বিনিয়োগকারীদের জরুরি সেবা দিতে ‘কর্তৃপক্ষ’

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয় তথ্য ও সেবা দিতে বিনিয়োগ বোর্ড ও বেসরকারিকরণ কমিশনকে একীভূত করে ‘বাংলাদেশ বিনিয়োগ বোর্ড ও শিল্প উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ গঠন করতে যাচ্ছে সরকার। নতুন এই কর্তৃপক্ষের সর্বময় ক্ষমতা থাকবে ‘গভর্নিং বডি’র হাতে, যার চেয়ারম্যান হবেন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, এনবিআর চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান, এফবিসিসিআইর সভাপতিসহ বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিও থাকবেন এতে। পাশাপাশি এ কর্তৃপক্ষের অধীনে একটি ‘আন্তমন্ত্রণালয় ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার’ থাকবে, যারা নিবন্ধিত শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর চাহিদা মতো প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সেবা দ্রুত নিশ্চিত করবে।

এরই মধ্যে ‘বাংলাদেশ বিনিয়োগ বোর্ড ও শিল্প উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ গঠনের জন্য আইনের খসড়া প্রায় চূড়ান্ত করেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক আন্তমন্ত্রণালয় সভায় এটি চূড়ান্ত হয়। শিগগিরই মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর বিলটি পাস হবে। এর মধ্য দিয়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।

প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, বিনিয়োগকারীদের চাহিদা অনুযায়ী তথ্য ও সেবা দ্রুত নিশ্চিত করতে বিনিয়োগ বোর্ড ও বেসরকারিকরণ কমিশনকে একীভূত করতে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা শিগগিরই বাস্তবায়ন হবে। বিনিয়োগকারীরা এক ছাদের নিচে সব ধরনের সেবা পাবে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক-১ (যুগ্ম সচিব) শেখ ইউসুফ হারুন কালের কণ্ঠকে বলেন, খসড়া আইনের ওপর কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের মতামত পাওয়া গেছে। সব কিছু ঠিক থাকলে এক মাসের মধ্যে খসড়া আইনটি মন্ত্রিসভার বৈঠকে উঠবে। তারপরই এটি বিল আকারে সংসদে যাবে। চলতি বছরের মধ্যেই দুটি সংস্থাকে একীভূত করার কাজ শেষ হবে বলে আশা করেন তিনি।

প্রস্তাবিত কর্তৃপক্ষ বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধনের সময়ই গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, পয়ঃপ্রণালি ও টেলিযোগাযোগ সংযোগ দেওয়ার সময়সীমা লিখিতভাবে জানিয়ে দেবে। এ ছাড়া আমদানি করা যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ ও কাঁচামালের ক্ষেত্রে শুল্ক কর্তৃপক্ষের ছাড়করণ, পরিবেশ দূষণসম্পর্কিত ছাড়পত্র এবং শিল্প স্থাপন ত্বরান্বিত করতে প্রয়োজনীয় অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বিষয়ে সময়সীমা নির্ধারণ করে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত দেবে। নিবন্ধিত বিনিয়োগের জন্য বিদেশি ঋণ, সরবরাহকারী ঋণ (সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট) ও বিলম্বিত ঋণের পরিমাণ ও শর্তও ঠিক করে দেবে কর্তৃপক্ষ। বেসরকারি খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বেপজা, বেজা, বিসিক ছাড়া অন্য যেকোনো স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণাধীন শিল্প এলাকায় জমি বরাদ্দ দিতে পারবে সরকার।

নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে উৎপাদনে যেতে কোনো সমস্যা হলে তা দূর করার বিষয়ে বিনিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে পারবে এবং সে অনুযায়ী সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগে ব্যর্থ হলে কর্তৃপক্ষ তা পর্যালোচনা করে নতুন সিদ্ধান্ত দেবে, যা মানতে বাধ্য থাকবে বিনিয়োগকারী। তবে অনুমোদনসংক্রান্ত কোনো শর্ত লঙ্ঘন করলে প্রকল্পটির অনুমোদন বাতিল করতে পারবে কর্তৃপক্ষ।

এই কর্তৃপক্ষের সর্বময় সিদ্ধান্তদাতা হিসেবে কাজ করবে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত গভর্নিং বডি। এতে ভাইস চেয়ারম্যান হবেন অর্থমন্ত্রী। শিল্পমন্ত্রী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী এবং পরিকল্পনামন্ত্রী গভর্নিং বডির সদস্য থাকবেন। এ ছাড়া কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিষদের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান, এফবিসিসিআইর সভাপতি এবং সরকার মনোনীত আরো দুটি বিশেষায়িত চেম্বারের দুজন প্রতিনিধি থাকবেন, যাঁদের একজন হবেন নারী। তাঁরা বিনিয়োগকারীদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেবেন। এমনকি সরকারের অব্যবহৃত জমি বরাদ্দ, অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত, এলাকাভিত্তিক শিল্প স্থাপনে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণ, শিল্প প্রকল্প অনুমোদন ও নিবন্ধনসহ বেসরকারি খাতের উন্নয়নে বিভিন্ন নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করবেন। সর্বোচ্চ ১০০ কোটি টাকা মূল্যের সরকারি শিল্প ও কলকারখানা বা তার সম্পত্তি গভর্নিং বডি এককভাবে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত দিতে পারবে। তবে এর চেয়ে বেশি মূল্যের সম্পদ হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত সরকারের ‘অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি’তে অনুমোদিত হতে হবে।

