যেকোন জাতীয় অর্জনকে হীনমন্যতার ঊর্ধ্বে উঠে দেখতে হয়

ফকীর আবদুর রাজ্জাক

আমরা যারা সত্তরের কোটায় তাদের সৌভাগ্য হলো বাংলাদেশকে নিম্নমধ্য আয়ের দেশ হিসেবে দেখে যাওয়া। পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ সৃষ্টির মহাসংগ্রামে ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র অবদান রাখার সুযোগ হয়েছিল একাত্তরে। সেদিন স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশ পাকি- বঞ্চনা, শোষণ নির্যাতন থেকে মুক্ত হয়ে একদিন যে স্বাধীন অস্তিত্বে নিজের পায়ে দাঁড়াবে। কিভাবে দাঁড়াবে, কতদিনে সেটা সম্ভব হবে সেটা জানা ছিল না। তবে বিশ্বাস ছিল একদিন হবেই। সেটা যে স্বাধীনতার ৪৪ বছরের মাথায় এবং আমাদের জীবদ্দশাতেই তা কেউ কল্পনা করেননি। এখনও বহু মুক্তিযোদ্ধা বেঁচে আছেন, মৃত্যুবরণও করেছেন অসংখ্য, যাদের সুযোগ হয়নি নিজ মাতৃভূমির এ গৌরব দেখে যাওয়ার। সেই পাকিস্তান আমল থেকেই বাংলাদেশ বা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছিল দরিদ্রতম নিম্নআয়ের দেশ। সেই আর্থসামাজিক অবস্থায় দাঁড়িয়েই আমরা দেশকে স্বাধীন করেছিলাম। তারপর নানা চড়াই- উৎরাই নতুন নতুন সামরিক শোষকদের বেড়া ডিঙ্গিয়ে এ দেশ এখন স্বাধীনতার ৪৫ বছরে পা রেখেছে। আর এই সময়েই বিশ্বব্যাংকে নিয়ম-শৃঙ্খলার হিসাব ডিঙ্গিয়ে বাংলাদেশ এখন আর নিম্নআয়ের দেশ নেই। সে এখন মধ্যমআয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার সোপানে পা রেখেছে। যাকে বলা হয়েছে নিম্নমধ্য আয়ের দেশ। অর্থাৎ ক্ষমতাসীন শেখ হাসিনার ঘোষণা অনুযায়ী ২০১৮ বা ২০২১ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবে। সত্তর বছর বয়সের কোটায় দাঁড়িয়ে আমরা যারা দেশের এই গৌরবোজ্জ্বল উন্নতি উপলব্ধি করছি তারা ২০১৮ বা ২০২১-শের মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সেই মহাগৌরবের ইতিহাস দেখে যেতে পারব কিনা জানিনা। সৃষ্টিকর্তার কৃপা বলে এমন বহু মুক্তিযোদ্ধাই দেখে যেতে পারবেন সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।এ কথা আজ আর অস্বীকার করা যাবে না, দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। যার সার্বিক হিসাবের ফলশ্রুতি হলো নিম্নআয়ের অভিশাপ থেকে দেশ আজ বেরিয়ে এসে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে পদার্পণ করেছে। যেমন কৃষি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। যার ফলে দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এমনকি খাদ্যশস্য বিদেশে রফতানি করারও সক্ষমতা অর্জন করেছে দেশ। দেশের সামগ্রিক অবকাঠামো উন্নয়নে বিরাট অগ্রগতি হয়েছে, মানবসম্পদ উন্নয়নেও আশানুরূপ সুফল ফলেছে, বৈদেশিক মুদ্রার রির্জাভ অশাতীত পর্যায়ে বৃদ্ধি পেয়েছে, বৃদ্ধি পেয়েছে রেমিট্যান্স ।অর্ধেক জনগোষ্ঠীর কর্মক্ষমতাকে অগ্রাহ্য করে একটি জাতির অগ্রগতি ভাবা যায় না। তাই এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন রোলমডেল। তার ওপর ছয় বছরের বেশি ৬ ভাগের ওপর প্রবৃদ্ধি অর্জন ধরে রাখার ঘটনা বিশ্বের বড় বড় দেশের চোখেও বিস্ময়ের ব্যাপার। বিশ্বমন্দাকে পাশ কাটিয়ে জাতীয় অর্থনীতি ক্রমাগত সচল থেকেছে গত অর্ধযুগ ধরে। বিদ্যুৎ উন্নয়নে তো ক্ষমতাসীন সরকার রীতিমতো উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। সাড়ে তিন হাজার থেকে এখন সাড়ে তের হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। আর যেসব ছোটবড় প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে তাতে ২০১৯ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন বিশ হাজার মেগাওয়াটে গিয়ে পেঁৗছাতে পারে। আবার ভারত ও আশপাশের দেশ থেকে বিদুৎ আমদানিরও প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। যে কোন উন্নত জাতি রাষ্ট্র বির্নিমাণে এনার্জি অর্থাৎ বিদ্যুৎ-গ্যাসের উৎপাদন ও তার সঠিক ব্যবহার অনিবার্য। সরকার সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই কাজ করে চলেছে।