা ষড়যন্ত্রকারী, প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী তাদের অনেককেই হত্যা করেছে, অনেককে ক্ষমতাচ্যুৎ করেছে; দেশান্তরিত হয়ে হয়েছে অনেককেই। স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কঠিন পর্বটি অনেক দেশেই নানা ভাঙাগড়ার ভেতর দিয়ে অতিক্রান্ত হয়েছে বা হচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব স্বাধীনতা-উত্তরকালে স্বাধীনতা-পূর্ব আন্দোলন-সংগ্রাম ও যুদ্ধকালের মতো ধারাবাহিকভাবে বিকশিত হতে পারেননি। নেতৃত্ব গড়ে না ওঠার এমন বিপর্যয়কর পরিস্থিতি দেশগুলোর জন্য খুব একটা সুখকর হয়নি, বরং সব ক্ষেত্রেই বেশ সংকট তৈরি করেছে। অনেক দেশ ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতায় ফিরে গেছে, কোনো কোনো দেশ দিকহারা অবস্থায় আছে। মনে রাখতে হবে, আধুনিক রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ে জনগণ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে নৈকট্য একটি অবশ্যম্ভাবী পূর্বশর্ত ছিল। সেটি পূরণ করেই দেশগুলো বিদেশি শক্তিকে হটিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। এমন শর্ত স্বাধীনতার জন্য যেমন অপরিহার্য, আধুনিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আরো বেশি গুরুত্বের দাবি রাখে। কেননা, রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়াটি অনেক জটিল, দেশি-বিদেশি নানা বাস্তবতাকে মোকাবেলা করাসহ আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার সঙ্গে জনগণকে একাত্ম করার বিষয়টি অঙ্গাঙ্গীভাবে স্বার্বভৌম রাষ্ট্র প্রধান করেছে।

স্বাধীনতা-উত্তরকালে বঙ্গবন্ধু একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় হাত দিতে গিয়ে নানা দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক অপশক্তির বাধা চাপ ও ষড়যন্ত্রের শিকার হলেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে তখন বাস্তবতাবোধের চাইতে অনেক বেশি ক্রিয়াশীল ছিল রোমান্টিকতা, হঠকারিতা, উগ্রবাদিতা, কল্পনাবিলাসিতা, সুবিধাবাদিতা, ভাবাবেগ তাড়িত জনগোষ্ঠী ও দুর্বল, রাজনৈতিকতা অগঠিত আর্থসামাজিক শিক্ষা-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীবদ্ধতা। নিজ দলের অভ্যন্তরেই এসব অপশক্তির জায়গা ক্রমশ শক্তিশালী হতে থাকে, তাজউদ্দীনের মতো মেধাবী, দেশপ্রেমিক, অনুগত এবং ইতিহাস নির্মাণে বিরল আদর্শবাদী নেতার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর দূরত্ব তৈরি করা হয়, স্তুতিকারগণ সর্বত্র জায়গা করে নেয়, অবশেষে ১৫ আগস্টের মতো রক্তাক্ত ঘটনা। স্বাধীনতার মূলমন্ত্রের ইতিহাসকে ছুড়ে ফেলে দেয়া হলো বুট জুতার নিচে, অপপ্রচার ও সাম্প্রদায়িকতার পরিকল্পিত রাজনীতিতে। রাজনীতির মাঠে আবির্ভূত হলেন যারা তাদের কোনো রাজনৈতিক অতীত নেই, যাদের ছিল তারা কেউই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বাধীনতার সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধের সহায়ক ছিলেন না, বেশির ভাগই ছিলেন বিরোধী শক্তি, পৃথিবীর সদ্য স্বাধীন অনেক দেশেই রাষ্ট্রের জনক ও প্রতিষ্ঠাতাদের সরিয়ে যারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিল তাদের বেশির ভাগই সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্র দর্শন বিরোধী ছিলেন। বাংলাদেশে মোশতাক, জিয়া এবং এরশাদ সেই ধারারই ধারক-বাহক ছিলেন। তবে পঁচাত্তর-পরবর্তী রাজনীতিতে আদর্শ, সততা, দেশপ্রেম, রাষ্ট্র, রাজনীতি, অসাম্প্রদায়িকতা, জাতীয়তা ইত্যাদিতে প্রচণ্ড বিভ্রান্তি ও দিগভ্রান্তির পঙ্গপাল তৈরি করা হয় যা ১৯৯০-১৯৯১-এর উত্তরণকে তাদের অবস্থানে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়। যা