দেশের বিশাল অর্জন

নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার মাধ্যমে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। বাংলাদেশের এ অর্জন বিশাল। এর ফলে সারা পৃথিবী এখন বাংলাদেশকে নতুনভাবে চিনবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হবেন। কর্মসংস্থান বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। আন্তর্জাতিক ঋণ গ্রহণে বাংলাদেশকে অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকির দেশ বিবেচনা করা হবে। একদা যে বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলা হতো, সেই বাংলাদেশের ঝুড়ি পরিপূর্ণ হতে চলেছে।

বিশ্বব্যাংকের হালনাগাদ তালিকায় বাংলাদেশের নিম্ন মধ্যম আয়ের ধাপে পেঁৗছানোর খবর প্রকাশিত হওয়ার পর গতকাল সারাদিনই তা ছিল মানুষের মুখে মুখে। অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় অর্জন। বাংলাদেশের জন্য গৌরবময় এ অর্জনের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মধ্যম আয়ের দেশ হতে বাংলাদেশের ২০২১ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না। আগামী তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশ সেই লক্ষ্যে পৌঁছাবে।
বাংলাদেশ ‘নিম্ন’তে থাকতে চায় না। সব সময় ‘উচ্চ’তে উঠতে চায়। বিশ্বব্যাংক বলেছে, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিতে ধারাবাহিক উন্নতির কারণে বাংলাদেশ এ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

বিশ্বব্যাংক বুধবার রাতে মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে দেশের হালনাগাদ তালিকা প্রকাশ করে। সংস্থাটি গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, বাংলাদেশের পাশাপাশি কেনিয়া, মিয়ানমার ও তাজিকিস্তান এবার নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। মধ্যম আয়ের দেশগুলোকে বিশ্বব্যাংক দুটি শ্রেণীতে ভাগ করেছে_ একটি হচ্ছে নিম্ন মধ্যম আয়ের, অন্যটি উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ। বাংলাদেশ এখন থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে পরিচিত হবে। প্রতিবছর ১ জুলাই বিশ্বব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে মাথাপিছু আয় অনুসারে দেশগুলোকে চারটি আয় গ্রুপে ভাগ করে। যাদের মাথাপিছু জাতীয় আয় এক হাজার ৪৫ ডলার বা তার নিচে, তারা নিম্ন আয়ের দেশ। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকে এ তালিকাতেই ছিল। বিশ্বব্যাংকের নিজস্ব হিসাবে ২০১৪ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৮০ ডলার, যা ২০১৩ সালে ছিল এক হাজার ১০ ডলার। অবশ্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এক হাজার ৩১০ ডলার।

প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশের এ স্বীকৃতি মর্যাদার। এটি বড় অর্জন। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, একসময় বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে দরিদ্র দেশের মডেল বলত। এখন তারাই উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করছে। পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, বিশ্বব্যাংকের স্বীকৃতির মাধ্যমে বাংলাদেশের ঋণমান বেড়ে যাবে। আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ঋণপত্র আরও গ্রহণযোগ্য হবে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। এফবিসিসিআইর সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ সমকালকে বলেছেন, বাংলাদেশের এই স্বীকৃতি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করবে। প্রসঙ্গত, ২০১০ সালে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ২০২১ সাল নাগাদ দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।

অর্থনীতিবিদরা যা বলেন :নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ায় বাংলাদেশ কী কী সুবিধা পাবে_ জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন সমকালকে বলেন, এটি একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। বাংলাদেশের অর্থনীতি যে এগিয়ে যাচ্ছে, এই উত্তরণ তারই প্রমাণ। এর ফলে সারাবিশ্বে বাংলাদেশ সম্পর্কে ইতিবাচক বার্তা যাবে। বিনিয়োগকারীরা আগের তুলনায় আস্থা পাবেন। আন্তর্জাতিক ঋণদাতারা বাংলাদেশকে অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকির দেশ মনে করবেন। তবে বাংলাদেশের এই অর্জন নিয়ে খুব বেশি আত্মতুষ্টিতে না ভুগে সামনের চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে বেশি মনোযোগী হওয়া উচিত বলে মনে করেন জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অনেক কম সুদে এবং অপেক্ষাকৃত সহজ শর্তে ঋণ পায়। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের পক্ষ থেকে এ ধরনের ঋণ দেয় এর অঙ্গ সংস্থা আইডিএ। আইডিএর ঋণ পায় এক হাজার ২১৫ ডলার মাথাপিছু আয়ের নিচে থাকা দেশ। সে হিসেবে এখনই বাংলাদেশ আইডিএ ঋণের বাইরে যাবে না। আরও কয়েক বছর পরে হয়তো বাংলাদেশ আইডিএ ঋণ পাবে না। বাংলাদেশকে এ বিষয়টি মাথায় রেখে এগোতে হবে। বাংলাদেশ আগামী তিন বছরের মধ্যে জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এলডিসি থেকে বের হয়ে গেলে বিভিন্ন উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশে পণ্য রফতানিতে শুল্কমুক্তসহ অগ্রাধিকারমূলক যে বাজার সুবিধা রয়েছে, তার বেশিরভাগই থাকবে না। সুতরাং উচ্চ মধ্যম আয় এবং উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার এ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশকে এখন থেকে ওই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার প্রস্তুতি নিতে হবে বলে মনে করেন জাহিদ হোসেন।

গবেষণা সংস্থা বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ড. বিনায়ক সেন সমকালকে বলেন, বাংলাদেশ ২০২১ সালের আগেই মধ্যম আয়ের নিচের শ্রেণীতে স্থান পেয়েছে। এর কারণ, গত ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। প্রবৃদ্ধি মোটামুটিভাবে ৬ শতাংশের ঘরে আছে। পর পর তিন বছর অর্থনীতিতে ধারাবাহিক সাফল্য এসেছে। এর ফলে বাংলাদেশ প্রত্যাশিত সময়ের আগেই নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ উন্নীত হয়েছে। পাকিস্তান, নাইজেরিয়াও এই গ্রুপে রয়েছে। কিন্তু তারা এখনও দারিদ্র্য ও সংঘাতের মধ্যে আছে। ভারত ও শ্রীলংকার মতো দেশ এখনও নিম্ন মধ্যম আয়ের গ্রুপে। অনেক দেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের ফাঁদে আটকে গেছে। ১৯৬০ সালে এই শ্রেণীতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে মাত্র ১৬টি উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশ মাত্র এই শ্রেণীতে ঢুকল। বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো_ অগ্রগতি চলমান রাখা, মানুষের প্রত্যাশা মেটানো এবং সমাজে বৈষম্য কমিয়ে আনা। বাংলাদেশকে নিম্ন মধ্যম আয়ের ক্যাটাগরিতে সম্মানজনক অবস্থায় পেঁৗছাতে হলে শিক্ষা, সুশাসন, অবকাঠামো, সরকারি সেবা প্রভৃতির উন্নতিতে এ-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপক সংস্কার দরকার।

অর্থমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া :মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে মর্যাদা পেলেও বিশ্ববাণিজ্যে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হিসেবে বাংলাদেশের সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত থাকবে বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি বলেন, নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে বিশ্বব্যাংকের এ স্বীকৃতি মর্যাদার। তবে উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত স্বীকৃতি দেবে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের বোর্ডসভায় এটি অনুমোদিত হতে হবে। এ জন্য আরও তিন-চার বছর অপেক্ষা করতে হবে। গতকাল সচিবালয়ে সফররত ভুটানের অর্থমন্ত্রী লিয়ন পো ন্যামগে দরজির সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি। অর্থমন্ত্রী বলেন, গত ৪০ বছরে নিম্ন আয়ের দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। এখান থেকে বেরিয়ে আসাটা এক ধরনের প্রমোশন। এটি বড় অর্জন, বাংলাদেশের জন্য গরিমার। তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংককে আমরা কিছু বলি নাই। তারা নিজে থেকেই স্বীকৃতি দিয়েছে। সে জন্য খুশি লাগছে।’

বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, বিশ্বব্যাংকের এ ঘোষণা মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার প্রথম ধাপ। বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবে। সেদিন খুব বেশি দূরে নয়। ২০২১ সালের আগেই হবে। স্বাধীনতার পরে অনেকে অনেক রকম মন্তব্য করেছিলেন উল্লেখ করে তোফায়েল আহমেদ বলেন, বিশ্বব্যাংক বলেছিল, বাংলাদেশ একটা দরিদ্র দেশের মডেল। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিলেন, বাংলাদেশ একটা তলাবিহীন ঝুড়ি। এখন তারাই বলছে, বাংলাদেশ একটি উদাহরণ। আবার সবাইকে অবাক করে সেই বিশ্বব্যাংকই বলেছে, বাংলাদেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, একসময় বিদেশের সাহায্যনির্ভর দেশ বলা হতো। এখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ; খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। এখন দেশের অর্জিত সম্পদ, রেমিট্যান্স ও রফতানি একসঙ্গে যোগ করলে আমদানির কাছাকাছি। বাংলাদেশের বাজেট এখন প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা।

উপরে উঠেছে ১০ দেশ :বাংলাদেশের পাশাপাশি কেনিয়া, মিয়ানমার ও তাজিকিস্তান এবার নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। মঙ্গোলিয়া ও প্যারাগুয়ে নিম্ন থেকে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে উঠেছে। আর্জেন্টিনা, হাঙ্গেরি, সিসিলি ও ভেনিজুয়েলা উচ্চ মধ্যম থেকে উচ্চ আয়ের দেশের কাতারে ঢুকেছে। গৃহযুদ্ধের কারণে দক্ষিণ সুদান নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে নেমে নিম্ন আয়ের তালিকায় চলে গেছে। সবচেয়ে মাথাপিছু আয় বেশি ইউরোপের মোনাকোর, যার পরিমাণ এক লাখ ডলারের বেশি। যা সবচেয়ে কম মাথাপিছু আয়ের দেশ মালয়ের (২৫০ ডলার) চেয়ে ৪০০ গুণ বেশি। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ এতদিন ছিল নিম্ন আয়ের দেশ। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ মানদণ্ড অনুযায়ী, মাথাপিছু আয় এক হাজার ৪৫ ডলার পর্যন্ত নিম্ন আয়ের দেশ। আর এক হাজার ৪৬ থেকে চার হাজার ১২৫ ডলার পর্যন্ত নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ। উচ্চ মধ্যম আয়ের সীমা হলো চার হাজার ১২৬ থেকে ১২ হাজার ৭৩৫ ডলার। উচ্চ আয়ের দেশের মাথাপিছু আয় হতে হবে কমপক্ষে ১২ হাজার ৭৩৬ ডলার। মোট জাতীয় আয় হলো একটি দেশের সব জনগণের (প্রবাসীসহ) আয়। মোট জাতীয় আয়কে জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে মাথাপিছু আয় বের করা হয়। বিশ্বব্যাংক আন্তর্জাতিক মূল্যস্ফীতি এবং বিনিময় হার বিবেচনায় নিয়ে ‘এটলাস’ পদ্ধতিতে প্রতিটি দেশের মাথাপিছু আয় হিসাব করে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, বর্তমানে নেপাল, আফগানিস্তানসহ ৩১টি দেশ নিম্ন আয়ের তালিকায়। নিম্ন মধ্যম আয়ের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকাসহ ৪৮টি দেশ। উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশের সংখ্যা ৫৪টি। আর উন্নত দেশ হয়েছে ৭৮টি।