উন্নয়ন ম্যাজিকে বদলে যাবে বাংলাদেশ

বাংলাদেশ এখন নিম্নমধ্য আয়ের দেশ। সম্প্রতি মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে এইঘোষণা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্য আয়ের কাতারে পৌঁছানোর জন্য সরকারের রয়েছে একটি নিজস্ব লক্ষ্যমাত্রা, যা 'রূপকল্প-২০২১' নামে পরিচিত। তবে মধ্য আয়ের এ চ্যালেঞ্জ নেওয়ার মতো সক্ষমতা কি রয়েছে আমাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির? প্রশাসন কিংবা সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো কি সে সক্ষমতা অর্জন করেছে? সরকার কি কেবল উন্নয়নকেই লক্ষ্য মানবে, নাকি গণতন্ত্র ও সুশাসনের দিকেও গুরুত্ব দেবে। এক সাক্ষাৎকারে এসব নানা প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি বলেছেন, দেশে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল দরকার, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার কথাও বলেছেন। সুশাসন প্রশ্নে সরকারকে আরও কঠোর হওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন। তবে তার এসব কথাই দেশ ও মানুষের উন্নয়নের স্বার্থে। সেখানে তিনি কোনো ছাড় দিতে নারাজ। এমনকি রাজনীতিকেও...। পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রুকনুজ্জামান অঞ্জন ও গোলাম রাব্বানী।

বাংলাদেশ প্রতিদিন : সম্প্রতি বাংলাদেশকে নিম্নমধ্য আয়ের দেশ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। আবার ২০২১ সালের মধ্যে মধ্য আয়ের দেশে পৌঁছানোর কথা বলা হচ্ছে। এ ব্যাপারে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করবেন কি?

মুস্তফা কামাল : সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০২১ সালের মধ্যে মধ্য আয়ের দেশে পৌঁছানো। এর মধ্যে আমি দু-একটি টকশোতে বলেছি, ২০১৭-১৮ সালের মধ্যে আমরা এটা অর্জন করতে পারব। দুটি সংস্থা এ কাজটি করে। একটি হচ্ছে বিশ্বব্যাংক, অন্যটি জাতিসংঘ। এখানে একটি ভুল বোঝাবুঝি আছে। এটা জাতির কাছে পরিষ্কার হওয়া দরকার। আমাদের যে রূপকল্প-২০২১, সেখানে যেসব প্রস্তাবনা ছিল, সেগুলো হচ্ছে : মধ্য আয়ের দেশে পৌঁছানো, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়া, সবার মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া ইত্যাদি। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত করা। আমরা এতদিন নিম্ন আয়ের দেশে ছিলাম। যাদের মাথাপিছু আয় ০ থেকে ১ হাজার ৪৫ ডলার, বিশ্বব্যাংকের হিসাবে তারা নিম্ন আয়ের দেশ। আর যাদের ১ হাজার ৪৫ ডলারের ওপরে, ৪ হাজার ১২৫ ডলার পর্যন্ত মাথাপিছু আয় তারা হলো নিম্নমধ্য আয়ের দেশ। আমাদের বর্তমান মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৩০০ ডলারের ওপরে। তবে বিশ্বব্যাংকের হিসাবে এটি ১ হাজার ৯০ ডলার। তিন বছরের গড় মাথাপিছু আয় হিসাব করে তারা আমাদের নিম্নমধ্য আয়ের দেশ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ৪ হাজার ১২৫ ডলারের ওপরে মাথাপিছু আয় নিতে পারলে আমরা উচ্চমধ্য আয়ের দেশে পরিণত হব। উচ্চমধ্য আয়ের দেশ হলো তৃতীয় পর্যায়। ৪ হাজার ১২৫ থেকে ১২ হাজার ৭৩৫ ডলার পর্যন্ত যাদের মাথাপিছু আয় তারাই উচ্চমধ্য আয়ের দেশ। এখানে ভারত, চীন, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা রয়েছে। এ ছাড়া ১২ হাজার ৭৩৫ ডলারের বেশি মাথাপিছু আয় হলে আমরা উচ্চ আয়ের দেশে পৌঁছব। ২০৪১ সালের মধ্যে আমাদের সেই লক্ষ্য রয়েছে। তবে তার আগে আমাদের নিম্নমধ্য আয়ের দেশে থেকে উচ্চমধ্য আয়ের দেশে পৌঁছতে হবে। এ জন্য আরও ১০ বছর সময় লাগবে। অর্থাৎ ২০২৫-২৬ সালে আমরা উচ্চমধ্য আয়ের দেশে পৌঁছতে পারব বলে আশা করছি। এ জন্য আমাদের কাজটি হচ্ছে মাথাপিছু আয় ৪ হাজার ১২৬ ডলারে উন্নীত করা।

