পাহাড়ের গায়ে বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি

লিয়াকত হোসেন খোকন

পাহাড় আর অরণ্যে ঘেরা বান্দরবানের প্রতিটি জায়গাই আকর্ষণীয়। প্রাকৃতিক লীলাভূমি আর খাড়া পাহাড়ের প্রাচীরঘেরা বান্দরবানের পার্বত্যভূমিতে একসময় ঘন গাঢ় বন ছিল। ছিল জনমানবশূন্য। এ অঞ্চলে বোমাং রাজা মাথান প্রু অবস্থান নেয়ার পরপরই লোকবসতি আরম্ভ হয়। এখানের যেদিকে যাবেন সেদিকেই প্রকৃতির সৌন্দর্য খুঁজে পাবেন। এমন অরণ্য আর পাহাড় এদেশে আর কোথাও নেই। রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি, আলীকদম, নাইখ্যংছড়ি, লামা, তাজিংডং, কেওক্রাডাং, চিতাইপাড়া নাইখিয়াং-এর যেদিকে যাবেন দেখবেন শুধু পাহাড় আর পাহাড়। রুমা হয়ে বগা লেক দেখে কেওক্রাডং পাহাড়ে যাওয়া আরো বেশি আনন্দের। বান্দরবান শহরের অপরপ্রান্তে এক কালো পাহাড়ে একটি ঝরনা ছিল। পাহাড়ি মাটি লবণাক্ত থাকায় ঝরনার পানির সঙ্গে লবণটা মিশে থাকত। সেই লবণাক্ত পানি পান করার জন্য অসংখ্য বানর দলবেঁধে হাতে হাত ধরে শংখনদী পার হতো। সেই দৃশ্য দেখে মনে হতো বাঁধের মতো। সে থেকে এই জায়গার নাম হয় ‘বান্দরবন’। অপভ্রংশে নাম হয় ‘বান্দরবান’।

বান্দরবানে অধিক সংখ্যক উপজাতি লোক বাস করে। উপজাতির সংখ্যা এখানে সবচেয়ে বেশি। মগ, টিপরা, চাকমা, বম, খুমী, লুসাই, মুরং, বনযোগী উপজাতীয়রা এখানে রয়েছে। এদের মধ্যে মগদের নাম সবার আগে উল্লেখ করতে হয়। শিক্ষা, সভ্যতা ও সংস্কৃতির দিক থেকে মগরা এই এলাকায় এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। নদী, ফাঁড়ি আর লেক তৈরি করে বান্দরবানকে কাঁথা-সেলাইয়ের মতো এফোঁড়-ওফোঁড় করা হয়েছে। ফাঁড়ি ঘিরেই আবর্তিত হয় এখানকার জনজীবন। উপজাতিদের অনেক বাড়ি থেকে সিঁড়ি এসে মিশেছে ফাঁড়িতে। পাহাড়ের গায়ে আছে বাড়িঘর। পাহাড় কেটে কেটে সিঁড়িও তৈরি করা হয়েছে উপরে ওঠা ও নিচে নামার জন্য। এখানের গভীর অরণ্য, সুউচ্চ পাহাড়ের শৃঙ্গ সবকিছুই আপনাকে আকৃষ্ট করবে। ৪ থেকে ৫ দিন বেড়ানোর মনোরম জায়গা পার্বত্য চট্টগ্রামের পার্বত্য জেলা বান্দরবান শহর।

বান্দরবান শহর থেকে ২৫ কি. মি. দক্ষিণে চিম্বুক পাহাড়। এখানে যাবেন সড়কপথে জিপে কিংবা বাসে। চিম্বুক পাহাড়ের উচ্চতা ২০০ ফুট। এখানে রাত কাটানোর জন্য একটি রেস্টহাউস রয়েছে। পাহাড়শীর্ষে দাঁড়িয়ে চোখে পড়বে দূরে বহুদূরে ধু-ধু বঙ্গোপসাগরের জলরাশি। শৈলঝিরি ঝরনাও দেখে আসুন একই সুযোগে। চিম্বুকে সকালে গিয়ে বিকেলেই বান্দরবানে আবার নাহয় ফিরে আসুন।

পরিব্রাজকের মন নিয়ে অজানা-অচেনাকে জয় করার জন্য বছরের যে-কোনো সময় বেরিয়ে পড়তে পারেন দুর্গম পাহাড়িয়া অঞ্চলে। বার্মা সীমান্তে অবস্থিত কেওক্রাডাং। এখানে রয়েছে মেঘের আনাগোনা। মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এই কেওক্রাডাং পাহাড় ও বগা লেক দেখায় একধরনের আনন্দ রয়েছে। এখানে যাওয়া কষ্টসাধ্য হলেও এই ভ্রমণকে রোমাঞ্চকর বলা যাবে।

