শ্রীমঙ্গলে লাখ লাখ পরিযায়ী পাখির আশ্রয়দাতা এক ‘রাজার’ কাহিনী

দেশে মানবসৃষ্ট সংকট ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে নষ্ট হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। মাত্র কয়েক দশক আগেও এ দেশের গ্রামে-গঞ্জে চোখে পড়ত ঘন জঙ্গল কিন্তু আজ আর তা নেই। বনজঙ্গল পাতলা হয়ে আসায় বাসস্থানের অভাবে হারিয়ে গেছে অনেক পশুপাখি। পশুপাখির বিলুপ্ত হওয়ার অন্যতম কারণ তাদের খাদ্য ও নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র। যেখানে তারা বশংবৃদ্ধি করবে এমন নিরবচ্ছিন্ন পরিবেশ আজ নেই বললেই চলে। তার ওপর বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশ থেকে আনা এমন কিছু প্রজাতির গাছ লাগানো হয়েছে যেগুলোতে পাখিরা ভুলেও বসে না। ফলে গ্রাম-গঞ্জ এখন আর পাখ-পাখালির ডাকে মুখর নয়, মানুষের ঘুম ভাঙে না তাদের কলকাকলিতে। এই অবস্থায় নিরুপায় এসব পাখির জন্য নিরাপদ বসতির ব্যবস্থা করতে তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন শ্রীমঙ্গলের এক পাখিপ্রেমী নিভৃতচারী মানুষ। নাম তার মাস্টার গোলাম মোস্তফা রাজা।
আর্থিকভাবে সমৃদ্ধ পরিবারের সন্তান মোস্তফা রাজা। সপরিবারে থাকতেন ব্রিটেনে। কিন্তু তার দেশপ্রেম তাকে বিলাতের আয়েশী জীবন ত্যাগে বাধ্য করে। স্ত্রী-সন্তানদের লন্ডনে রেখেই এক সময় তিনি চলে আসেন দেশে। দেশে বেকার মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য গড়ে তোলেন শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওরে বিশাল ফিশারিজ ও হ্যাচারি। ফিশারিজকে ঘিরে হাওর পাড়ে নিজ হাতে গড়ে তোলেন হাজারো দেশীয় প্রজাতির গাছের বাগান। গাছগুলো একটু বড় হতেই সেসব গাছে আসতে থাকে রাতের বেলা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য অতিথি পাখিরা। সূর্য ডোবার একটু আগে তারা আসে এবং সূর্য ওঠার আগেই আবার তারা চলে যায় হাওরের জলে। কিন্তু তাদের ওপর কুদৃষ্টি পড়ে শিকারীদের। পাখি শিকারের জন্য বন্দুক হাতে অসংখ্য শিকারী ভিড় জমায় তার ফিশারিজের আশপাশে। এদের হাত থেকে পাখিগুলোকে রক্ষার জন্য তিনিও নেমে পড়েন তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে। ফিশারিতেই গড়ে তোলেন নিজের আবাসন। এক সময় ফিশারির পাশাপাশি পাখিদের দেখভাল করাই তার মূল কাজ হয়ে দাঁড়ায়। শিকারীদের ঠেকাতে এক সময় তাকে বেশ কয়েকজন পাহারাদারও নিয়োগ করতে হয়। সে লড়াইয়ে জিতে যান বিলেতফেরত রাজা।