দেশ আজ কেবল আর্থসামাজিক প্রতিটি ক্ষেত্রেই অগ্রগতি সাধন করেনি বরং জনগণের জীবন মান উন্নয়নেও ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়ে সে এগিয়ে চলেছে। সরকার মানুষ বিশেষ করে সমাজের দুর্বল জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে উন্নতি সাধনের জন্য নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। তাতে ওই শ্রেণীর মানুষের জীবনে অনেকখানি সক্ষমতা ফিরে আসতে শুরু করেছে। যেমন বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষকে ভাতা দেয়া, শিক্ষায় ব্যাপক ভর্তুকি, আশ্রয় ও স্বাস্থ্যসেবা প্রভৃতি। ছয় বছর আগেও যেখানে বাজেট হতো ষাট-সত্তর হাজার কোটি টাকার, সেখানে এখন বাজেট হয় প্রায় তিন লাখ কোটি টাকার। অর্থাৎ আমাদের প্রশাসন এই বিপুল পরিমাণ বাজেট প্রস্তাব বাস্তবায়ন করার মতো সক্ষমতা অর্জন করেছে। যা আগের তুলনায় অনেক বেশি। দেশ ও দেশের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করার প্রশ্নে এ সক্ষমতা অর্জন ছিল অপরিহার্য শর্ত। সরকার আশাবাদী এ শর্ত তারা পূরণ করতে পারবে।কিন্তু সরকার পারছে না অপচয়, ক্ষয়ক্ষতি, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করতে। যা দেশের অগ্রগতি ব্যাহত করছে। যদি দুর্নীতি অপচয় নিয়ন্ত্রণ করা না যায় তাহলে দেশের অগ্রগতি অর্থাৎ মধ্যম আয়ের দেশের উন্নীত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ঘোষিত সময়েও প্থরণ হবে কি না সন্দেহ। তাই দেশের অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হলে দুর্নীতি, অপচয়, বিভিন্ন সেক্টরের ক্ষয়ক্ষতি অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এ কথা অস্বীকার করা যাবে না, গোটা দেশে ছোটবড় দুর্নীতির জোয়ার বইছে। বড় বড় দুর্নীতির দিকে সরকারের দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকলেও ছোট ছোট দুর্নীতি তাদের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত দুর্নীতির জোয়ার বয়ে চলেছে। একেবারে নিম্নস্তরের সরকারি অফিসের কোন কাজই হয় না ঘুষ ছাড়া। তাছাড়া ছোটবড় সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি-অপব্যয় তো লেগেই রয়েছে। সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখলে অবশ্যই দুর্নীতি-ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা সম্ভব। যে কোন দেশের অগ্রগতির পথে দুর্নীতি হলো ক্ষয়রোগের মতো। আফ্রিকা-এশিয়ার যেসব দেশ চরম দরিদ্র বা দরিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে তাদের এ অভিশাপের অন্যতম প্রধান কারণ দুর্নীতি। স্বাধীনতার পর থেকে এতকাল ওইসব দরিদ্র দেশেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলাম আমরা। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্র সেক্রেটারি হেনরি কিসিঞ্জার তাই ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে পরাজয়ের গ্লানি মনে রেখেই উপহাস করে বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। অথচ ওই অভিযোগ অসত্য ছিল না। কিন্তু বাঙালি কিসিঞ্জারের উক্তিকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করলেও দেশের উন্নতি-অগ্রগতি চলি্লশ বছরের বেশি সময়ে পেরিয়ে উন্নতির কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পেঁৗছেছে। আজ যখন বাংলাদেশকে নিম্নমধ্য আয়ের দেশ বলে বিশ্বব্যাংকই স্বীকৃতি দিয়েছে তখন নিঃসন্দেহে তা গৌরবের বিষয়। জাতি আজ অগ্রগতি-উন্নতির ট্রেনে উঠতে পেরেছে, কাঙ্ক্ষিত সোপানে পেঁৗছানো এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।