কেওক্রাডাং পাহাড়ে রয়েছে গহীন অরণ্য। অরণ্য ঘেঁষা তীর ধরে কয়েকজন মিলে পথ চলায় দারুণ আনন্দ। বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য পর্বতশৃঙ্গ এই কেওক্রাডাং। এর উচ্চতা প্রায় ৪ হাজার ৩৪ ফুট। প্রায় ৪শ’ তলা উঁচু একটি বাড়ির সমান। এই পাহাড়ের উপরটা কোনো শৃঙ্গের মতো নয়। প্রায় সমতল। এখানে লোকবসতি খুব কম দেখবেন। যারা বাস করেন তারা বোমাং উপজাতি। নদীর তীর থেকে ৪ মাইল দূরে বগা হ্রদ। সমতল ভূমি থেকে এ হ্রদের অবস্থান সাড়ে তিন হাজার ফুট উঁচুতে। বগা হ্রদ প্রস্থে আধা মাইলের বেশি আর দৈর্ঘ্যে এক মাইলের মতো হবে। এ হ্রদের চারদিক জুড়ে রয়েছে গহিন অরণ্য। হ্রদের জলের রং নীল, কখনওবা মনে হবে হলুদ, লাল, সবুজ কিংবা কালো।

এই হ্রদের গভীরতা প্রায় ৯০ ফুট। স্থানীয় উপজাতিরা এই হ্রদকে পূজা দেয়। এজন্য বগা হ্রদে তারা ফুল, হাঁস-মুরগি কেটে দিয়ে থাকে। একটু খেয়াল করে জলের নিচে তাকান। দেখবেন অসংখ্য সিকি, আধুলি পড়ে রয়েছে। বগা হ্রদের তীরে ঘণ্টার-পর-ঘণ্টা বসে থাকতে ইচ্ছে হবে। আরো কিংবদন্তি আছে, যেমন— একদা ভগবান বুদ্ধ নাকি এক উপজাতি বৃদ্ধ দম্পতিকে স্বপ্নে জানান যে, এ পাড়া ধ্বংস হয়ে যাবে। তারপর এক গভীর রাতে যখন সমস্ত পাড়া নিদ্রামগ্ন তখন হঠাত্ বগা হ্রদের পানি ফুলে উঠে সমস্ত পাড়া তলিয়ে গিয়েছিল।

পাহাড়ে বেড়াতে যাবার মধ্যে একটা অন্যরকম রোমাঞ্চ রয়েছে। পাহাড়-অরণ্য প্রায় ঘিরে রয়েছে খাগড়াছড়িতে। এখানে চারদিকে সবুজের সমারোহ। গাছে গাছে পাতায় পাতায় আলোছায়ার অসংখ্য গলিঘুঁজি। নিচে তারই জটিল নকশা। বর্ষা আর শরতে এখানে প্রকৃতি নবসাজে সজ্জিত হয়ে ওঠে। সর্বত্রই মনমাতানো রূপ।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর দুর্গম পাহাড় ঘেরা খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা। সর্বত্রই নৈসর্গিক দৃশ্য। এখানে গিয়ে যেদিকে তাকাবেন, মনে হবে কোনো নিপুণ শিল্পী যেন তাঁর তুলির স্পর্শে এ শহরের ছবি এঁকেছেন। জেলা প্রধান কার্যালয়টি অসংখ্য খাগড়া গাছে পরিপূর্ণ চেঙ্গি নদীর তীরে আর ছড়ার তীরে ছিল। এই খাগড়া গাছের নাম থেকে খাগড়া আর ছড়ার থেকে ছড়ি যুক্ত হয়ে খাগড়াছড়ি নামকরণ হয়েছে।

এখানের উপজাতিরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী উপজাতিরা এখনও জুম চাষ করে এবং বাস করে বাঁশের তৈরি মাচাং ঘরে। ভাত, মাছ, পশুপাখির মাংস, শুঁটকি আর ব্যাঙ এদের প্রধান খাদ্য। নিজেদের বাড়িতে তৈরি পানীয় হানজি এবং জংরা এদের যে কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে অবাধে ব্যবহূত হয়।

খাগড়াছড়ির চাকমাদের প্রধান উত্সব হলো ‘বিজু’। এই একদিনের উত্সবটি অনুষ্ঠিত হয় চৈত্রমাসের শেষ দিনে। এদের বাঁশনৃত্য দেখার মতো।

খাগড়াছড়িতে নিউজিল্যান্ড নামে একটা এলাকা আছে। খাগড়াছড়ি শহরের বাইরে এক বিস্তীর্ণ প্রান্তরকে বলা হয় নিউজিল্যান্ড। এখানে বিস্তৃত আবাদি জমিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে কয়েকটি টিলা আর কিছু তালগাছ।

বৈশাখের শেষে ধান, তুলা, ডাল, তরমুজসহ বিভিন্ন ফসলের বীজ রোপণ করে। ভাদ্র মাসের শুরু থেকে ফসল তোলার কাজ শুরু হয়। পাহাড় ঘুরে ঘুরে দেখার সময় উপজাতিদের ফসল তুলতেও দেখবেন। আরও ঘুরে দেখুন দেড় হাজার ফুট পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত মাইমছড়ি দেবতার পুকুর, রিছং ঝরনা, প্রাচীন বৌদ্ধবিহার।

লেখক :গবেষক