বা. প্র : সরকারের কেউ কেউ বলেছেন, ২০১৮ সালের মধ্যে অর্থাৎ আর দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে আমরা মধ্য আয়ের দেশে পৌঁছব। আপনি বলছেন, আরও বছর দশেক লাগবে…

মুস্তফা কামাল : সরকারের যারা বলেছেন সেটা জাতিসংঘের হিসাবে। জাতিসংঘের যে ক্যাটাগরি রয়েছে সেখানে নিম্নমধ্য আয়ের দেশ বলতে কিছু নেই। তারা তিন পর্যায়ে দেশগুলোকে ভাগ করেছে। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি), উন্নয়নশীল দেশ ও উন্নত দেশ। জাতিসংঘের হিসাবে এখনো আমরা স্বল্পোন্নত দেশে আছি। এখান থেকে উন্নয়নশীল দেশে পৌঁছাতে গেলে আমাদের আরও দুটো কাজ করতে হবে। এর মানে মাথাপিছু আয় বাড়ানোর পাশাপাশি মানবসম্পদ সূচকের উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। ২০১৫ সালে মানবসম্পদ সূচকের যে রিপোর্ট তাতে আমরা অনেক সূচকেই ভারতের ওপরে রয়েছি। আমাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মাতৃ ও শিশু মৃত্যু হারের যে সূচক রয়েছে তা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের চেয়েই ভালো। ফলে মানবসম্পদ সূচকে আমরা উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছি।

অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় আমাদের সক্ষমতা বেড়েছে। গত ছয়-সাত বছরে গড়ে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ শতাংশের বেশি। রপ্তানি আয় গত ছয় বছরে ১৪ বিলিয়ন থেকে ৩১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। রেমিট্যান্স ৮ বিলিয়ন থেকে ১৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বর্তমানে আমাদের রিজার্ভ রয়েছে পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয়ের সমান। আমাদের কৃষি উৎপাদন সক্ষমতাও ভারতের চেয়ে বেশি। হেক্টরপ্রতি প্রায় সাড়ে ৩ মেট্রিক টন ধান উৎপন্ন হয়। ফলে অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় আমাদের সক্ষমতাও অনেক বেড়েছে। আমরা এখন উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় যেতে প্রস্তুত।

বা. প্র : কিন্তু সে জন্য তো আবেদন করতে হবে?

মুস্তফা কামাল : হ্যাঁ, জাতিসংঘে আবেদনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে মূল্যায়ন করার জন্য ২০১৮ সালে জাতিসংঘ বৈঠকে বসবে। তার আগেই আমরা এলডিসি থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশে পৌঁছানোর জন্য আবেদন করব।

বা. প্র : উচ্চমধ্য আয় বা উন্নয়নশীল দেশ যা-ই বলা হোক না কেন, উন্নয়নের যে চ্যালেঞ্জ তা কীভাবে মোকাবিলা করবে সরকার?

মুস্তফা কামাল : রাষ্ট্র হিসেবে প্রমোশনের পরে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকবেই। আমরা এখন এলডিসি হিসেবে দাতাদের ঋণ অনুদান ছাড়াও উন্নত দেশগুলোতে কিছু বাণিজ্যিক সুবিধা পেয়ে থাকি, যার মধ্যে রয়েছে জিএসপি সুবিধা। এ কথা ঠিক, এলডিসি হিসেবে যে সুদে ঋণ পাওয়া যায় তখন তার থেকে কিছু বেশি দিতে হবে। তবে তা খুব বেশি নয়। এ ছাড়া বাজেটে এক দশক আগেও দাতাদের ঋণের পরিমাণ ছিল জিডিপির ১০ থেকে ১২ ভাগ। এখন তা কমে ২ শতাংশে নেমে এসেছে। ফলে সুদ নিয়ে আমাদের শঙ্কার কিছু নেই। আর বর্তমানে যে বাণিজ্য সুবিধা পাচ্ছি, তা উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তর হলেও পাওয়া যাবে। ভারত, পাকিস্তানসহ অনেক দেশই এখন জিএসপি প্লাসের আওতায় আসছে; এ নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। বরং আমাদের যে লাভ সেদিকে তাকানো উচিত। আর ঋণের সুদে কিছু সুবিধা পাওয়া যাবে বলে আমরা সারা জীবন নিজেদের গরিব করে রাখতে পারি না।

