চারটি সুখবর

লেখক: হাসনাত আবদুল হাই
কথাশিল্পী ও সাবেক সচিব

কথায় বলে দুঃসংবাদ কখনো একা আসে না, একটার পর আর একটা আসে, হয়তো আরো একটা। কিন্তু সুখবরও যে একের পর এক আসতে পারে সেই অভিজ্ঞতা হলো বাংলাদেশের। প্রায় একই সঙ্গে খবরগুলো পাওয়া গেল মিডিয়ার মাধ্যমে। নতুন অর্থ বছরের শুরুতেই যখন পাওয়া গেল খবরগুলো সেক্ষেত্রে ভাবতে বাধা নেই যে বছরটা ভালই যাবে। বাংলাদেশের ভাগ্যে সুখবর খুব বেশি থাকে না তাই চারটি খবর পেয়ে যথেষ্ট তৃপ্তি পাওয়া গেল।

প্রথম সুখবরটি হলো ধনী রাষ্ট্রের কাতারে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্ব অর্থনীতির পর্যালোচনায় এবং র্যাংকিংয়ের ক্রমানুসারে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ৩১তম। ইংল্যান্ডভিত্তিক আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রাইস ওয়াটার হাউস (পিডব্লিউসি) এ তথ্য জানিয়েছে। সংস্থাটির মতে আগামী ২০৫০ সালে অর্থাত্ ৩৫ বছর পর বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান হবে ২৩তম। ন্যূনতম উন্নয়নশীল (এলডিসি) অর্থনীতির দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে উন্নত বিশ্বের পর্যায়ে চলে আসবে বাংলাদেশ। সংস্থাটির মতে বাংলাদেশের অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান যে বিকাশ ঘটছে তাতে এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায় যে, উদীয়মান (এমার্জিং) অর্থনৈতিক শক্তির দেশটি আগামী ৩৫ বছরের মধ্যে শক্তিশালী অর্থনৈতিক দেশে পরিণত হবে। এমন কি ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে বাংলাদেশ।

অর্থনৈতিক র্যাংকিংয়ে আগামী ১৫ বছরে অর্থাত্ ২০৩০ সালে বাংলাদেশ দ্বিতীয় ধাপে উন্নীত হবে। অর্থাত্ ৩১তম স্থান থেকে ২৯তম স্থানে চলে যাবে। এই ১৫ বছরে বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি হবে শতকরা ৫ ভাগ। ধারণা করা হচ্ছে ২০৩০ সালে মোট জিডিপি এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা (পিপিপি) হবে ১ লাখ ২৯ হাজার ১০০ কোটি ডলার। এবং ২০৫০ সালে পিপিপি হবে ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৭০০ কোটি ডলার। বর্তমান সময় থেকে জিডিপি বৃদ্ধি পাবে ৫৩ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। যে দেশের শতকরা ২২ ভাগ মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে সেই দেশ আগামী ৩৫ বছরের মধ্যে ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হবে, এটা ভাবতে অবাক তো লাগেই, রোমাঞ্চও অনুভূত হয়।

