সরকারের দৃষ্টি মেগা প্রকল্পে

সরকারের দৃষ্টি এখন মেগা প্রকল্পগুলোর দিকে। এ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে নানা পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছেন সরকারের শীর্ষ নীতিনির্ধারকরা। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত করতে এ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে জোর দিচ্ছে সরকার। তবে গত কয়েক বছরে নেওয়া এ মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশকে অনুসরণ করে এগিয়ে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
ক্ষমতাসীন দলের একাধিক সূত্র জানায়, বহুল আলোচিত পদ্মা সেতু, ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন সড়ক, ঢাকা-ময়মনসিংহ চার লেন সড়ক প্রকল্প, রাজধানীতে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেল, পায়রা সমুদ্রবন্দর, নতুন নতুন বিদুৎকেন্দ্র স্থাপনসহ বৃহৎ কর্মকা-ের বাস্তবায়নে জোর দিচ্ছে সরকার। ফলে সরকারের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় আলোচিত ও বড় প্রকল্পগুলোর কাজ এগিয়ে চলছে। এর মধ্যে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বা ফাস্ট ট্র্যাকভুক্ত প্রকল্পগুলোর মধ্যে কয়েকটিতে অগ্রগতি কিছুটা কম হলেও এগিয়ে রয়েছে পদ্মা সেতু প্রকল্প। এই মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে উন্নত রাষ্ট্রের তালিকায় নিয়ে যেতে নানা পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। এদিকে গত বছরের ২২ মে অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকারের জনগুরুত্বপূর্ণ ও বড় প্রকল্পের নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ফাস্ট ট্র্যাকের মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়। সে সময় পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প, রামপাল বিদুৎকেন্দ্র, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেল, এনএলজি টার্মিনাল নির্মাণ ও গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্পগুলোকে ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্প হিসেবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারভিত্তিতে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। এটি তদারকিতে গঠিত কমিটির প্রধান স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি কমিটির তৃতীয় বৈঠকে মাতারবাড়ী আল্ট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল কোলফায়ার্ড পাওয়ার প্রজেক্ট এবং পায়রা বন্দর প্রকল্পসহ দুটি নতুন মেগা প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়। একইসঙ্গে প্রতি চার মাস অন্তর এ প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি প্রতিবেদন তৈরির সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। এ প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুততম সময়ের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিগত মহাজোট সরকারের সময় নেওয়া আটটি বড় অগ্রাধিকার প্রকল্প প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই তদারক করছেন।
এ বিষয়ে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ ভোরের পাতাকে বলেছেন, ‘এ সরকার মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের ধারাবাহিকতা দরকার। সেজন্য বিএনপি জোটের বাধার পরও জনগণ ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের সুযোগ করে দিয়েছে। আর ২০৪১ সালের আগেই এ দেশকে উন্নত দেশে রূপান্তর করা হবে। এক্ষেত্রে কারও কোনো বাধাই কাজে আসবে না।’
আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারের নজর এখন উন্নয়নের দিকে। তাই ‘উন্নয়নতন্ত্র’কে নীতি হিসেবে নিয়ে হাঁটছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। এই নীতির মাধ্যমে সরকারবিরোধীদের বিরোধিতার জবাব দিতে চান তাঁরা।
আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী অন্যতম প্রেসিডিয়াম সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম সম্প্রতি এ ব্যাপারে বলেছেন, ‘আমরা অতি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী নই, আমরা উন্নয়নে বিশ্বাস করি।’
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একজন নেতা আলাপকালে জানান, দেশের মাথাপিছু আয় এখন এক হাজার ৩১৪ মার্কিন ডলার। আগামী দিনগুলোতে বিশ্বের যে ১১টি দেশ অর্থনীতিতে এগিয়ে যাবে, বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম। দেশের উন্নয়নে সরকার এরই মধ্যে অনেকগুলো প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এসব মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম এবং ২০৪১ সালের মধ্যে দেশ উন্নত দেশে পরিণত হবে। সরকার সে লক্ষ্য অর্জনে সব ধরনের বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে যাবে। সরকার বাংলাদেশের উন্নয়নে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরকে অনুসরণ করে এগিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়ক চার লেন প্রকল্প, জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ সড়ক চার লেন প্রকল্প, যাত্রাবাড়ী-কাঁচপুর সড়ক ৮ লেন প্রকল্প, নবীনগর-ডিইপিজেড-চন্দ্রা সড়ক প্রকল্প এবং ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজে খরচের অর্থ বাড়ে কাজ ফুরায় না। সারাদেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো সারা বছর চলাচল উপযোগী করে রাখার কার্যক্রমও চলে ঢিমেতালে। যে কারণে প্রতি বছরই ঈদের আগে ঘরেফেরা মানুষের ভোগান্তি পৌঁছে চরমে। যাত্রী ভোগান্তির মুক্তির আশ্বাস ঈদের মৌসুমেই বেশি শোনা যায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর মুখে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ২০২১ সাল নাগাদ দারিদ্র্য নিরসন করে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার উদ্দেশ্যে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। সরকারের উদ্দেশ্যকে সাফল্যম-িত করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনা অনুযায়ী দেশব্যাপী একটি নিরাপদ, সুরক্ষিত, পরিবেশবান্ধব ও ব্যয়সাশ্রয়ী সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার লক্ষ্যে তৎকালীন (যোগাযোগ মন্ত্রণালয়) বা বর্তমানে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় কর্তৃক ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। এই মন্ত্রণালয়ের অধীনে সারাদেশে ৩৪৭৮ কিমি জাতীয় মহাসড়ক, ৪২২২ কিমি আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং ১৩২৪৮ কিমি জেলা সড়ক সমন্বয়ে দেশব্যাপী সর্বমোট ২০৯৪৮ কিমি সড়ক নেটওয়ার্ক উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের আওতায় রয়েছে, যা দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সড়কপথে আরামদায়ক, নিরাপদ ও দ্রুততম চলাচলে মুখ্য ভূমিকা পালন করে আসছে।