বা. প্র : বলতে চাচ্ছেন মধ্য আয়ের দেশে প্রমোশনের ক্ষেত্রে আমাদের লোকসানের কিছু নেই।

মুস্তফা কামাল : এ মুহূর্তে লোকসানের কিছু নেই। বরং আমরা নিম্নমধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক দেশ বিনিয়োগের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এ ছাড়া অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান আমাদের ব্যাপারে ইতিবাচক রিপোর্ট করছে। এর আগ পর্যন্ত এইচএসবিসি ব্যাংকের মূল্যায়নে বাংলাদেশ নেতিবাচক তালিকায় ছিল। এখন তারা আমাদের ইতিবাচক তালিকায় রেখেছে। এর ফলে বিশ্বের যে কোনো ব্যাংক আমাদের দেশের ব্যাংকের এলসি গ্রহণ করবে। এটি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একটি বড় সুবিধা।

বা. প্র : আমাদের প্রশাসন কি মধ্য আয়ের চ্যালেঞ্জ নেওয়ার মতো সক্ষমতা অর্জন করেছে? বিশেষ করে সরকারি সংস্থাগুলোর সেবার মান উন্নত করা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আরও মনোযোগী হওয়া, বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত দেওয়া এবং সর্বোপরি প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের ব্যাপারে তো প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

মুস্তফা কামাল : প্রশাসনিক দুর্বলতা রয়েছে। বাংলাদেশ আরও অনেক আগেই মধ্য আয়ের দেশে পৌঁছত যদি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা থাকত। আমাদের সেই প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে ওঠেনি। তবে এটা যে খুব খারাপ, তা নয়। ধীরে ধীরে প্রশাসনের সক্ষমতা বাড়ছে। সেটা হয়তো জ্যামিতিক হারে নয়। এটা এক দিন বা এক বছরের বিষয় নয়। বার বার গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হওয়ায় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব বেড়েছে। প্রত্যেকেই ভাবে এ দল করবে, না ও দল করবে, না মাঝামাঝি থাকবে। মাঝামাঝি থাকলে তারা ওএসডি থাকবে, নাকি চাকরি হারাবে। আবার একদল সারা জীবন ক্ষমতায় থাকে না। কখন কোন সরকার ক্ষমতায় আসে তা নিয়েও ভাবনায় থাকে তারা। এই যে প্রশাসনের অবস্থা এর জন্য কারা দায়ী। আমার দৃঢ় বিশ্বাস এটি আওয়ামী লীগ করেনি। এটা ‘৭৫ সালের পর থেকেই হতে থাকে।

বা. প্র : আপনি বলতে চাইছেন সামরিক সরকারগুলোই প্রশাসনকে দুর্বল করেছে…।

মুস্তফা কামাল : ডেফিনিটলি তারা করেছে এবং ওই যে তারা করে দিল এখন এটা স্ট্রাকচারে পরিণত হয়েছে। এটা কিন্তু এখন আর অস্থায়ী নয়, স্থায়ী রূপ নিয়েছে।

বা. প্র : এ থেকে বেরোনোর উপায় কী?

মুস্তফা কামাল : বেরোনোর জন্য কোনো ম্যাজিক নেই। এ থেকে আস্তে আস্তে সবাই বেরোবে। দেশের প্রতি মমত্ববোধ থাকলে এটা হবেই। কারণ হলো এ দেশের সবাই যারা এখানে চাকরি করে, যারা ব্যবসায়ী তাদের ছেলেমেয়েরা অনেকেই ভালো ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করছে। কেউ কেউ উচ্চশিক্ষা নিতে বিদেশে যাচ্ছে। তারা সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশে ফিরে আসছে। এ দেশ যখন একদিন সুন্দর দেশ হবে, একটা পরিচ্ছন্ন দেশ হবে, অর্থনীতিতে এগিয়ে যাওয়া দেশ হবে, তখন সবাই এখানে কাজ করবে। আপনি দেখুন, ব্যবসায়ীদের ছেলেমেয়েরা এখন বিদেশে থাকে না। তারা এ দেশে এসে ব্যবসা-বাণিজ্য করছে। কারণ তারা মনে করছে এখানে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ রয়েছে।

বা. প্র : বলতে চাইছেন নতুন প্রজন্মের হাতে গেলে… ?