পাখিদের আশ্রয়স্থল নিরাপদ হলে ক্রমেই বাড়তে থাকে পাখির সংখ্যাও। এখানে আশ্রয় নেয়া নানা প্রজাতির পাখির সংখ্যা কত তা সঠিক করে বলতে না পারলেও তার ফিশারির চারপাশের হাজারো গাছের ঝাঁকালো মাথা ঢেকে যায় পাখি আর পাখিতে, দূর থেকে দেখলে মনে হয় ফিশারি পাড়ের পত্রবিহীন গাছে গাছে সাদা-কালো ফুল ফুটে আছে। এভাবে কয়েক বছর পার হওয়ার পর পাখিরা তার এই জায়গাকে তাদের প্রজননের অনুক‚ল স্থান হিসেবে বেছে নেয়। খড়কুটো দিয়ে তারা তৈরি করতে থাকে বাসা। আর সে বাসায় বাচ্চা ফোটায়। প্রতি বছর এসব পাখির প্রজনন মৌসুমে পাখির সংখ্যা বাড়তে থাকে। বর্তমানে তার ফিশারিতে চোখে পড়ে লাখো পাখির বাসা। যেখানে নিরাপদে জন্ম নিচ্ছে পাখির বাচ্চা। শ্রীমঙ্গল শহরের ৭-৮ কিলোমিটার দূরে হাইল হাওরের প্রবেশমুখে রয়েছে তার এ পাখির অভয়ারণ্য। সেখানে গাড়ি বা কলখারখানার শব্দ নেই। সেই স্থান এখন শুধু পাখি আর পাখির কলকাকলিতে মুখর। সারাক্ষণ কিচিরমিচির
আর চিউচিউ শব্দ। নিভৃত সেই পাখির রাজ্যে পাখির কুজনের মাঝে নিমগ্ন সময় কাটে মাস্টার গোলাম মোস্তফা রাজার। আলাপকালে পাখিপ্রেমী রাজা জানান, এখন তার প্রাণের স্পন্দনই হচ্ছে এই পাখি। এই পাখিদের ছেড়ে কোথাও যেতে মন চায় না তার।
প্রতিদিন বহু পর্যটক আসেন তার এই পাখির রাজ্যে। পাখিরা বাসা বুনেছে, ডিম পাড়ছে এখানেই জন্ম নিচ্ছে লাখো পাখি। আজকাল সংরক্ষিত বনেও তো পাখিরা নিরাপদ নয়। যে গাছে বাসা বুনবে সে গাছের ওপরই রয়েছে চোরের নজর, সুযোগ পেলেই কেটে নিয়ে যাবে সব গাছ। তার এখানে গাছ কেটে নেয়ার আশঙ্কা নেই। গাছগুলো এখন অনেক উঁচু আর বড় হয়েছে। বিক্রি করলে হয়তো কোটি কোটি টাকা পাওয়া যাবে কিন্তু তিনি তা করতে রাজি নন। মোস্তফা রাজার একটাই কথা : পাখিরা যত দিন এখানে থাকবে এ গাছগুলো তিনি কাটবেন না।
সরজমি ন গিয়ে দেখা যায়, তার বাড়ির আঙিনার সবখানে পাখির পুরিসে ভরে আছে। এমকি পাখির জীবনযাত্রা বিঘ্নিত হতে পারে এমন আশঙ্কায় তিনি দুয়েকটি ফিশারিতে মাছ চাষই বন্ধ করে দিয়েছেন। আরো অবাক কাণ্ড হচ্ছে, এই পাখিদের প্রেমে শ্রীমঙ্গল শহরের বাড়ি ছেড়ে তিনি সপরিবারে এখানেই নিভৃতে থাকেন। এমনকি তার বাড়ির এক-দুই কিলোমিটাররের মধ্যে আর কোনো বসতিও নেই। এই প্রকৃতির কোলে বসবাসকারী পাখিপ্রেমী রাজার এই বাসস্থানকে স্থানীয় লোকজন নাম দিয়েছেন ‘রাজস্বর্গ’।
তার এই রাজস্বর্গের সঙ্গে শ্রীমঙ্গল শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থা একটু নাজুক। শহর থেকে ঢাকা অভিমুখে মতিগঞ্জ বাজারের আগে বিলাস নদীর পূর্ব পাড় হয়ে হাইল হাওর সংযোগ সড়ক দিয়ে আড়াই-তিন কিলোমিটার অর্ধেক পাকা ও অর্ধেক কাঁচা সড়কে পৌঁছাতে হয় রাজস্বর্গে।
পাখিপ্রেমীদের মতে, পাখি আমাদের প্রকৃতির অংশ আর এই রাজস্বর্গের অপার প্রকৃতিকে রক্ষার জন্য এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে।