উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ :স্বপ্ন ও বাস্তবতা

নিম্নমধ্যম আয়ের রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া একটি সুখকর অনুভূতি। একই সাথে এ দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য বেড়ে গেছে। কেননা নিম্নমধ্যম আয়ের রাষ্ট্রের ফাঁদে যেন বাংলাদেশ আটকে পড়ে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখা বাঞ্ছনীয়। বর্তমান সরকারের আমলে কেবল মাথাপিছু আয়ই বাড়েনি, পাশাপাশি জীবনমানও বেড়েছে। একই সাথে দারিদ্র্যের হার হ্রাস পেয়ে ২৩.৬% হয়েছে। যদি সামষ্টিক কল্যাণ বিবেচনা করে সামাজিক অগ্রগতি ও প্রগতি সাধিত করা যায়, তা হলে দেশের উন্নয়ন বেগবান হবে। যদিও বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে নিম্নআয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে জাতিসংঘ থেকে স্বীকৃতি পেতে আরো সময় লাগবে। আসলে বাংলাদেশের এ অর্জন একদিনে হয়নি। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩শ ১৪ মার্কিন ডলারে। এখন মাথাপিছু আয়ের এ হিসাবে বিশ্বে বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থান হচ্ছে ৫৮তম। এদিকে ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় হচ্ছে ৩ হাজার ১৯০ মার্কিন ডলার, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে এদেশের অর্থনীতির অবস্থান ৩৬তম। এ অবস্থা থেকে আরো উত্তরণ ঘটানোর জন্যে নানামুখী প্রয়াস গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। গত সাড়ে ছয় বছরে দেশের অর্থনীতিতে মোট দেশজ সম্পদের প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে গড়ে ৬ থেকে ৬.২৫% বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে এবং মূল্যস্ফীতির হার হ্রাস করে ৬.৩%-এ নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। মোট দেশজ সম্পদের প্রবৃদ্ধির হার চলতি বছরে যাতে ৭%-এর ওপরে বৃদ্ধি করা যায় সে জন্যে অহেতুক রাজনৈতিক হানাহানি বন্ধ করা বাঞ্ছনীয় হয়ে পড়েছে। নচেত্ দেশের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হবে। মানুষকে কষ্ট দিয়ে অর্থনৈতিক অগ্রগতি পেছানোর ষড়যন্ত্র বন্ধ করা দরকার।