মুস্তফা কামাল : ঠিক তাই, নতুন প্রজন্মের হাতে গেলে আরও অনেক সুন্দর হবে দেশ, শক্তিশালী হবে, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও বাড়বে। তখন সুশাসন স্বাভাবিকভাবেই প্রতিষ্ঠা পাবে।

বা. প্র : আমাদের আর্থিক খাতেও কিন্তু সুশাসনের অভাব রয়েছে। বড় দুর্বলতা হচ্ছে ব্যাংকিং খাত।

মুস্তফা কামাল : ব্যাংকিং খাতে দুর্বলতার বিষয়টি আমরা সবাই জানি। এটা আমরা অনুধাবন করছি। বাংলাদেশ ব্যাংকও চেষ্টা করে যাচ্ছে এটাকে হাতে নেওয়ার জন্য, কিন্তু পারছে না। মাননীয় অর্থমন্ত্রী বার বার অসন্তোষ প্রকাশ করে যাচ্ছেন, তিনি ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। আমি মনে করি, কেবল অসন্তোষ প্রকাশ করলেই হবে না, এ ব্যাপারে তার অবস্থান আরও কঠোর হওয়া দরকার। অবশ্য তিনি কিছু কিছু ক্ষেত্রে কঠোর হচ্ছেন। আমার বিশ্বাস, এখানেও তিনি কঠোর হবেন। আরও উদ্যোগী হয়ে যেখানে যেখানে যা ব্যবস্থা নেওয়া দরকার সে ব্যবস্থা তিনি নেবেন। সুশাসনের জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে আরও সুপারভিশন, আরও রেগুলেশনের প্রয়োজন রয়েছে।

বা. প্র : সরকারি ব্যাংকগুলোর তো যা-তা অবস্থা। ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ঘটলেও দায়ীদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বরং জনগণের টাকায় পুনরর্থায়ন হয়েছে…।

মুস্তফা কামাল : পাবলিক মানি রিফাইন্যান্সিং করে ক’দিন চালাবে। এভাবে বেশি দিন চলবে না। আরও একটা বিষয় আছে, আমি মনে করি, এতগুলো সরকারি ব্যাংক আমাদের দরকার নেই। যেহেতু এখানে বেসরকারি ব্যাংক অনেক হয়ে গেছে, সরকারি ব্যাংক একই কাজ করার জন্য থাকবে কেন? সোনালী, অগ্রণী, রূপালী ব্যাংকের শাখা একই ছোট্ট শহরে কাজ করছে। একই বাজারে প্রত্যেকের শাখা থাকার দরকার কী? এখন সময় এসেছে সোনালী ব্যাংককে সরকারের হাতে রেখে বাকি ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার। এ ক্ষেত্রে দুটো ব্যাংক মার্জার করে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পারে সরকার। তাতে অনেক প্রশাসনিক ব্যয় কমে আসবে। রূপালী ব্যাংকের সঙ্গে জনতা ব্যাংক ‘মার্জার’ করে ফেলতে পারে অথবা ‘অ্যামালগেমেইট’ করে দিতে পারে। তাহলেও খরচ অনেক কমে যাবে। জনগণের টাকাও ভর্তুকি দিতে হবে না। আরেকটি কাজ করা যেতে পারে জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক এগুলো একই কাজ করে। এদের ৫১ শতাংশ শেয়ার সরকারের হাতে রেখে বাকিটা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে। এটা করলে অনেক অর্থ সরকারের হাতে চলে আসবে। এ কাজ ইন্ডিয়াও করেছে। তারাও অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক প্রাইভেটাইজ করেছে। আমার মনে হয় বাংলাদেশও এ কাজটি করতে পারে।

বা. প্র : আবার উন্নয়নের প্রশ্নে আসি। সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মেগা প্রকল্প নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু পদ্মা সেতু ছাড়া অন্যগুলোর ব্যাপারে স্পষ্ট কিছু জানা যায়নি, কখন শুরু হবে কখনই বা শেষ হবে?

