ঋণ বিতরণ কমলেও দ্বিগুণ মুনাফা ৯ বিদেশি ব্যাংকের

কাগজ প্রতিবেদক : রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ঋণ প্রদানে ঝুঁকির মাত্রা কমিয়ে আনার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ব্যবসারত বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের পরিমাণ কমেছে। তবে ঋণ বিতরণের পরিমাণ কমলেও গত এক বছরে ব্যাংকগুলোর মুনাফা বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৩ সালের শেষে দেশে ব্যবসারত ৯টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মোট ঋণ বিতরণের পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ২২১ কোটি টাকা। ২০১৪ সালের শেষে ঋণের স্থিতি কমে দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ৭৭৩ কোটি টাকায়। চলতি পঞ্জিকা বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) এটা আরো কমে দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ৯৮ কোটি টাকা। অন্যদিকে ২০১৩ সালের পঞ্জিকা বছরে ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফার পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা। ২০১৪ সালে নিট মুনাফার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১৬ কোটি টাকা। প্রাক্কলিত হিসাব অনুযায়ী, চলতি পঞ্জিকা বছরের ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) ৯টি বিদেশি ব্যাংক মোট মুনাফা করবে ৯৮৪ কোটি টাকা।

বিদেশি ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের খাত পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিতরণ করা মোট ঋণের সিংহভাগই চলতি মূলধন খাতে বিনিয়োগ হয়েছে। ২০১৪ সালে বিদেশি ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের ২৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ এ খাতে দেয়া হয়েছে। এরপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে ব্যবসা-বাণিজ্য (আমদানি-রপ্তানি, পাইকারি ও খুচরা, হোটেল-রেস্তোরাঁ) খাত ও শিল্প ঋণ। এর মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে ১৭ দশমিক ১২ শতাংশ এবং শিল্প খাতে ঋণ বিতরণের পরিমাণ হচ্ছে ১৫ শতাংশ। অন্যদের মধ্যে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে ৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ এবং কৃষি (শস্য, শস্য ব্যতীত অন্যান্য, মৎস্য ও বনায়ন) খাতে ঋণ বিতরণের পরিমাণ হচ্ছে ২ দশমিক ৪ শতাংশ। তবে চলতি পঞ্জিকা বছরের প্রথম তিন মাসে উল্লিখিত প্রতিটি খাতেই ঋণ বিতরণের হার কমেছে। কৃষি খাতে ২০১৩ সালে ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ বিতরণের পরিমাণ ছিল ৩৮২ কোটি টাকা (১ দশমিক ৫৬ শতাংশ)। ২০১৪ সালে এটা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৫৭০ কোটি টাকা (২ দশমিক ৪ শতাংশ)। ব্যাংকগুলো কর্তৃক অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঋণ প্রদান ও এনজিও সংশ্লিষ্টতার কারণে কৃষি খাতে ঋণ বিতরণ বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে চলতি পঞ্জিকা বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে কৃষি খাতে ঋণ বিতরণ কমেছে। এ সময়ে ঋণ বিতরণের পরিমাণ হচ্ছে ৪৭২ কোটি টাকা। এটা মোট বিতরণকৃত ঋণের ২ দশমিক ০৪ শতাংশ। পর্যালোচনায় দেখা যায়, কৃষি খাতের চারটি (শস্য, শস্য ব্যতীত অন্যান্য, মৎস্য ও বনায়ন) উপখাতের মধ্যে বনায়ন খাতে কোনো ব্যাংকই ঋণ দেয়নি। এ ছাড়া শস্য উৎপাদন ও মৎস্য খাতেও কোনো কোনো ব্যাংক ঋণ দেয় না। ব্যাংকগুলোর মধ্যে স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া শুধু শস্য উৎপাদন খাতে; স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, ব্যাংক আলফালাহ ও ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান শস্য ব্যতীত অন্যান্য খাতে এবং মৎস্য খাতে কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন, এইচএসবিসি, হাবিব ব্যাংক ও সিটি ব্যাংক এনএ ঋণ দিয়ে থাকে।

শিল্প খাতে ২০১৩ সালে ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ বিতরণের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা (১৭ দশমিক ২৪ শতাংশ)। ২০১৪ সালে এটা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা (১৫ দশমিক ০৪ শতাংশ)। তবে চলতি পঞ্জিকা বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে শিল্প খাতে ঋণ বিতরণ কিছুটা বেড়েছে। এ সময়ে ঋণ বিতরণের পরিমাণ হচ্ছে ৩ হাজার ৬২৭ কোটি টাকা। এটা মোট বিতরণকৃত ঋণের ১৫ দশমিক ৭০ শতাংশ। ব্যবসা-বাণিজ্য (আমদানি-রপ্তানি, পাইকারি ও খুচরা, হোটেল-রেস্তোরাঁ) খাতে ২০১৩ সালে ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ বিতরণের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৭৬৭ কোটি টাকা (১৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ)। ২০১৪ সালে এটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭০ কোটি টাকা (১৭ দশমিক ১২ শতাংশ)। তবে চলতি পঞ্জিকা বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে ঋণ বিতরণ কিছুটা কমেছে। এ সময়ে ঋণ বিতরণের পরিমাণ হচ্ছে ৩ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা। এটা মোট বিতরণকৃত ঋণের ১৬ দশমিক ৩০ শতাংশ।

ছয় মাসে মুনাফা ৯৮৪ কোটি টাকা : বিদেশি ব্যাংকগুলোর মধ্যে একমাত্র ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান লোকসানি ব্যাংক। ২০১৩ ও ২০১৪ সালে ব্যাংকটির লোকসানের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ১১৬ কোটি টাকা ও ২২৮ কোটি টাকা। চলতি পঞ্জিকা বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) ব্যাংকটির লোকসান প্রাক্কলন করা হয়েছে ৮৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এ ছাড়া ব্যাংক আলফালাহ ২০১৩ সালে প্রায় ১৭ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছিল।

কিন্তু ২০১৪ সালে ব্যাংকটি ২২ কোটি ৭০ লাখ টাকা নিট মুনাফা অর্জন করে। ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান ছাড়া চলতি পঞ্জিকা বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) ৮টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের নিট মুনাফা প্রাক্কলন করা হয়েছে ৯৮৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ৫৮৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা, হংকং এন্ড সাংহাই ব্যাংকিং কর্পোরেশন লিমিটেড (এইচএসবিসি) ২৬১ কোটি ৯০ লাখ টাকা, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন ৪৭ কোটি টাকা, সিটি ব্যাংক এনএ ৪৬ কোটি ২০ লাখ টাকা, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া ২০ কোটি ৯০ লাখ টাকা, ব্যাংক আলফালাহ লিমিটেড ১১ কোটি ৬০ লাখ টাকা, ঊরি ব্যাংক ৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা ও হাবিব ব্যাংক লিমিটেড ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা মুনাফা অর্জন করবে।