শক্তিশালী অর্থনীতি ও সুষ্ঠু গণতন্ত্রচর্চাই পারে দেশকে এগিয়ে নিতে

বাংলাদেশ এগিয়ে যাওয়ার নানা দিক রয়েছে। ইতোমধ্যে আমরা জাহাজ নির্মাণ শিল্পে এগিয়ে গেছি। জাহাজ রপ্তানিসহ যুদ্ধজাহাজও নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছি। এভারেস্ট জয় করেছি। মাতৃমৃত্যু হার কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি (যদিও কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না) এবং তিতাস গ্যাস ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করেছি। পাটের জন্মরহস্য আবিষ্কৃত হয়েছে। আমরা সমুদ্র জয় করেছি। তথ্যপ্রযুক্তিতে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। এমনকি ছিটমহল সমস্যারও সমাধান হয়েছে। আমরা যদি এমনিভাবে সব সেক্টরে অগ্রগতি লাভ করতে পারি তাহলে বাংলাদেশ একসময় যেমন অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হবে, তেমনি দ্রুত উন্নত দেশের কাতারে গিয়ে দাঁড়াবে। আমরাও হবো একটি সফল ও মর্যাদাবান রাষ্ট্রের নাগরিক।

সালাম সালেহ উদদীন:কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক
বাংলাদেশ অপার সম্ভাবনাময় একটি দেশ, এ দেশ বিপুল সম্পদ ও ঐতিহ্যের অধিকারী_ এ কথা অসংখ্যবার উচ্চারিত হয়ে আসছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহল থেকে। এ সম্ভাবনা প্রতিষ্ঠা পাবে বা বাস্তবায়ন ঘটবে তার শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রচেষ্টা, নারীর অধিকার সংরক্ষণ, মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ এবং দেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলাসহ সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকাশ ও প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করার মধ্য দিয়ে। দেশ থেকে দুর্নীতির মূলোৎপাটন করে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। কেবল দেশব্যাপী দুর্নীতিবিরোধী অভিযান পরিচালিত হলেই ওই অপার সম্ভাবনার পরিস্ফুটন ঘটবে না। দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের সঙ্গে অন্যান্য বিষয়ের সংস্কার ও উত্তরণ ঘটাতে হবে। তাহলেই অপার সম্ভাবনার বাস্তবায়ন ঘটানো সহজ হবে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে।
আশার কথা, দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশের মধ্যে শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে তৃতীয় অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের পরের অবস্থানে রয়েছে শ্রীলংকা, ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান। বাংলাদেশের আগের দুটি অবস্থান ভুটান ও নেপালের। এ ছাড়া বিশ্বের ১৬২টি দেশের মধ্যে শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৪তম। চলতি সপ্তাহে একটি অলাভজনক বৈশ্বিক সংস্থা ইন্সটিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস ‘গ্লোবাল পিস ইনডেক্স’ (জিপিআই) নামে বিশ্বের শান্তিপূর্ণ দেশগুলোর একটি সূচক প্রকাশ করেছে। এ সূচকে ইতিবাচক অবস্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। সূচক প্রকাশে সহিংসতার মাত্রা, অভ্যন্তরীণ ও বহির্মুখী সহিংসতা এবং সামরিক শাসনের মতো বিষয়গুলো বিবেচনা করেছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশের এ ইতিবাচক অর্জনের প্রধান কারণ হচ্ছে চার দশকে বাংলাদেশ দাঁড়াতে পেরেছে তার আপন গৌরব, ঔজ্জ্বল্য ও কর্মসুষমা নিয়ে। আন্তর্জাতিক বিশ্বও বাংলাদেশের উন্নয়নকে দেখছে ইতিবাচক দৃষ্টিতে। এমনকি জাতিসংঘের মহাসচিবও বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রশংসা করেছেন। বাংলাদেশের মানুষ ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ একটা বিস্ময়কর, পৃথিবীখ্যাত ঘটনা। মাত্র নয় মাসে লড়াকু বাঙালি জাতি পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মরণপণ যুদ্ধ করে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে, ইজ্জত দিয়ে, আবার কেউ চিরতরে পঙ্গু হয়ে দেশ স্বাধীন করেছে। এত ত্যাগ ও রক্ত দিয়ে পাওয়া স্বাধীন দেশ তো ধীরে ধীরে এগিয়ে যাবেই।