মুস্তফা কামাল : পদ্মা সেতু ছাড়াও মেগা প্রকল্পের মধ্যে মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ চলছে। রামপালেরও কাজ চলছে।

বা. প্র : শোনা গেছে, রামপাল থেকে অর্থায়ন ফেরত নিচ্ছে দুটি বিদেশি সংস্থা।

মুস্তফা কামাল : ওই টাকার দরকার নেই। এতে ৮ হাজার কোটি টাকা লাগবে। যারা চলে গেছে সমস্যা নেই। অন্যরা করবে। অনেকেই অর্থায়ন করতে চাইছে। রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প যেখানে হওয়ার সেখানেই হবে এবং অনেক দূর এগিয়ে গেছে। এখানে যে কয়লা ব্যবহার করা হবে, এটা অর্ডিনারি নয়। এখান থেকে যে কার্বন-ডাইঅঙ্াইড নির্গমন হবে তা খুবই কম। এতে পরিবেশ দূষণ হবে না এবং সুন্দরবন কোনোভাবেই অ্যাফেক্টেড হবে না। বিদেশে এ ধরনের অনেক প্ল্যান্ট আছে।

বা. প্র : গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়েও তো স্পষ্ট কিছু জানা যায়নি…।

মুস্তফা কামাল : মাতারবাড়ী নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে। হয় মাতারবাড়ী, নয় সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর হবে। তবে সোনাদিয়ার ক্ষেত্রে আমরা এখন ধীরে চল নীতি অনুসরণ করছি। মাতারবাড়ীতে ৮৮ হাজার ড্যাড ওয়েট টন ক্যাপাসিটির বন্দর হবে। প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক ব্যবস্থাগুলো বাড়লে এটা গভীর সমুদ্রবন্দর হিসেবে ব্যবহার করতে পারব আমরা।

বা. প্র : শুনেছি, জাপান মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর করার প্রস্তাব দিয়েছে, সরকারের সিদ্ধান্ত কী?

মুস্তফা কামাল : ওরাই করবে। যদিও এ ব্যাপারে এখনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। তবে তাদের এটি করার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

বা. প্র : পায়রাতেও গভীর সমুদ্রবন্দর করার কথা শোনা যাচ্ছে…

মুস্তফা কামাল : পায়রাতেও হবে। সেখানে আমরা এখন ফিজিবিলিটি স্টাডি করছি। এটি শেষ দিকে অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

বা. প্র : মেট্রোরেলের কী অবস্থা?

মুস্তফা কামাল : মেট্রোরেল জায়গা-জমি নিয়ে সমস্যা ছিল, এটি সমাধান হয়েছে। আগামী ডিসেম্বর নাগাদ মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ দৃশ্যমান দেখবেন। আর আমাদের এলএনজি টার্মিনালের কাজও চলছে। মোটামুটিভাবে অগ্রাধিকার প্রকল্পের কাজ চলছে। কোনো কিছুই স্থবির হয়নি।

বা. প্র. ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা ময়মনসিংহ ফোর লেন প্রকল্পের কাজও তো শেষ হয়নি।

মুস্তফা কামাল : এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে এ দুটি ফোর লেন প্রকল্পের কাজ শেষ হবে বলে আশা করছি আমরা।

বা. প্র : এই যে নিম্নমধ্য আয়ের দেশ থেকে উচ্চমধ্য আয়ের দেশে পৌঁছানোর কথা বলছেন, সেখানে যেতে গেলে মাথাপিছু আয় ৪ হাজার ১২৫ ডলার অতিক্রম করতে হবে। সরকারের হাতে এমন কী ‘ম্যাজিক’ আছে যা দিয়ে আগামী কয়েক বছরে প্রায় চার গুণ বাড়ানো হবে মাথাপিছু আয়?