পিডব্লিউসির সূত্রানুসারে ২০৫০ সালে বিশ্ব অর্থনীতি কেমন হবে, এই পর্যালোচনায় দেখা যায় উদীয়মান অর্থনীতির (এমার্জিং) যে আটটি দেশ ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ একটি। সূত্রানুসারে বাংলাদেশে দ্রুত প্রবৃদ্ধি ঘটবে এবং অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী সুফল বয়ে আনবে। বাকি যে সাতটি দেশ উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে তার মধ্যে রয়েছে ফিলিপাইনস, কলম্বিয়া, মিশর, ইরান, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডস। আগামী সাড়ে তিন দশকে যে দশটি দেশের দ্রুতগতিতে উন্নতি হবে তার সবই উন্নয়নশীল দেশ। এর মধ্যে ৭টিই দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার এবং বাকি তিনটি দেশ আফ্রিকা মহাদেশের অন্তর্ভুক্ত। পিডব্লিউসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০৫০ সালে যে ৩২টি দেশ বিশ্বের বৃহত্ অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে এবং বিশ্বের মোট জিডিপির শতকরা ৮৪ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করবে তার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। সংস্থাটির মতে পৃথিবী জুড়ে শতকরা ৩ ভাগ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটবে কিন্তু উন্নয়নশীল বিশ্বে যেহেতু বিশাল জনসংখ্যার কারণে কর্মসংস্থান বেশি হবে সেহেতু এই অঞ্চলে প্রবৃদ্ধি শতকরা ৬ ভাগের বেশি হতে পারে। এমন কি ২০৫০ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল বিশ্বের জিডিপি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার থেকে তিনগুণ বেশি হতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য দ্বিতীয় সুখবরটি প্রথমটির প্রতিফলন বলা যেতে পারে। এই দুটি সুখবর একই শ্রেণির। বিশ্বব্যাংকের সমীক্ষায় বাংলাদেশ এখন নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। ২০১৪ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ১০৮০ মার্কিন ডলার যা নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে পরিগণিত হবার চেয়ে বিশ্বব্যাংকের মানদণ্ডে বেশি। বাংলাদেশ প্রায় চল্লিশ বছর নিম্ন আয়ের দেশ হিসাবে বিবেচিত হয়েছে। নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত হবার জন্য একটি দেশের মোট জাতীয় আয় ১০৪৬ মার্কিন ডলার হবার শর্ত রয়েছে। বাংলাদেশ এই শর্ত পূরণ করেছে। বাংলাদেশ এখন আগের মত বৈদেশিক সাহায্যে নির্ভর নয়। বর্তমানে বৈদেশিক সাহায্য মোট জাতীয় উত্পাদনের শতকরা ১.৮ ভাগ। ত্রিশ বছর আগে এই শতকরা ছিল ৮ ভাগ।

নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ বহির্বাণিজ্যে ২০২১ সাল পর্যন্ত সুবিধা উপভোগ করবে। সেই পর্যন্ত তার নিম্নতম উন্নত দেশের অবস্থান অক্ষুণ্ন থাকবে। এর কারণ নিম্নতম দেশ থেকে উত্তরণ এবং বিশ্বব্যাংকের আয়ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কোনো দেশ নিম্নতম উন্নত হলে বাণিজ্যে সুবিধা পায় আর বিশ্বব্যাংকের আয়ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণ করে। বাংলাদেশ বর্তমানে রেয়াতী হারে বিশ্ব ব্যাংক থেকে ঋণ পায়। কিন্তু এর বাজারভিত্তিক বাণিজ্যিক ঋণ পাবার যোগ্য নয়। শেষেরটি নির্ভর করে ঋণ পরিশোধের যোগ্যতার ওপর। বাংলাদেশ যতই উন্নত হবে তার সরকারি এবং বেসরকারি খাত কম হারের সুদে বাণিজ্যিক ঋণ পাবার যোগ্য হবে।

প্রতি বছর ১ জুলাই বিশ্বব্যাংক পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অর্থনীতির আয়ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস করে থাকে। এর ভিত্তি হয় আগের বছর মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়ের হিসাব। নিম্ন-মধ্যম উন্নত দেশ হবার ফলে বাংলাদেশ বেশ কিছু সুবিধা উপভোগ করবে। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের জন্য লেটার অফ ক্রেডিট খোলার খরচ হ্রাস করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের সরকারি ঋণ সংশ্লিষ্ট ঝুঁকিও কমে আসবে। অবশ্য উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে যখন বাংলাদেশ উন্নীত হবে তখন ঋণদাতারা রেয়াতি হারে আর ঋণ দেবে না। সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে বাংলাদেশের এখনো কিছু সময় নেবে। এক হিসাবে এটা হতে পারে ২০২১ সালে। উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ হতে হলে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় হতে হবে ৪০০০ মার্কিন ডলারের ওপর।

