স্থিতিশীলতা ফেরায় ইতিবাচক বাংলাদেশের অর্থনীতি

কয়েক মাসের রাজনৈতিক সংঘাত পেরিয়ে স্থিতিশীলতা ফেরায় বাংলাদেশের অর্থনীতি ইতিবাচক পথে এগোচ্ছে বলে মনে করছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান এইচএসবিসি। ‘বাংলাদেশ গেটিং বেক টু বিজনেস’ শীর্ষক এ প্রতিবেদনে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড জোরালো হওয়ায় বাংলাদেশের প্রশংসা করে বলা হয়, রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে ওঠার পর বাংলাদেশকে এখন সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক খাতগুলোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এর আগের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে নেতিবাচক পূর্বাভাস দিয়েছিল এইচএসবিসি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক সংঘাত কেটে যাওয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আবারও চাঙ্গা হচ্ছে। আশা করা যায় বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ওপর থাকবে, মূল্যস্ফীতি কমে এসেছে এবং সাম্প্রতিক বাজেটে বেশ কিছু ব্যবসাবান্ধব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা জোরদার করতে সরকার বেশ কিছু বড় বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহও অব্যাহতভাবে বাড়ছে, সাফল্য আসছে রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতেও। সেই সঙ্গে চাঙ্গা হচ্ছে পুঁজিবাজার। এতে করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়বে বলেও মনে করে ব্রিটিশ এ আর্থিক প্রতিষ্ঠান।

এইচএসবিসির বিশ্লেষকরা বলেন, ‘এসব দিক বিবেচনা করেই আমরা বাংলাদেশকে নেতিবাচক থেকে ইতিবাচক মান দিচ্ছি।’ এইচএসবিসির মতে, পাঁচটি অনুঘটক বাংলাদেশের ইতিবাচক ইক্যুইটি মার্কেটের গতিপ্রবাহে ভূমিকা রাখছে। সেগুলো হচ্ছে-সামষ্টিক অর্থনীতি, পোশাক রপ্তানি, অভ্যন্তরীণ চাহিদা, ব্যাংকিং খাত এবং শেয়ারবাজার।

সামষ্টিক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম ও শ্রীলঙ্কার চেয়েও ভালো প্রবৃদ্ধি করছে বাংলাদেশ। তাই এইচএসবিসির অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, চলতি অর্থবছর এবং আগামী অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ওপরে থাকবে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, কয়েক মাসের অবরোধে বাংলাদেশের রপ্তানি ব্যাহত হলেও তা আবারও ভালো হচ্ছে।

পোশাক খাত ও রেমিট্যান্সকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় দুটি স্তম্ভ হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের রপ্তানি নিয়ে আমরা দারুণ আশাবাদী। যদিও গত অর্থবছরের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশা পূরণ করেনি। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাব অনুযায়ী বিদায়ী অর্থবছরে রপ্তানি হয় ৩১.২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। এতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এসেছে ৩.৩৫ শতাংশ। যা সরকারের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম। কিন্তু এর মধ্যে জানুয়ারি থেকে এপ্রিল চার মাস রয়েছে যখন টানা অবরোধে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বিশেষ করে পোশাক খাত। যা রপ্তানির ৮০ শতাংশ ও জিডিপির ১৫ শতাংশ পূরণ করে। অবরোধের কারণে গত অর্থবছরে সরকারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি পোশাক খাত। এ ছাড়া কারখানার মান নিয়েও বিদেশি ক্রেতাদের পরিদর্শন ও সংশয়ের মধ্যে থাকতে হয়েছে। তবে অবরোধ কেটে যাওয়ার পর পোশাক খাতের রপ্তানি আবারও বাড়তে শুরু করে। সামনের সময়গুলোতে এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে, যদিও পোশাক খাতকে আরো কিছু ঝুঁকি মোকাবিলা করেই সামনে এগিয়ে যেতে হবে।’

বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেক চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স। প্রতিবেদনে বলা হয়, রেমিট্যান্সের অন্তঃপ্রবাহ জিডিপির ৮ শতাংশ। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ১৫.৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স অর্জন করেছে। যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৭.৫ শতাংশ বেশি। আশা করা যায়, সামনের মাসগুলোতেও রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী থাকবে। বাংলাদেশের প্রবাসীদের জন্য সম্ভাবনার একটি বড় দিক হচ্ছে গত ১ ফেব্রুয়ারি সৌদি আরব তাদের শ্রমবাজার খুলে দিয়েছে। অন্যদিকে রেটিং এজেন্সি স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওরস বাংলাদেশের সভরেইন ঋণমান ‘বিবি’ পুনর্ব্যক্ত করেছে। যা বাংলাদেশের সতেজ প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও গত এপ্রিলে বেড়ে হয়েছে ২৪ বিলিয়ন ডলার। যা যেকোনো সময়ের চেয়ে সর্বোচ্চ। এ রিজার্ভ দিয়ে সাত মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো যাবে। এইচএসবিসির বিশ্লেষকরা মনে করেন, ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়ালেও টাকা মুদ্রা হিসেবে স্থিতিশীল থাকবে। ব্যাংকিং খাতও ইতিবাচক ধারায় এগোচ্ছে।

এইচএসবিসি মনে করে, বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে উন্নয়নের ফলে অভ্যন্তরীণ আয় ও চাহিদাও বাড়বে। ভোক্তা আস্থা ও চাহিদা বাড়ানোর ক্ষেত্রে বেসরকারি খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ ছাড়া নতুন অর্থবছরের বাজেট ব্যবসাবান্ধব হয়েছে। এতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা দেশে বিনিয়োগ উৎসাহিত করবে। বাজেটে করপোরেট করহার কমানো এবং জ্বালানিতে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ উৎসাহব্যঞ্জক।

Views: 43