আমাদের মানব উন্নয়ন সূচক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাতেও সরকার বেশ অগ্রগতি সাধন করেছে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে তার একটি প্রমাণ এই উত্তরণ। এ জন্য অভিনন্দন জানাচ্ছি সরকারকে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ২০২১ সাল নাগাদ আমাদের দেশকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করবেন। এ কারণে সর্বাগ্রে প্রয়োজন হচ্ছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য উভয় খাতে জিডিপি অনুপাতে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি। পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তারা সততা ও নিষ্ঠার সাথে এ খাতে কাজ করা প্রয়োজন। তাদের মধ্যে বাণিজ্যিকীকরণের যে প্রয়াস সেটি বন্ধ হওয়া দরকার। তবে কিছু বাস্তবমুখী পদক্ষেপের প্রয়োজন রয়েছে। যারা সরকারি ও বেসরকারি খাতে বিভিন্নভাবে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশের যে সামগ্রিক অগ্রগতি তাতে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখে চলেছে বেসরকারি উদ্যোক্তারা। কিন্তু এ উদ্যোক্তাদের মধ্যে কেউ কেউ বিদেশে অর্থ পাচারে লিপ্ত রয়েছে। যারা লিপ্ত রয়েছে তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন এবং যাতে দেশ থেকে পুঁজি পাচার না হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। পুঁজির ধর্মই হচ্ছে পেরিফেরা (Periphera) থেকে সেন্টারে যায়। যেহেতু বাংলাদেশের লক্ষ্য উচ্চমধ্যম আয়ের রাষ্ট্র ২০২১ সাল নাগাদ হওয়া সেহেতু মাথাপিছু আয় মার্কিন ডলার ৪১২৬-এ উন্নীত করতে হবে। এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড গত অর্থবছরে ১ লাখ ৩৬ হাজার ২৬৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকার রাজস্ব আদায় করেছে যা ২০১৩-১৪ অর্থবছরের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি। এটি এনবিআরের পূর্বের তুলনায় শক্তিশালী হওয়ার প্রমাণ। তবে এতে আত্মতুষ্টিতে ভোগার কারণ নেই। কেননা বাংলাদেশে এমন অনেক বিত্তশালী রয়েছেন যারা দেশে থেকে ঠিকমতো দেশের কর দেন না। ফলে বাড়তি চাপটা নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তকে সামাল দিতে হয়। কেননা এখনো এদেশের অধিকাংশ করদাতা তাদের কর প্রদানের সুফল ভোগ করেন না। এদেশে লক্ষাধিকের ওপর কোটিপতি রয়েছেন অথচ তারা নামমাত্র কর দেন। ফলে বাড়তি চাপ পড়ে নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর। এটি দুঃখজনক। দেশে যে একটি গণমুখী প্রয়াস গ্রহণ করা হয়েছে তার জন্য অর্থ প্রয়োজন। সে অর্থটি অবশ্যই অভ্যন্তরীণ সম্পদের মাধ্যমে আসতে হবে। কিন্তু এনবিআরের কিছু দুর্বলতার কারণে সেটি সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি যারা সব সময় যে কোনো সরকারের কাছাকাছি থাকেন বর্ণচোরা গ্রুপটি একটি মাফিয়া নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। তারা কর ফাঁকি থেকে শুরু করে বিভিন্ন দুর্বৃত্তায়নে সম্পৃক্ত থাকেন বিভিন্ন সরকারের আমলে। একটি উদাহরণ দিলেই যথেষ্ট—চলতি অর্থবছরের যে বাজেট সেখানে নিম্নস্তরের সিগারেটের দামে অর্পিত শুল্কের হার কমানো হয়েছে। ১৯ টাকা থেকে এটি ১৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই শুল্কের হার হ্রাস করার কোনো যৌক্তিকতা ছিল না। বরং আরো বাড়ানো উচিত ছিল। কেননা এই সিগারেট খেলে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হবে এবং আমাদের শ্রমিক কর্মী ও সাধারণ পেশাজীবীরা অসুস্থ হবে। যখন জনস্বার্থের বিষয়টি আসে তখন অবশ্যই আমাদের দীর্ঘমেয়াদের চিন্তা রাখতে হবে। কর নির্ধারণের ক্ষেত্রে ধনিক শ্রেণিকে অবশ্যই কর তুলনামূলকভাবে বেশি দেয়ার ব্যবস্থা করা বাঞ্ছনীয়। দেশপ্রেম থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে কর দেয়ার জন্যে ধনবান শ্রেণিকে উদ্বুদ্ধ হতে হবে।