নিম্নতম আয়ের দেশে উন্নীত হলেও সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাদেশ বাণিজ্যিক সুবিধা হারাবে না। এর জন্যে সময় দেয়া হয়। এই সময়ের ভেতর বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারবে। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক কাউন্সিল (ইকোসক) কোনো দেশ নিম্নতম আয়ের দেশ এলডিসি হবে কিনা তা নির্ধারণ করে। প্রতি তিন বছর পর পর নিম্নতম দেশের এই শ্রেণিবিন্যাস করা হয়ে থাকে। সরকারি সূত্র মতে ২০১৮ সালের মধ্যে নিম্নতম আয়ের দেশের শ্রেণি থেকে বেরিয়ে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ হিসাবে উন্নীত হওয়া এবং নিম্নতম উন্নত দেশের শ্রেণি থেকে উত্তরণ প্রক্রিয়া বাংলাদেশে একই সঙ্গে চলেছে। একটি অন্যটির সম্পূরক। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক শ্রেণিবিন্যাসে মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে বাংলাদেশ বর্তমানে ৩৫তম দেশ। এই হিসাবের সঙ্গে প্রাইস ওয়াটার হাউস সংস্থার মিল রয়েছে। বিশ্ব ব্যাংকের র্যাংকিং অনুযায়ী বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। ২০১৪ সালে বাংলাদেশের মোট জাতীয় উত্পাদন ২০১৩ এর তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে শতকরা ৭.৬৬ ভাগ। ২০১৩ সালে মোট জাতীয় উত্পাদন ছিল ৪৬১.৬৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যা ২০০৫ সালের দ্বিগুণ।

তৃতীয় সুখবরটি হলো অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন এ্যান্ড ডেভলপমেন্ট (ওইসিডি) বাংলাদেশের ঋণ সম্পর্কিত ঝুঁকি এক ধাপ নিচে কমিয়েছে। স্থির এবং উচ্চহারে প্রায় এক দশকের ওপর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে দুর্বলতা সত্বেও এই উন্নতি প্রশংসা অর্জন করেছে। এর ফলে বৈদেশিক খাতে পরিশোধের ক্ষমতা বাংলাদেশের বৃদ্ধি পাবে। তিনটি শর্তের ওপর এই ক্ষমতা নির্ভর করে: রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং আর্থিক। এই তিনটি বিষয়ের সাহায্যে আর্থিক ঝুঁকির শ্রেণিবিন্যাস করা হয়ে থাকে এবং ঝুঁকির জন্য কত প্রিমিয়াম দিতে হবে তা নির্ধারিত হয়। গত জুন মাসে ওইসিডি’র বাংলাদেশের ঋণ ঝুঁকি হ্রাস করতে সিদ্ধান্ত নেয়। ওইসিডি’র হিসাবে বাংলাদেশ ঋণ ঝুঁকিতে পাকিস্তান, শ্রীলংকা, নেপাল এবং মায়ানমারকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। বাংলাদেশের মত ভূটানও ঋণ ঝুঁকির শ্রেণিতে ৬ থেকে ৫ এ উন্নীত হয়েছে। অপরদিকে নেপাল ও মায়ানমার ১ ধাপ নিচে নেমে গিয়েছে।

বাংলাদেশের ঋণ ঝুঁকির সবচেয়ে বড় অন্তরায় রাজনৈতিক অস্থিরতা। এই সমস্যার সমাধান হলে বৈদেশিক সংস্থা এবং বৈদেশিক পুঁজি বিনিয়োগকারীরা অধিকসংখ্যায় পুঁজি বিনিয়োগে এগিয়ে আসবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে বৈদেশিক বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।

চতুর্থ ভালো খবরটি অপ্রত্যাশিত নয়, কিন্তু তবু উত্সাহজনক। ২০১৪-২০১৫ অর্থ বছরের শেষে বিদেশ থেকে পাঠানো রেমিট্যান্স রেকর্ড স্থাপন করেছে। রেমিট্যান্সের পরিমাণ ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে। এর আগে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল ১৪.৪৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। গত বছরের তুলনায় প্রাপ্ত রেমিট্যান্সের পরিমাণ শতকরা ৭.৫ ভাগ বেশি। রেমিট্যান্স প্রাপ্তির ভিত্তিতে বাংলাদেশ পৃথিবীর অষ্টম দেশ। সরকারি তত্পরতায় সৌদি আরবে অধিক শ্রমিক নিয়োগ রেমিট্যান্স বৃদ্ধির একটি প্রধান কারণ।

রেমিট্যান্স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এর সদ্ব্যবহারের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। এই অর্থ উত্পাদনশীর খাতে ব্যবহূত হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে রেমিট্যান্স উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।