মুস্তফা কামাল : ম্যাজিকটা হচ্ছে জাতি হিসেবে আমাদের শক্তি…। কোনো এক সময় আমাদের দেশের বেশির ভাগ লোকজন ছিল অশিক্ষিত! আজকে যে আসে সে-ই এবিসিডি পড়তে পারে। নিজের নাম লিখতে পারে। মোটামুটি এখন শিক্ষিত লোক পাওয়া যাচ্ছে। দেখুন আমার দেশে আজকে ৯৭ শতাংশ ছেলেমেয়ে স্কুলে যায়। ঝরে পড়ার সংখ্যাও কম। ১৫ বছর পরে একজনও পাওয়া যাবে না, সিএনজি ড্রাইভার অথবা রিকশাওয়ালা যারা ইংরেজি বলতে পারে না। তখন আমাদের কৃষকও হবে শিক্ষিত, গার্মেন্ট শ্রমিকও হবে শিক্ষিত। সুতরাং আমাদের পার-ক্যাপিটা আউটপুট অনেক বেড়ে যাবে, আমাদের প্রোডাকটিভিটি বাড়লে উন্নয়ন অনেক বেড়ে যাবে। তখন বিনিয়োগ কম দিয়েও বেশি উৎপাদন, বেশি উন্নয়ন সম্ভব। যখন মাথাপিছু উৎপাদন বাড়বে তখন আয়ও বাড়বে। আজকে এই যে আইসিটি (তথ্যপ্রযুক্তি) থেকে আসছি, সেখানে শত শত প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। ৫০টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আরও ১৫-২০টি আছে পাইপলাইনে। এগুলোর বেনিফিট পাবে জনগণ। আপনি দেখুন, বাংলাদেশের মতো জাতি পৃথিবীতে পাওয়া যাবে না। আমরা বিপদে পড়লে এক হয়ে যাই। খেলার মাঠে এক হয়ে যাই…। আমি আইসিসি থেকে রিজাইন করেছি তখন সবাই এক হয়ে গেছে। সেদিন কোনো আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি এমনকি পুরুষ-মহিলা কোনো বিভেদ ছিল না। যদি কোনো দুর্যোগ হয়, পানি উঠলে, বন্যা হলে সব মানুষ এক হয়ে যায়। তখন কে কোন দল করে, প্রশ্ন ওঠে না। এই যে মানুষের শক্তি এগুলো হলো ম্যাজিক। আরও একটা ম্যাজিক আছে, প্রতিযোগিতা। পৃথিবীর কোনো মানুষ একে অন্যের সঙ্গে এত প্রতিযোগিতা করে না। পাশের বাড়ি কী করে দেখেও না। আমার এখানে একজন ম্যাট্রিক পাস করেছে তোমারও করতে হবে। ওর ছেলে বিদেশে গেছে তোমারও যেতে হবে। ওর বাড়িতে ওয়াল আছে আমারও করতে হবে। এই যে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা এটাই আমাদের এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আর আমাদের ৫০ শতাংশের বেশি লোক ১৬ থেকে ৫৯ বছর বয়সী। এত বেশি কর্মক্ষম মানুষ পৃথিবীর কম দেশেই আছে। এটাকে বলা হয় ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট। এই যে আমি বিদেশে যাই। তুমি যদি শ্রীলঙ্কায় ৫টার পর কাজ করতে বলো, এক ঘণ্টার জন্যও কাউকে পাবে না। সেখানে সূর্য ডোবার পর কেউ কাজ করে না। এ দেশের মানুষ কাজে ‘না’ করে না। এই যে এত হাঙ্গামা, সহিংসতা চলল, তার পরও কিন্তু কেউ কাজ ছাড়েনি। কোন ফ্যাক্টরি বন্ধ ছিল, কার চাকরি চলে যাচ্ছে, কোন শ্রমিক বেতন পায়নি আমাকে বলতে পার?

বা. প্র : আপনি বললেন, খেলাধুলায় একতা আছে, দুর্যোগ-দুর্বিপাকে একতা আছে, কিন্তু রাজনৈতিক একতা যেটা উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেটা কেন নেই?

মুস্তফা কামাল : এটা কোনো দিনও হবে না। এটাও একটা প্রতিযোগিতা। আমি বহুদিন টকশোতে বলেছি, সেদিন একজন জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি তো সবই করবেন বলছেন, এই রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কীভাবে করবেন? আমি বলেছি, এর মধ্যেই হবে। এমন একদিন আসবে যখন টাকা দিয়েও হরতাল করার লোক পাওয়া যাবে না। হরতাল করলে পাবে ৫০০ টাকা, কাজ করলে পাবে ১ হাজার টাকা। সে হরতাল করতে আসবে কেন! এটা কিন্তু বাস্তব। এই যে হরতাল ফেল করছে এর কারণ কী? এখন কিন্তু অনেক কাজ। এ জন্য হরতাল ফেল করছে। মানুষ এখন কী চায়? মানুষকে আরেকটু সুশাসন দিতে হবে। সুশাসনটা কী? যারা অন্যায় করবে তাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যেতে হবে। সরকারকে এখানে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে হবে। প্রশাসনকে এখানে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে হবে। এটা সরকারকে করতে হবে। যারা অন্যায় করবে তারা যেন পার না পায় সে ব্যবস্থা নিতে হবে। আমার বিশ্বাস সরকার এটা করবে। যদি সরকার নীরব থাকে, তবে আমাদের ভালো কাজগুলো প্রকাশ হবে না। ভালো কাজ প্রকাশের জন্য হলেও সরকারকে কঠোর হতে হবে।