খসড়া আইনের ১১(২) ধারায় বলা হয়েছে, ‘কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধিত হইলে এই আইনের অধীন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত শিল্প বলিয়া গণ্য হইবে এবং কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত শিল্পের ক্ষেত্রে যে সকল সুযোগ-সুবিধার বিধান করা হইবে, উক্ত শিল্পের ক্ষেত্রেও উহার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সেই সকল সুযোগ-সুবিধার বিধান যাইবে।’ আমদানি স্বত্ব নির্ধারণের ক্ষমতাও থাকবে এ কর্তৃপক্ষের হাতে।

বিদম্যান আইনে বিনিয়োগ বোর্ড একজন ব্যবসায়ীকে শুধু প্রকল্পের নিবন্ধন দিতে পারে, জমি নয়। তা ছাড়া বোর্ডের নিজস্ব কোনো প্লট বা জমিও নেই। অন্যদিকে শিল্প, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অধীনে অব্যবহৃত পড়ে থাকা প্রায় সাড়ে ১২ হাজার একর সরকারি জমি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বেসরকারিকরণ কমিশনকে। কিন্তু মন্ত্রীদের তীব্র বিরোধিতার কারণে গত পাঁচ বছরে এক একর জমিও ছাড়তে পারেনি কমিশন। একদিকে জমির জন্য হাহাকার, অন্যদিকে সরকারি জমি অব্যবহৃত পড়ে থাকা-এমন বাস্তবতায় এ দুটি সংস্থাকে একীভূত করে বিনিয়োগকারীদের সমস্যা সমাধান করার উদ্যোগ নেয় সরকার।

সরকারের জমি লিজে পাবে বেসরকারি খাত : খসড়া আইনে সরকারের বিভিন্ন কলকারখানার অব্যবহৃত জমি বেসরকারি খাতে হস্তান্তর প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত উল্লেখ আছে। চুক্তির মাধ্যমে সরকার তার জমি নির্দিষ্ট ফিসের বিনিময়ে বেসরকারি খাতে শিল্প স্থাপনে হস্তান্তর করবে। তবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তা পরিচালনায় ব্যর্থ হলে সরকারের অনুকূলে তা ফিরিয়ে দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে সরকার বিধিমোতাবেক ওই প্রতিষ্ঠানকে মূল্য পরিশোধ করবে।

খসড়া আইনের ২০ ধারায় বলা হয়েছে, দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বেসরকারি খাতে শিল্প স্থাপন ও সরকারি শিল্প বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, এর অব্যবহৃত জমি বা স্থাপনা অধিকতর দক্ষ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের জন্য নীতিমালা প্রণয়ন করে তা সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করবে কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া সরকারের শিল্প বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অব্যবহৃত জমি বরাদ্দ দেওয়ার ব্যবস্থাও নেবে। এ ক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে সরকারের কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পুরোটা, অংশবিশেষ, জমি বা মেশিনারি বরাদ্দ দেওয়া যাবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অংশীদারির ভিত্তিতে এসব কারখানা ও মেশিনারি বরাদ্দ এবং লিজে জমি গ্রহণ করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিনিয়োগকারীকে চুক্তি করতে হবে। বরাদ্দের মাধ্যমে পাওয়া অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা হবে। ওই অর্থ দিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আগের দায়-দেনা পরিশোধ করা হবে। প্রয়োজনে বেসরকারিকরণের স্বার্থে করপোরেটাইজেশন এবং কমার্শিয়ালাইজেশনসহ অন্যান্য পদক্ষেপও নিতে পারবে সরকার। হস্তান্তরকালে কোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকরা তাঁদের ন্যায্য পাওনা থেকে যাতে বঞ্চিত না হন, সে জন্যও আইনে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে কোনো শিল্প বা বাণিজ্যপ্রতিষ্ঠান হস্তান্তরের পর বেসরকারি খাত শর্ত বরখেলাপ করলে সরকার বা কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠান পুনর্দখলে নিয়ে দলিল বাতিল করতে পারবে।

এই আইন বলবৎ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রহিত হয়ে যাবে ‘বিনিয়োগ বোর্ড আইন ১৯৮৯’ এবং ‘বেসরকারিকরণ আইন ২০০০’। ফলে বিলুপ্ত হয়ে যাবে প্রতিষ্ঠান দুটিও। তবে সংস্থা দুটির কার্যক্রম ‘গৃহীত হয়েছে’ বলে গণ্য হবে। আর বেসরকারিকরণ আইনের আওতায় নির্দিষ্ট করা সরকারি শিল্প বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা এসব প্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত জমি বা স্থাপনা বেসরকারিকরণের বদলে অধিকতর দক্ষ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের জন্য বেপজা ও বেজার কাছে হস্তান্তর বা বিনিয়োগকারীকে বরাদ্দ দেবে কর্তৃপক্ষ।

খসড়া আইনের ৩৫(৩) ধারায় বলা হয়েছে, ‘বিলুপ্ত বিনিয়োগ বোর্ড এবং বেসরকারিকরণ কমিশনের সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারী বাংলাদেশ বিনিয়োগ ও শিল্প উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’র নিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী বলে গণ্য হবেন।

এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে এটি হবে দেশে একীভূত হওয়ার দ্বিতীয় ঘটনা। এর আগে ২০১০ সালের ৩ জানুয়ারি শিল্প ব্যাংক এবং শিল্প ঋণ সংস্থাকে একত্রিত করে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল) গঠন করা হয়।