নির্বাচনী পন্থায় ‘গণতান্ত্রিক’ বলে নানা মহলে স্বীকৃতিও পায়। এর ফলে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দর্শন এবং কর্মযজ্ঞ মস্তবড় মতাদর্শগত সংকটে নিপতিত হয়। বাংলাদেশ নির্বাচনী দৌড়ে সাম্প্রদায়িকতা বনাম অসাম্প্রদায়িকতার নাজুক সুতার ওপর চড়ে বসে। বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বিষয়টিকে সুতার দৌড় খেলা হিসেবে উপভোগ করতে শুরু করে। আধুনিক অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ভিশনারি-মিশনারি রাজনৈতিক কর্মযজ্ঞের প্রয়োজনীয়তাকে ধারণ, গ্রহণ ও বহন করার কোনো আবেদনই বুঝতে পারেনি পঁচাত্তর-পরবর্তী ২১ বছরের মতোই। আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, তথাকথিত নাগরিক সমাজ, বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ এখনো পর্যন্ত স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের দিগভ্রান্তি ও বিভ্রান্তির রাজনীতির গভীর কারণ ও বাস্তবতা এখনো পর্যন্ত উন্মোচন করার তাগিত অনুভব করেনি। প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্র গঠনের কর্মযজ্ঞ উপেক্ষিত হওয়ার পর যেই সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প সমাজ, প্রশাসন, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও প্রচার মাধ্যমসহ সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল তা গোটা বাংলাদেশ রাষ্ট্রটিকে প্রায় দ্বিতীয় পাকিস্তানে পরিণত করেছিল, মুক্তিযুদ্ধ ছিল পরিত্যাজ্য ও অপব্যবহৃত; সাম্প্রদায়িকতা উগ্র ও হঠকারী মতাদর্শ সর্বত্র পৃষ্ঠপোষকতা প্রাপ্ত- ফলে বাধাহীন ক্রম প্রসারমান হয়ে ওঠে।

এর মূল কারণ নতুন করে ব্যাখ্যার খুব কি প্রয়োজন রয়েছে? এক কথায় এ হচ্ছে আধুনিক রাষ্ট্র গঠনে কাক্সিক্ষত নেতৃত্বশূন্যতার ফল। ইতিহাসের বিস্ময় হচ্ছে, সব কিছু দীর্ঘদিন এক রকম বা অমসৃণ নাও থাকতে পারে। সমাজের অভ্যন্তরে যেমনিভাবে ঔপনিবেশিকতা বিরোধী, স্বাধীনতাকামী শক্তির জন্ম হয়েছে, নেতৃত্ব প্রদানের যোগ্যতা সৃষ্টি করেছে, রাষ্ট্র গঠনের দীর্ঘ ইতিহাসেও নানা চড়াই-উৎরাই পার হয়ে কোনো কোনো সময়ে কেউ কেউ ইতিহাস সৃষ্টির হাল ধরেছেন বা ধরেন, সেভাবেই তৈরি হন। এটি ইতিহাসেরই অভিজ্ঞতা এবং শিক্ষা।

বাংলাদেশে ১৯৭৫-উত্তর যারা নেতার আসনে বসেছেন তাদের বেশির ভাগই রাজনৈতিক ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার গুণবলি অর্জনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করেননি; সেই কঠিন, দুরূহ ও আদর্শবাদিতার ধারায় পরীক্ষা দিয়ে নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হননি। বিভ্রান্ত, সাম্প্রদায়িকতা মিশ্রিত পুরাতন বোতলে ভরা নতুন অদেখা অবোঝা রাজনীতিতে বেশিরভাগ মানুষ কিছুকাল বিভ্রান্ত হয়েছে, থেকেছেও। কিন্তু এমন কণ্টকাকীর্ণ পথেই আদর্শের ধারাকে পরীক্ষা দিতে হয়েছে, নতুন নেতা তৈরি হওয়ার সীমিত সুযোগের সদ্ব্যবহার ঘটেছে।

শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব যখন গ্রহণ করেন তখন তিনি ছিলেন প্রত্যাশিত নেতা যার মধ্যে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি খুঁজে হয়তো পাওয়া সম্ভব হবে বলে আওয়ামী লীগের একটি অংশ মনে করেছিলেন। নানা দ্বিধা ও শঙ্কা ছিল তাকে কেন্দ্র করে। গোটা রাষ্ট্র যন্ত্রটাই ছিল তার প্রতিক‚লে, দলের বাইরে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী গোষ্ঠী, সুবিধাভোকারী গোষ্ঠী এবং সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী তো ছিলই। তিনি তখনো শোকে মুহ্যমান ছিলেন। অনেক কিছুই তার তখন জানা বা বোঝা ছিল না। দলেও নানা ধারা-উপধারা ও গোষ্ঠীর নানা