যদি হিংসাত্মক ধ্বংসাত্মক জঙ্গিবাদী ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালিত না হয় এবং অপরাজনীতি যদি রাজনীতিবিদরা না করেন, তা হলে এই ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব নয়। চলতি অর্থবছরের রপ্তানি মূল্যের ওপর প্রস্তাবিত উেস কর ১ শতাংশ থেকে হ্রাস করে ০.৬ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ এবং বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ওপর ভ্যাটের হার ১০ শতাংশ থেকে হ্রাস করে ৭.৫ শতাংশ করা হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী বাজেটে স্বল্প বরাদ্দের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তবে যেটুকু আছে, তা যেন সদ্ব্যবহার করা হয়। হাতেগোনা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান মোটামুটি ভালো থাকলেও বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে ও বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের অবস্থা যাচ্ছেতাই। এগুলো গুণগত মানম্পন্ন করতে হলে সরকারের পাশাপাশি এই প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোক্তাদের আরো সতর্ক হতে হবে। নচেত্ দীর্ঘমেয়াদে দেশের ক্ষতি হয়ে যাবে। প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়ন করা দরকার। পারিবারিক শিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষা নৈতিকতা এবং আদর্শ মানব হিসেবে গড়ে ওঠার ভিত্তিভূমি। চলতি বাজেটের মোট রাজস্ব খাতের ৪৭.৭৩ শতাংশই খরচ হবে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন ভাতা এবং সুদ প্রদানের ওপর। এটি আসলে একটি সমস্যার বিষয়। কেননা বেতন-ভাতাদি যেমন দিতে হবে, তেমনি সুদ কম দিয়ে উত্পাদনশীল খাতে যদি ব্যয় করা যায় তা হলে আরও লাভ হয়। আসলে লাগসই প্রযুক্তির ব্যবহার ও টেকসই উন্নয়ন এ দেশকে একটি শক্তিশালী ভিতের ওপর দীর্ঘমেয়াদে দাঁড়াতে সাহায্য করবে। বর্তমান সরকারের আমলে যারাই অন্যায় করছে তাদেরকেই বিচারের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। তবে হ্যাঁ এটি আরও দ্রুত এবং সুষ্ঠুভাবে হওয়া উচিত। রাজউকে গিয়ে দেখা গেছে, পিয়ন থেকে শুরু করে শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিটি লোক কম-বেশি দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। আসলে অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্তব্যকর্মে দেখা গেছে তারা কাজ করেন ব্যক্তিগত স্বার্থ ও লোভ-লালসায়। অথচ ভুলে যান, জনগণের ট্যাক্সের টাকায় তাদের বেতন-ভাতাদি হয়। নাগরিক হিসেবে ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা বাঞ্ছনীয় হয়ে পড়েছে। দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়িত করা দরকার। অনেকগুলো ফ্রন্টে না করে কেন্দ্রীভূতভাবে কাজ করলে তা বেশি ফলদায়ক হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর অত্যন্ত দক্ষ এবং তিনি ফিন্যান্সিয়াল ইনক্লুশনসহ দেশের মুদ্রানীতি পরিচালনায় অনেক কাজ করেছেন। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে অনুরোধ থাকবে বাংলাদেশ ব্যাংকে এমন একজন ডেপুটি গভর্নর প্রয়োজন যিনি ন্যূনতম পক্ষে ২৫ বছর বাণিজ্যিক ব্যাংকে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন। যার মধ্যে যে কোনো বড় ব্যাংকে এমডি পদে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। আসলে বাণিজ্যিক ব্যাংকের সম্পর্কে অভিজ্ঞতা না থাকলে বাণিজ্যিক ব্যাংকের তদারকি সুষ্ঠুভাবে হয় না। হলমার্ক কেলেঙ্কারি হোক, বিসমিল্লাহ গ্রুপের কেলেঙ্কারি হোক, বিদেশি ব্যাংকে এমআইসিআর চেকে জালিয়াতি হোক সবগুলো কিন্তু একই সূত্রে গাঁথা।

২০১৪ সালে দেখা যাচ্ছে, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশ থেকে প্রেরিত অর্থের পরিমাণ বেড়ে গেছে। আমাদের দেশে ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানি বেড়েছে বলে আমদানি তালিকায় দেখা গেলেও এই ক্ষেত্রে ওভার ইনভয়েসিং হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। যার একটি বড় অংশই দেশ থেকে অর্থ পাচারে সহায়তা করেছে। এই অর্থ পাচারের সঙ্গে মানব পাচার খুব জোরালোভাবে জড়িত। আগে নারী ও শিশু পাচার হতো। এখন পুরুষরাও পাচার হচ্ছে এবং লোমহর্ষক বিবরণ পত্রপত্রিকায় বেরিয়ে আসছে। শুধু দেশি গডফাদার নয় আন্তর্জাতিক গডফাদাররাও এই কাজে লিপ্ত। দেশের তরুণ প্রজন্মকে মাদকের ছোবল থেকে বাঁচাতে হবে। তাদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে প্রয়াস তা বাস্তবায়ন করতে হলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের এদেশে বিনিয়োগে উত্সাহিত করতে হবে।

দেশের ১৫টি শিল্প গ্রুপ সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকার ঋণ পরিশোধ না করে বরং পুনর্গঠনের আবেদন করেছে, এভাবে ঋণ যদি পরিশোধ না করা হয় তা হলে তা দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত এবং বেসরকারি উভয় খাতের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিতে পারে। এ জন্য সুপারিশ হচ্ছে ঋণ কাঠামো পর্যালোচনা করে প্রকল্প যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে ঋণ পুনর্গঠনের আবেদন মঞ্জুর করা। নচেত্ বাণিজ্যিক ব্যাংকিং খাত আবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বস্তুত ব্যাংকিং খাতের দুর্নীতি বন্ধে পূর্ব থেকে ব্যবস্থা নেয়া দরকার। কেননা এদেশে পুঁজি বাজার আক্ষরিক অর্থে গড়ে ওঠেনি। সঞ্চয়-বিনিয়োগে ভারসাম্য সৃষ্টি, অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহ বন্ধ এবং প্রাথমিক পণ্য উত্পাদনের ক্ষেত্রে প্রটেকশান দেয়া বাঞ্ছনীয়।