বাংলাদেশ মহান স্বাধীনতার ৪৪ বছর পার করেছে। ইতোমধ্যে আমরা মহান ভাষা আন্দোলনের ছয় দশক পার করেছি। নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতাও আমরা রক্ষা করে চলেছি। আমাদের চেষ্টা ও আন্তরিকতার কমতি নেই। কিন্তু আজও আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তি পুরোপুরিভাবে আসেনি। সামাজিক-রাজনৈতিক, শিক্ষা, মানবাধিকার ও আইনের শাসনজনিক গণতান্ত্রিক পরিস্থিতিও সুখকর নয়। চার দশকে আমাদের যতটা এগোনোর কথা ছিল ততটা এগোতে পারিনি। এটা আমাদের জাতীয় ব্যর্থতা। যদিও বিদেশিদের মুখে প্রায়ই উচ্চারিত হয় বাংলাদেশ হচ্ছে এশিয়ার বাঘ। এর আগে মার্কিন সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ, তারা বেশ পরিশ্রমী।’ তিনি আরো বলেছিলেন, স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিলেন, বাংলাদেশ হচ্ছে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ তার এ মন্তব্য ভুল ছিল। কারণ বাঙালি অনেক দূর এগিয়ে গেছে। তবে বর্তমান মার্কিন রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশ নিয়ে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য মন্তব্য এখন পর্যন্ত করেননি।
বাংলাদেশ এগিয়ে যাওয়ার নানা দিক রয়েছে। ইতোমধ্যে আমরা জাহাজ নির্মাণ শিল্পে এগিয়ে গেছি। জাহাজ রপ্তানিসহ যুদ্ধজাহাজও নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছি। এভারেস্ট জয় করেছি। মাতৃমৃত্যু হার কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি (যদিও কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না) এবং তিতাস গ্যাস ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করেছি। পাটের জন্মরহস্য আবিষ্কৃত হয়েছে। আমরা সমুদ্র জয় করেছি। তথ্যপ্রযুক্তিতে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। এমনকি ছিটমহল সমস্যারও সমাধান হয়েছে। আমরা যদি এমনিভাবে সব সেক্টরে অগ্রগতি লাভ করতে পারি তাহলে বাংলাদেশ একসময় যেমন অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হবে, তেমনি দ্রুত উন্নত দেশের কাতারে গিয়ে দাঁড়াবে। আমরাও হবো একটি সফল ও মর্যাদাবান রাষ্ট্রের নাগরিক।
অর্থনীতির বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে ক্রমেই বাংলাদেশের নাম এগিয়ে আসছে। বর্তমানে এ অবস্থান ৩১তম হলেও ইংল্যান্ডভিত্তিক আন্তর্জাতিক কনসাল্টিং প্রতিষ্ঠান পিডবিস্নউসি তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলেছে, ২০৫০ সালে অর্থাৎ আজ থেকে ৩৫ বছর পর বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান হবে ২৩তম। অর্থাৎ উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশের তালিকা থেকে ধনী রাষ্ট্রের তালিকায় লেখা হবে বাংলাদেশের নাম। অর্থনীতির বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদদের এ ভাষ্য আমাদের আশাবাদী করে তোলে। উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তির বাংলাদেশ আগামীতে শক্তিশালী অর্থনৈতিক দেশে কিংবা ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হলে তা হবে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্জন। সুতরাং পিডবিস্নউসির এ প্রতিবেদনটি ইতিবাচক হিসেবে ধরে নিয়ে বাংলাদেশকে সামনের পথ পাড়ি দিতে হবে। বাংলাদেশ ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হবে_ এটা আনন্দের খবর হলেও, এ দেশের ২২ শতাংশ মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছিল। মানুষের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের শপথও ছিল তার মধ্যে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা_ এসব ক্ষেত্রে চার দশকে কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। নিরন্ন মানুষের হাহাকার এখনো গ্রামীণ জনপদে চোখে পড়ে। এসব নেতিবাচক ও অন্ধকার দিককে পায়ে ঠেলে-মাড়িয়ে-ডিঙিয়ে বাংলাদেশকে ঘুরে দাঁড়াতে হবেই। তা না হলে বাঙালির সব আন্দোলন, সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, আত্মবিসর্জন বৃথা হয়ে যাবে। বৃথা হয়ে যাবে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাও।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নানা প্রশ্নের জন্ম দিলেও, দেশে-বিদেশে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকলেও নির্বাচনী চ্যালেঞ্জে জয়ী হয়েছে আওয়ামী লীগ। যদিও নির্বাচনের এক বছরের মাথায় এসে দেশ ও দেশের জনগণ রাজনৈতিক সহিংসতার কবলে এসে পড়ে। দীর্ঘ তিন মাস দেশে হরতাল-অবরোধ থাকে। বর্তমান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্যই মূলত এ আন্দোলন ছিল। কিন্তু সরকারের কিছুই হয়নি। ক্ষতি হয়েছে দেশ ও দেশের মানুষের। প্রায় ৯৫ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। বাজেট আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিন মাস সহিংস আন্দোলন না হলে জিডিপি ৭-এ থাকত। সত্যিই এটা দুঃখজনক। এ কথা সত্য, সরকার কৃষকস্বার্থ সংরক্ষণের জন্য নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে, জেলা পর্যায়ে কিছু কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে, তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে গেছে, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করেছে, যুদ্ধাপরাধের বিচারও শেষ পর্যায়ে। সরকারের এসব উদ্যোগ ও তৎপরতা দেশের জন্য ইতিবাচক। হাতিরঝিল প্রকল্প, গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারসহ বেশ কয়েকটি ফ্লাইওভার নির্মাণ_ এসবও ভালো উদ্যোগ। আগামীতে জনগণকে সঙ্গে নিয়েই প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে যেতে হবে সরকারকে। ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে আগেকার কাজের ও নানা ধরনের উন্নয়নমূলক প্রকল্পের। সরকারের যেসব কর্মকা-ে গণঅসন্তোষ তৈরি হওয়ার সুযোগ রয়েছে ওইসব কাজ থেকে বিরত থেকে জনকল্যাণমুখী কাজে অগ্রসর হতে হবে। যে কোনো কল্যাণরাষ্ট্রের শাসকদের কর্তব্যও তাই। গণতন্ত্রের জয়ধ্বনি করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে সরকারকেই।
অন্যদিকে অপরিকল্পিত নগরায়ণের ঝুঁকি মানুষের মৃত্যুঝুঁকি বাড়াচ্ছে। রয়েছে বিনিয়োগ স্থবিরতা। বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে জঙ্গিরা সংগঠিত হচ্ছে এবং মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তারা নতুন নতুন নামে আত্মপ্রকাশ করছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার জন্য একটি মহল উঠেপড়ে লেগেছে। এ বিষয়টিও সরকারকে মাথায় রাখতে হবে। এতসব সমস্যার সমাধান একে একে করতে হবে। এ জন্য নতুন করে কর্মছক তৈরি করতে হবে। ফিরিয়ে আনতে হবে দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধি। বিএনপি হয়তো এখন চুপ মেরে আছে, তারা যে কোনো সময় হরতাল-অবরোধের মতো নাশকতামূলক কর্মসূচিতে নেমে যেতে পারে। এর ফলে দেশ আবার পিছিয়ে যাবে। সুতরাং এ ব্যাপারে সরকারকে আরো সতর্ক থাকতে হবে।
কেবল ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণ করলেই হবে না। জনগণের জান-মালের নিরাপত্তাবিধানও করতে হবে। বিপদেই বন্ধুর পরিচয়, বিপদেই সরকারের প্রকৃত চেহারা উন্মোচিত হবে। তখনই বোঝা যাবে সরকার জনগণের, না দলের; সরকার গণতন্ত্রী, না আত্মস্বার্থ রক্ষার জন্য মরিয়া। এ জন্য সরকারকে আরো অগি্নপরীক্ষা দিতে হবে।
এর আগেও বলেছি, জনস্বার্থকেন্দ্রিক কাজ বা পরিকল্পনা সফল করা আর আদর্শিক কাজ বা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এক নয়। আদর্শিক কাজ বা পরিকল্পনা হচ্ছে যুদ্ধাপরাধের বিচার, বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফাঁসির রায় কার্যকর, জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন, দেশব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জাগরণ ঘটানো, বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়াসহ দেশকে আধুনিক প্রগতিশীল ধারায় পরিচালিত করা। আর জনস্বার্থ সংরক্ষণ করা মানে হচ্ছে রাষ্ট্র বা সরকারের দ্বারা জনগণ সরাসরি উপকৃত হওয়া। এবার আদর্শিক কাজের পাশাপাশি জনসম্পৃক্ত কাজের দিকেও সরকারকে মনোযোগ দিতে হবে। বিগত সাড়ে ছয় বছরের ভুল আগামী বছরগুলোতে শুধরাতে হবে।