পরিকল্পনা তাকে সম্মুখে রেখে বাস্তবায়ন করার ছিল। তবে ১৯৮১-’৮৩ সালের নানা উত্থান-পতনের ঘটনা এবং পরবর্তী সময়ের রাজপথের আন্দোলন তাকে একদিকে যেমন আন্দোলন-সংগ্রামের মাঠে ব্যস্ত রেখেছিল, অন্যদিকে সংগঠনকে নতুনভাবে গড়ে তোলার পক্রিয়ায় বেড়ে উঠতে সাহায্য করেছে। কিন্তু এই আন্দোলনের পরিণতি অসাম্প্রদায়িক গণতন্ত্রের দিকে তাকে নেবে নাকি তার প্রতিপক্ষ সাম্প্রদায়িকতার জোটের অবস্থানকে ভিত্তি প্রদান করবে তা কারো কাছেই স্পষ্ট ছিল না। বাংলাদেশ রাজনৈতিকভাবে দিতে সক্ষম হয়েছে। আওয়ামী শাসন মানে ইসলাম চলে যাবে, ভারত ও হিন্দুতের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা হবে, দুর্ভিক্ষে না খেয়ে মানুষকে মরতে হবে ইত্যাদি বস্তাপচা অপপ্রচারের রাজনীতির বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মের নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি হওয়ার সুযোগ হলো। বলতে হবে সেই ধারাও খুব একটা বেগবান হয়েছে- এমনটি বলা যাবে না। কেননা, অশিক্ষা, কুশিক্ষা, অর্ধশিক্ষা, সাম্প্রদায়িক মানসিকতা ইত্যাদিতে আচ্ছন্ন মানুষ অতো সহজে বিশুদ্ধ গণতন্ত্র যেমন বোঝে না, আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তাও ধারণ করতে পারে না। এটি ২০০১ সালের নির্বাচনে স্পষ্ট দেখা যায়। এর প্রক্রিয়া কী হয়েছিল তা ২০০১-’০৬ সালের দেশীয় বাস্তবতায় দেখা গেছে। এই সময় শেখ হাসিনাকে মারার ষড়যন্ত্র রাষ্ট্রযন্ত্রের অবস্থান থেকেই হয়। কেননা, ১৯৯৬-২০০১ সালের শাসনে কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি ছাড়া শেখ হাসিনা রাষ্ট্র রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের পুনর্জাগরণ ঘটিয়ে দেশে একটি অসাম্প্রদায়িক ধারা যেমন তৈরি করতে সক্ষমতা প্রদর্শন করেছেন, একইভাবে উন্নয়ন অর্থনীতি, সমাজ পুনর্গঠন দিয়ে আধুনিক বাংলাদেশ পুনর্গঠনের ধারা সৃষ্টির সম্ভাবনাময় নেতা হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার প্রমাণ রাখেন। বিষয়টি ৪ দলীয় জোট নেতৃত্ব এবং তাদের পেছনে যারা মুখ ঢেকে রেখে বুদ্ধি পরামর্শ দিচ্ছিল তারা তা উপলব্ধি করতে পারছিল। সুতরাং তারা ২০০১-এর নির্বাচনোত্তর আওয়ামী নিধন অভিযানকে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট পর্যন্ত নানা ধারায় অব্যাহত রেখেছিল। তাদের পরিকল্পনা ছিল দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে এর চূড়ান্ত বাস্তবায়ন করা। সে জন্য ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নানা ইঞ্জিনিয়ারিং করা হলো। ১/১১ তা কিন্তু ব্যর্থ করে দেয়। তবে নানা চক্রান্তের পরও ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর দেশে একটি অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

শেখ হাসিনা ২০০৮-এর ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনকে গতানুগতিক ক্ষমতায় যাওয়ার নির্বাচন হিসেবে নেননি। ‘দিন বদলের’ স্লোগান দিয়ে তিনি একটি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার রূপরেখা সংবলিত ইশতেহার প্রদান করেন যা তাকে রাষ্ট্র গঠনের কঠিন দায়িত্ব নেয়ার অঙ্গীকারাবদ্ধ নেতা রূপে আবির্ভূত হওয়ার ইঙ্গিত বহন করে। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে শেখ হাসিনা যেভাবে পথ চলতে চেয়েছিলেন তা ছিল প্রত্যাশিত এবং অনেক কিছুই স্বাপ্নিক। এটিই স্বাভাবিক, আবার এটি অনেকেই বুঝতে পেরেছেন বলে মনে হয়নি। ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ৫ বছরে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অবকাঠামোগত ভিত্তি প্রতিষ্ঠায় তিনি নীরব বিপ্লবের সূচনা করলেন। কৃষি উৎপাদন, শিক্ষা, বিদ্যুৎ, চিকিৎসা, তথ্যপ্রযুক্তি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইত্যাদি নীতিতে অবস্থা সৃষ্টিতে শেখ হাসিনা এবং তার নেতৃত্বে গঠিত সরকার যে ধরনের উত্তরণ ঘটিয়েছে কিছু কিছু সীমাবদ্ধতা ছাড়া বাকি সবই বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের পক্ষে এক দশক আগে কল্পনা করাও কঠিন ছিল। তিনি ২০০৮ সালে ইশতেহারে যে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন তা বাস্তবে এখন অনেকটাই প্রতিষ্ঠিত সত্য। মানুষের জীবন মান, সূচক, কর্মসংস্থান, আয়-উন্নতি এখন এতটাই নিরবচ্ছিন্ন থাকতে দেখা যাচ্ছে যার ফলে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে একটি নিম্ন মধ্য আয়ের উত্তীর্ণ দেশে উন্নীত হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছে। অচিরেই দেশটি মাঝারি আয়ের দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে বলেও অভিমত আছে।

১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা ছিলেন একজন প্রত্যাশিত নেতার অবস্থানে। এই দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ চলার মধ্য দিয়ে তিনি এখন বাস্তবে একজন যথার্থ ঐতিহাসিক নেতার আসনে উন্নীত হয়েছেন। তিনি এখন দলীয় সংকীর্ণ অবস্থানের অনেক ঊর্ধ্বে চলে যাওয়ার অবস্থায় আছেন এটি মোটেও অত্যুক্তিকর নয়। তবে তিনি যেমন সরকার প্রধান, একই সঙ্গে দলীয় প্রধানও। তার সম্মুখে বাংলাদেশকে নতুন নতুন উচ্চতায় এগিয়ে নেয়ার নানা চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। ১৯৯৬-২০০১ সালে অতীতের অপপ্রচারের সব বাঁধ ভেঙে দিতে পেরেছেন তিনি, দেশ পরিচালনার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার যোগ্যতাও তিনি প্রদর্শন করেছেন। ২০০৯ থেকে এ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পুনর্গঠনের ভিত্তি প্রতিষ্ঠার সক্ষমতা ও কৃতিত্ব দাবি করতে পারছেন। এখন তার সম্মুখে একটি মধ্যম আয়ের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার কঠিন চ্যালেঞ্জ ধরা দিচ্ছে। সেই সব চ্যালেঞ্জ তিনিই আমাদের জাতির জীবনে একে একে নিয়ে এসেছেন, তুলে ধরেছেন এবং এক এক করে নতুন উচ্চতায় নিয়ে উঠে এসেছেন। এখানেই নেতা বা নেতৃত্ব প্রদানে শেখ হাসিনার বিশেষত্ব অনস্বীকার্য।

তবে আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বড় ধরনের সমস্যা হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতায় আচ্ছন্ন সমাজ ব্যবস্থা। গোটা দেশ ও সমাজের পরতে এর প্রভাব ছাড়িয়ে পড়েছে। আধুনিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণা এ মানুষের মধ্যে প্রায় নেই বললেই চলে। এরা বরং উন্নয়নের এই ধারাতে অবস্থান করেও পশ্চাৎপদ চিন্তাধারা এবং রাজনীতিতে যুক্ত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনগুলোতে যে ধরনের রাজনৈতিক প্রস্তুতি, ন্যায়নিষ্ঠ অবস্থান থাকা আবশ্যক ছিল তার ধারেকাছেও সংগঠনগুলো নেই, নেতাকর্মীদের বড় অংশই নেই। তৃণমূল বলে খ্যাত নেতাকর্মীদের বেশির ভাগই নিজেদের আখের ঘুছিয়ে নিতে ব্যস্ত, জনগণের মন জয় করার প্রতি তাদের কোনো আগ্রহ আছে বলে মনে হয় না। তাদের অনেকেই ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে, শেখ হাসিনা যে ধরনের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চান সেটি প্রতিষ্ঠায় নিজেদের গড়ে তোলা, যোগ্য করে তোলার সঙ্গে যুক্ত করছে না। ফলে নেতা হিসেবে শেখ হাসিনা নতুন উচ্চতায় আসীন হলেও দল অনেক বেশি পিছিয়ে আছে, বিতর্কিত মানুষে ভরে উঠছে। স্থানীয় নেতারা কার নির্দেশে, কী উদ্দেশ্যে জামায়াত-বিএনপির বিতকির্তদের দলে ভেড়াচ্ছে কেউ তা জানে না! এটি কি সম্ভব?