বা. প্র : এটা কি এ রকম যে, উন্নয়নের জন্য মালয়েশিয়ায় মাহাথির মোহাম্মদ যে ধরনের সরকার পরিচালনা করেছেন, আমরা সে ধরনের সরকারের দিকে যাচ্ছি?

মুস্তফা কামাল : আমি কোন ধরনের সরকার চাই এটা বলতে পারব না। আমার যে ধরনের দায়িত্ব আছে; মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে বলেছেন, কেবল উপরের দিকে তাকাবে না, ডানে-বাঁয়ে তাকাবে। উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম যা আছে তোমার একটিই কাজ, উন্নয়ন আর উন্নয়ন। আমাকে তিনি সেই সবক দিয়েছেন, যা আমি করছি। আমি উন্নয়ন ম্যাজিকেই এ দেশের মানুষকে সমৃদ্ধ করব। এ দেশের ছেলেরা যদি শিক্ষিত হয়, তারা যদি ঘরে বসে আয়-উপার্জন করতে পারে, তাহলে তারা আমাকে সমর্থন করবে না কেন? আমরা উন্নয়ন ম্যাজিকে বদলে দেব দেশ, দেশের মানুষকে।

বা. প্র : এ ক্ষেত্রে গণতন্ত্র কিছুটা ছাড় দিয়ে হলেও কি সরকার এই উন্নয়নের পথে হাঁটবে?

মুস্তফা কামাল : এ মুহূর্তে আমি উন্নয়ন ছাড়া কিছু বুঝি না। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর যদি পারে আমরা পারব না কেন? আমি ব্যক্তিগতভাবে খুশি হব, একটি শক্তিশালী বিরোধী দল থাকলে। আর সেটা হতে হবে প্রগ্রেসিভ বিরোধী দল। তাকে প্রো-অ্যাকটিভ হতে হবে। বিজনেসবান্ধব হতে হবে। মানুষ মারা-বান্ধব নয়। যদি প্রো-অ্যাকটিভ হয়, আসুক তারা, যা করতে চায় করুক। কিন্তু আমরা যা করেছি বিএনপি তা পারেনি। তারা ১ কেজি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারেনি। আমি ১ মেগাওয়াট বলব না, ১ কেজিই বলব। আমরা করেছি। আজ এমনিতেই উন্নয়ন হচ্ছে নাকি! ৬ শতাংশের ওপরে গ্রোথ রেট ছয় বছরে, এটা কি কল্পনা করা যায়! আমরা রাজস্ব আয় শুরু করেছিলাম ৪৯ হাজার কোটি টাকা দিয়ে, সেটা এখন এই বছর ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। সে জন্য আমি মনে করি, আমার কাজটি হচ্ছে শুধু উন্নয়ন। আমি উন্নয়ন মন্ত্রী, রাজনীতির মন্ত্রী নই।

আমার কাছে রাজনীতি হচ্ছে উন্নয়ন। এমনকি বিরোধী দলেরও উন্নয়ন দেখা উচিত। তাদের সহিংস রাজনীতি ত্যাগ করতে হবে। জিহাদি রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এলে তাদেরও মানুষ গ্রহণ করবে। তবে এ ক্ষেত্রে আমাদেরও ভালো করতে হবে। এটাও একটা প্রতিযোগিতা, যা একটু আগে বলেছি।

আর এখন বিএনপি নেই, এখন আমাদের আরও বেশি ভালো কাজ করতে হবে যাতে তাদের মুখটা বন্ধ হয়। এদের মুখ বন্ধ করার জন্য হলেও মানুষকে আরও সুশাসন দিতে হবে। আরও সুন্দরভাবে সরকার পরিচালনা করতে হবে।