বাংলাদেশে এ বছর রেকর্ড পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাসীরা প্রেরণ করেছেন। যা ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি। এই ধারা অব্যাহত থাকলে এবং বৈদেশিক মুদ্রার একটি বড় অংশ যদি উত্পাদনশীল খাতে ব্যয় করা হয়, সঞ্চয় এবং বিনিয়োগ ব্যবস্থার মধ্যে ভারসাম্য আনা যায় তা হলে তা দেশের জন্য ভালো হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় প্রবাসীদের দেশে বিনিয়োগের জন্যে নানা হেল্প ডেস্ক রয়েছে বলে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক দাবি করে থাকে। কিন্তু বাস্তবতা হলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই। আবার বিদেশ থেকে যারা ফান্ড এনে থাকেন, তারা কোথায় কীভাবে খরচ করছেন সে ব্যাপারে এনবিআরকে সতর্ক হতে হবে। নচেত্ তারা তাদের প্রাপ্ত ফান্ডের বড় অংশ বিদেশে পাচার করবেন।

বাংলাদেশ এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের যে ইতিবাচক ভূমিকা সেটি আরও গতিময়তা পাবে যখন আমরা সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারব। দেশে উদ্যোক্তা তৈরির যে প্রয়াস বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রহণ করেছে সেটি একটি উল্লেখযোগ্য দিক। উদ্যোক্তা তৈরির বিকল্প নেই। সরকার সামাজিক ও ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে প্রয়াস নিয়েছেন। কর্ণফুলী টানেল তৈরির প্রয়াসটি একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে এদেশে একটি প্রকৃতিগত সমস্যা রয়েছে— চাষাবাদযোগ্য জমির পরিমাণ। এককালে কৃষি চাষের জন্য সার চেয়ে কৃষক নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে অথচ এখন এ ধরনের সমস্যা নেই। এশিয়ান ইনফ্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের ৫৭ রাষ্ট্রের মধ্যে ৫০ রাষ্ট্র চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এ চুক্তিতে বাংলাদেশ, চীন, ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন রাষ্ট্র রয়েছে। আশা করা যায়, এশিয়ান ইনফ্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক যদি যথাযথভাবে কাজ করে তা হলে বিশ্বব্যাপী বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফের মোড়লিপনা কমবে এবং স্বচ্ছতা অবকাঠামোগত উন্নয়নে একটি বিশাল ভূমিকা থাকবে। বর্তমান সরকার যে অর্থনৈতিক নীতি লুকিং অ্যাট দ্য ইস্ট। এটি জিইও পলিটিক্যাল কারণে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি সুন্দর রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে উঠতে হলে ভারত, নেপাল, ভুটানের সঙ্গে যে কানেকটিভিটি হচ্ছে সেটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়, তেমনি শেষ পর্যন্ত এটি চীনকে সংযুক্ত করা গেলে যেমন সাড়ে ৩ হাজার বছর আগে সিল্করোড ছিল, সে রোড পুনরায় চালু করা গেলে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার অনেক বাড়বে। আমাদের দেশ যেহেতু ২০২১ সালে উচ্চমধ্যম আয়ের রাষ্ট্রে পরিণত হবে তাই গ্রাম ও শহরের মধ্যকার বিভাজন কমাতে হবে এবং ঢাকার ওপর বাড়তি চাপ হ্রাস করার জন্য বিভিন্ন স্থানে স্যাটেলাইট টাউন প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নিতে হবে। মর্যাদাবান জাতি হিসেবে বেঁচে থাকতে হলে সামাজিক ন্যায়বিচার এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সুফল সাধারণ জনমানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে। ব্লু ইকোনমি যথাযথ ব্যবহার করে দেশের গ্যাস সঙ্কট মোকাবেলা, বস্ত্র আহরণ ও উত্পাদন বৃদ্ধি, জলজ ও খনিজ সম্পদের ব্যবহার এবং সামুদ্রিক অর্থনীতির অন্যান্য সম্পদের সুবিধা দেশের মূল অর্থনৈতিক ধারায় প্রয়োগ করতে হবে। আশা করা যায়, বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার প্রয়াসে কোনো ধরনের রাজনৈতিক অপশক্তি দ্বারা মন্থর হবে না।

n লেখক: ম্যাক্রো ও ফিন্যান্সিয়াল ইকোনমিস্ট ও শিক্ষাবিদ