এতদসত্ত্বেও দেশের অর্জনকে সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি দেশের একটি মহল। যাদের মধ্যে অনেকগুলো রাজনৈতিক দলও রয়েছে। তারা যে কোন অর্জন আওয়ামী লীগ সরকারের হাত ধরে এলে তাকে তো সহজভাবে মেনে নিতেই পারে না, এমনকি সমালোচনা করতেও দ্বিধা করে না। এরা মূলত আধুনিক রাজনীতি, সংস্কৃতি, গণতান্ত্রিক আচরণ ও সভ্যতাও উপলব্ধি করতে পারে না। বাংলাদেশ আজকের এই নিম্নমধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হতে পারতো অনেক আগেই। আশির দশকে জেনারেল এরশাদের সরকার এবং নব্বইয়ের দশকে বেগম জিয়ার সরকার ক্ষমতার লোভ পরিহার করে দেশের উন্নতির ব্যাপারে যদি ব্যাপক কর্মযজ্ঞের পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হতেন তাহলে শেখ হাসিনার সরকারকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো না। এমনকি এ সময়ে হয়তো মাধ্যম আয়ের দেশেও উন্নীত হতে পারতো সে। শেখ হাসিনার সরকারের কূটনৈতিক দূরদর্শিতা, মামলা লড়ে যাওয়ার দৃঢ়তা এবং সাফল্য নিয়ে আসার ও ন্যায্য অধিকার ছিনিয়ে আনার দৃঢ় সংকল্পের দরুন সাম্প্রতিক সময়ে দুটি সমুদ্রসীমা জয় ও স্থল সীমানা চুক্তিতে উপনীত হওয়া সম্ভব হয়েছে। নিঃসন্দেহে তা ক্ষমতাসীন সরকারেরই কৃতিত্ব। ঠিক এভাবে ব্যাপক আর্থসামাজিক সরকারেরই কৃতিত্ব। কিন্তু বিএনপি ও বিরোধী সংগঠনসমূহ এবং একটি চিহ্নিত ‘সুশীল সমাজ’ সরকারের এসব কৃতিত্বকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেনি। পারেনি একটি বিবৃতি দিয়ে দেশের এ অর্জনকে স্বাগত জানাতে। এ হীনমন্যতা নিয়ে চলছে দেশের রাজনীতি। যদি আধুনিক গণতান্ত্রিক চর্চায় সবাই অভ্যস্ত হতো, যদি রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে সবাই ধারণ করত, যদি মনোজগতে সভ্যতা-সংস্কৃতির লেশমাত্র থাকত তাহলে দেশের এ অর্জনকে তারা উপেক্ষা করতে পারত না।পৃথিবীতে এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে, নিম্নমধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পর বিশেষ করে আফ্রিকার অনেক দেশই আবার নিম্নআয়ের দেশে নেমে এসেছে। তাই আমাদের সরকারকে দেশের এ অর্জন ধরে রেখে সামনে এগোতে হলে যেমন কঠোর পরিশ্রম, সততা ও দূরদর্শী পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হতে হবে তেমনি ক্ষমতার ধারাবাহিকতাও বজায় রাখতে হবে। কেননা জনগণের বিশ্বাস, বর্তমান সরকারের পরিবর্তন ঘটিয়ে অন্য কোন সরকার ক্ষমতায় আসীন হলে এ অর্জন তারা ধরে রাখতে পারবে না। তাদের অতীত ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সামগ্রিকভাবে তারা দেশের কোন সেক্টরেই উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটাতে পারেনি। বরং দুর্নীতি-লুটপাটেই সব রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টা ধ্বংস হয়ে গেছে। তাই সরকারের ক্ষমতার ধারাবাহিকতা অপরিহার্য সর্বক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি সাধন করেছে। পদ্মা সেতু, তৃতীয় সমুদ্র বন্দরসহ বড় বড় যেসব প্রকল্প চলমান সেগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের চেহারাই পাল্টে যাবে বলে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরাই মনে করছেন। তার এসবই আওয়ামী লীগ সরকারের কৃতিত্ব। যে কারণেই বলা হয় জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি স্বাধীনতা অর্জন করেছে। বঙ্গবন্ধুই অর্থনৈতিক মুক্তির ডাক দিয়ে গিয়েছিলেন কিন্তু ঘাতক শক্তির ষড়যন্ত্র ও হত্যাযজ্ঞে তিনি তা বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি। এবার তারই কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জাতি অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করার স্বপ্ন দেখছে। যার প্রথম ধাপ পার হতে পেরেছে দেশ। এ আশঙ্কা আজ আর উচ্চাশা বলে উড়িয়ে দেয়া যাবে না।সরকারের বিরোধী মহলকে সুস্থ রাজনীতির ধারায় ফিরে আসতে হবে। সরকারকেও দেশে সুস্থ গণতান্ত্রিক ধারার রাজনীতি যাতে অক্ষুণ্ন থাকে তার জন্য উদার মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হবে। গণতান্ত্রিক রাজনীতিই যদি আমাদের আরাধ্য হয় তবে তাকে বিকশিত করার প্রচেষ্টা থাকতে হবে। সে জন্য পরমত সহিষ্ণুতা, মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন সমুন্নত করার কোন বিকল্প নেই। দেশের সব অর্জন জাতির জন্যই, তাদের কৃতিত্ব। এই কথা মনে রেখে সবার সঙ্গে সমান আচরণ করতে হবে। আমাদের বিশ্বাস, জাতি সক্ষম হয়ে তার অর্জনসমূহ ধরে রাখতে।
[লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট]