বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন রেকর্ড

এ ধারা অব্যাহত থাক

দেশে ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ আন্তরিক হবে এটাই সবার প্রত্যাশা। আর এই প্রত্যাশা পূরণে প্রশংসনীয় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে বর্তমান সরকার। গত ছয় বছরে দ্বিগুণেরও বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করার পাশাপাশি গত রোববার মাত্র এক ঘণ্টায় আট হাজার ৩২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাইলফলক স্পর্শ করেছে বিদ্যুৎ খাত, যা অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। অনস্বীকার্য যে, মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বিদ্যুতের চাহিদা অপরিসীম। এছাড়া দেশের সমৃদ্ধির জন্য শিল্পকারখানা চালু রাখতে গেলেও বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। যত দিন যাচ্ছে ততই বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। এই প্রাসঙ্গিকতায় যদি চাহিদামতো বিদ্যুতের জোগান না পাওয়া যায় তবে একটি দেশের শিক্ষা, প্রযুক্তি, উৎপাদন সবকিছুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে_ এতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই দেশের উন্নয়নকল্পে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে সুনজর ও কার্যকর পদক্ষেপের কোনো বিকল্প নেই। দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের লক্ষ্যেই এই খাতকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা সমীচীন।

গতকাল গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে স্পষ্ট, বিদ্যুৎ উৎপাদনে সর্বোচ্চ গ্যাস সরবরাহ ও তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু থাকায় রেকর্ড পরিমাণ উৎপাদন আসে। পিডিবির তথ্যমতে, রোববার দেশের কোথাও তেমন লোডশেডিং ছিল না। চাহিদা অনুযায়ী পুরো বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে। ২০১৪ সালের ১৮ জুলাই একসঙ্গে সর্বোচ্চ সাত হাজার ৪১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছিল। এবার সেই রেকর্ড অতিক্রম করে দাঁড়িয়েছে আট হাজার ৩২ মেগাওয়াটে। এছাড়া চলতি বছরের এপ্রিল মাসে সাত হাজার ৪৩৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়েছিল। চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন বর্তমান সরকারের জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু সরকার দৃঢ়তার সঙ্গে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষমতার পরিচয় দিয়ে চলেছে। এটি নিঃসন্দেহে সরকারের একটি অন্যতম অর্জন।

তথ্যমতে, রোববার রেকর্ড পরিমাণ এই উৎপাদন এসেছে গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৪ হাজার ৯৭৮ মেগাওয়াট, তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ২ হাজার ৪০ মেগাওয়াট, কয়লা থেকে ৭৫ এবং জলবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ১২৪ মেগাওয়াট। এছাড়া ভারত থেকেও পাওয়া গেছে ৪৫৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। বিদ্যুতের এই রেকর্ড উৎপাদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলাদেশের সমমানের কোনো দেশ এত অল্প সময়ে বিদ্যুৎ খাতে এমন সফলতার দেখা পায়নি। তবে সমালোচকরা মনে করেন, বর্তমান সরকারের গত শাসনামলে রেন্টাল-কুইক রেন্টাল পদ্ধতি এবং সুন্দরবনের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে বিতর্ক এবং গত বছরের নভেম্বরে জাতীয় সঞ্চালন লাইনে ত্রুটির কারণে সরকারের সাফল্য কিছুটা হলেও মস্নান হয়েছে।

বর্তমান দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, দেশে বিদ্যুতের দৈনিক গড় চাহিদা প্রায় সাড়ে ৭ হাজার মেগাওয়াট। এছাড়া প্রতিনিয়ত এই চাহিদা ঊর্ধ্বমুখী। বলাবাহুল্য, দেশের যে কোনো উন্নয়নই আজ বিদ্যুৎনির্ভর। তাই এই খাতের সর্বোচ্চ ব্যবহার সুনিশ্চিত না করতে পারলে ভোগান্তির শেষ থাকবে না। বিদ্যুতের অভাব উন্নয়নের প্রতিবন্ধক হিসেবেই দেখা হয়। তবে আশার কথা যে, সরকার এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ নজরদারি রাখায় রেকর্ড পরিমাণ উৎপাদনের রেকর্ড গড়তে সক্ষম হলো এই খাত। এখন দরকার বাকি উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর সুষ্ঠুভাবে সমন্বয়ের মাধ্যমে উৎপাদনের দিকে এগিয়ে নেয়া। পাশাপাশি সম্প্রতি উৎপাদনের যে রেকর্ড স্পর্শ করেছে বিদ্যুৎ খাত, তা যে কোনো মূল্যেই অব্যাহত রাখা জরুরি।

প্রসঙ্গত বলতে চাই, ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে সরকারের চ্যালেঞ্জের অন্যতম অনুষঙ্গ বিভিন্ন খাতের উন্নয়ন-উৎপাদন। আর সার্বিক এই উন্নয়নে বিদ্যুতের চাহিদা অপরিসীম। সরকার এই লক্ষ্য অর্জনে বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে পারমাণবিকসহ বড় বড় (বেইস লোড) বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনেরও কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা যায়। আমরা মনে করি, নতুন কেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি চালু কেন্দ্রগুলোর ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে, যেন এই রেকর্ড পরিমাণ উৎপাদন কোনোভাবেই নিম্নগামী না হয়। যেহেতু দেশের বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে বিদ্যুৎ একটি অন্যতম সমস্যা। তাই আমাদের প্রত্যাশা, সরকার বিষয়টিকে সর্বাধিক গুরুত্বের সঙ্গেই দেখবে।