২০২১ সালের মধ্যে দেশের গড় নাগরিককে মধ্য আয়ের কাতারে টেনে তুলবেন। বাংলাদেশকে ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান প্রভৃতি দেশের মতো উচ্চ আয়ের দেশে নিয়ে যাবেন ২০৪১ সালে মধ্যে এ কথা প্রধানমন্ত্রী বার বার বলছেন। আমরা আশাবাদী। তৃতীয় বিশ্বের দেশ হলেও বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে গৌরবজনক এটি দেশ। এ গৌরবের অংশীদার প্রধানত এ দেশের খেটে খাওয়া জনগণ এবং সরকার। এ দেশের মানুষ পরিশ্রমী তবে বুদ্ধিমত্তা ও কৌশল অবলম্বন করে পরিশ্রম করতে পারে না। যার কারণে গাধার খাটুনি খেটেও উপযুক্ত পারিশ্রমিক বা ফল থেকে বঞ্চিত থাকে। দেশের অভ্যন্তরে যারা কাজ করেন দেশের উন্নয়নের জন্য, তাদের বিপুল অংশ শোষিত হয় মালিক শ্রেণির হাতে। এভাবে যারা বিদেশে কর্মরত তারাও নিরুপায় হয়ে গতর খাটেন এবং উপযুক্ত পারিশ্রমিক পান না। আবার একটি শ্রেণি অবৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করে বিপন্ন অবস্থায় পড়েছে। অনেকেই মারা গেছেন। এটা খুবই মর্মান্তিক ঘটনা।
এ ছাড়াও দেশের নানান উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গেলে ব্যয়ের বড় অংশ অর্থবরাদ্দ লুটপাটের কবলে পড়ে। ফলে উন্নয়ন ব্যাহত হয়। সুশাসন ও যোগ্য নেতৃত্ব না থাকার কারণে দেশের উন্নয়ন বার বার বাধাগ্রস্ত হয়। এর পাশাপাশি মাঝে মাঝেই রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। এত সংকট ও সীমাবদ্ধতার মাঝে চার দশকে বাংলাদেশ আপন গতিতে এগিয়ে চলছে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে।
‘৭২ সালের যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ আর ২০১৫ সালের বাংলাদেশ এক নয়। সমস্যা আর সংকটের পাহাড় ঠেলে ঠেলে সামনের দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। এটা আমাদের জন্য বড় অর্জন। আমরা পরিশ্রমী, আত্মবিশ্বাসী বলেই এগোতে পারছি।
মনে রাখতে হবে, সামষ্টিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ বা প্রয়াস। প্রয়োজন জাতীয় ঐকমত্য। আমাদের দুর্ভাগ্য যে ওই সংস্কৃতি আমরা গড়ে তুলতে পারিনি। এটা আমাদের জাতীয় ব্যর্থতা। জনগণের মাঝ থেকে যদি অর্থনৈতিক ও সম্পদের বৈষম্য দূর করা যেত, দূর করা যেত দুর্নীতি ও গোষ্ঠীপ্রীতি বা স্বজনপ্রীতি তাহলে হয়তো বা বাংলাদেশ আরো এগিয়ে যেত। অর্থনৈতিকভাবে যেসব দেশ শক্তিশালী ওইসব দেশ বিশ্বের মধ্যে প্রভাবশালীও। অন্যভাবে গণতান্ত্রিকভাবে যেসব দেশ প্রতিষ্ঠিত ওইসব দেশও মেরুদ- সোজা করে সচল রয়েছে। এ কথার সারবত্তা হচ্ছে, শক্তিশালী অর্থনীতি ও সুষ্ঠু গণতন্ত্রচর্চাই পারে দেশকে এগিয়ে নিতে। সে জন্য হিংসা-বিভেদ, হানাহানি ভুলে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নিতে হবে বলিষ্ঠ ভূমিকা।
দেশের পুরোপুরি উন্নয়ন চাইলে, দেশকে পূর্ণমাত্রায় গণতান্ত্রিক ধারায় প্রতিষ্ঠিত করতে হলে রাজনৈতিক সমঝোতা ও ঐকমত্য যেমন প্রয়োজন, তেমনি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে প্রয়োজন সরকারের কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ। যারা এসব কাজে যুক্ত থাকবেন তাদের হতে হবে দৃঢ়চেতা, স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত। বাংলাদেশের জন্য প্রতিকূল পরিবেশ জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে থাকবেই। থাকবে দেশ নিয়ে নানা অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্র। এর মধ্যেই প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে নির্ভয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। জয় আমাদের হবেই।