অন্যদিকে সরকারের প্রশাসনে চলছে নানা প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর অপতৎপরতা, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা। সুশাসনের জন্য যে ধরনের প্রশাসন ও প্রশাসকের প্রয়োজন তার ঘাটতি চোখে পড়ার মতো প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আধুনিক বাংলাদেশের চেতনাবিরোধী প্রশাসকের অবস্থান বেশ স্পষ্ট; তাদের পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া এবং নেয়ার অভাব নেই। প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথভাবে গড়ে তোলা, পরিচালনা করার মতো যোগ্য, মেধাবী, দক্ষ, সৎ এবং দেশপ্রেমিক মানুষের অভাব অত্যন্ত তীব্র। আমরা যারা কাছ থেকে প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ থেকে সর্ব নিম্ন পর্যায় পর্যন্ত মানুষজনদের দেখি তখন বুঝতে মোটেও বাকি থাকে না যে, এ ধরনের প্রশাসক, নেতা, নীতিনির্ধারণী সংস্থা দিয়ে আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলা কত কঠিন হবে। টাকা, অর্থবিত্ত ও ক্ষমতা একশ্রেণির মানুষকে অন্ধ, পাগল, পঙ্গু এবং কাণ্ডজ্ঞানহীন করে ফেলেছে। এটি সমাজের সাধারণ থেকে শুরু করে দল, প্রশাসন, শিক্ষা, প্রচার, ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতিসহ সর্বত্র ভয়াবহ আকারে গ্রাস করে নিয়েছে। প্রায় সবাই এর কাছে আত্মসমর্পণ যেমন করছে, জিম্মি হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে মেধা, মনন, সৃজনশীলতা, সততা, দেশপ্রেম এবং আধুনিক চিন্তাধারায় নিজেকে যুক্ত রাখার সুযোগ দিন দিন যেন কঠিন হয়ে পড়েছে। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা কোনোভাবেই এমন অপশক্তি দিয়ে সম্ভব নয়। সে কারণে জরুরি হয়ে পড়েছে আমাদের সমাজে যে সব মানুষ আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য যোগ্য, প্রয়োজনীয়- তাদের দল, প্রশাসনসহ সব ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা, নতুন প্রজন্মকে সেভাবে ভাবতে ও গড়ে উঠতে সাহায্য করা। রাজনীতির নামে এখন যে সব তরুণ লেখাপড়া থেকে নিজেদের বিযুক্ত করে মেধাহীন, দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী, আদর্শহীন হয়ে উঠছে তাদেরকে ফিরিয়ে আনা; নতুন উচ্চতার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সঙ্গী হওয়ার জন্য তৈরি হতে সুযোগ করে দেয়া। ন্যায়নিষ্ঠ, দৃঢ় এবং শক্ত অবস্থান ব্যতীত এ সমাজ আধুনিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে খুব একটা আসবে না। শেখ হাসিনাকে সেই উচ্চতার ভেতর ও বাইরের করণীয় নির্ধারণ করে এখনই নতুনভাবে পথ চলা শুরু করতে হবে।