সমস্যা এভারেস্ট, মেয়রদ্বয়কে হতে হবে হিলারি

এটা কি উন্নয়নের চাঁদে কলংক, নাকি আলোর নিচে অন্ধকার? ধনাঢ্য কোটিপতিদের নতুন ঢাকা বাদ দিলে সমগ্র পুরান ঢাকা দিন দিন বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে। দুই নতুন তারকা মেয়রকে আমরা অনেক আশা নিয়ে ভোট দিয়েছি, তারা ঢাকা শহরের মানুষের অসুবিধাগুলো দেখবেন। এখনই তাদের দোষারোপ করতে চাই না। তবে দয়া করে যদি তারা রুটিন ওয়ার্ক করেন, দায়িত্বপরায়ণ হন, তাহলে সমস্যাগুলো প্রতিদিন কমতে থাকবে; আর যদি কচ্ছপ এবং খরগোশের কেচ্ছা অনুকরণ করেন, ভাবেন যে ঘুম থেকে উঠে একদিনেই স্তূপীকৃত সমস্যা দূরীভূত করবেন, তাহলে পর্বততুল্য সমস্যা টলাতে পারবেন না। টলে যাবে মানুষের মন আপনাদের ওপর থেকে।

এমনিতে নির্দিষ্ট সময়ের অনেক বিলম্বে ঢাকা সিটি নির্বাচন হওয়াতে সমস্যা জমাট বেঁধেছে। এ সমস্যাগুলো দূর করতে মেয়রদের প্রতিদিন কাজ করার কোনো বিকল্প নেই। অনেক সমস্যা ঢাকা শহরের। যানজট আর ময়লা-আবর্জনার কথা বলতে গেলে মহাভারত হবে। ধরুন যানজটে আটকা পড়ে বাস কিংবা রিকশা থামল এমন জায়গায়, যেখানে ময়লার স্তূপ। আগ্নেয়গিরির মতো দুর্গন্ধের লাভা বের হচ্ছে। উৎকট দুর্গন্ধ মানুষের পেটের মধ্যে ঢুকে নাড়িভুঁড়ি উল্টিয়ে দিচ্ছে, নাক পুড়িয়ে দিচ্ছে, মাথা গুলিয়ে দিচ্ছে, তাহলে মানুষের দশা কেমন হতে পারে? এখন এমনই যানজট যে, একবার তার আংটায় গেঁথে গেলে আর সহজে ছুটবার জো নেই। হতে থাকে স্বাস্থ্যের ক্ষতি এবং সময়ের অপচয়। সময় নাকি মূল্যবান সম্পদ, তা একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না। অবশ্য এমন অভিশপ্ত খবর আমাদের কানে আসেনি যে, হাসপাতাল গমনকারী শত শত রোগী যানজটের কবলে পড়ে রাস্তায় গাড়ির মধ্যেই মারা গেছে। ভবিষ্যতে হয়তো এমন ঘটনা ঘটবে।

জাতীয় পত্রিকাগুলোতে ঢাকা শহরের যানজট আর ময়লা-আর্বজনা নিয়ে দীর্ঘ প্রতিবেদন লেখা হচ্ছে। ভয়াবহ চিত্রের বর্ণনা দিচ্ছেন প্রতিবেদকরা। সেসব পড়ে বুঝেছি, কোনো সমস্যাই কর্তৃপক্ষের অবহেলা ব্যতীত জট পাকিয়ে ওঠেনি। কোনো কিছুই মানুষের হাতের বাইরে নয়। ইন্দোনেশিয়ায় যে সুনামি হয়েছিল তার পেছনেও মানুষের কালো হাত ছিল। ঢাকার মানুষের যানজটের সমস্যাও মানুষসৃষ্ট, ব্যতিক্রম থাকতে পারে। স্বয়ং মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘রাজনৈতিক কারণে রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসন করা সম্ভব হচ্ছে না। সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা রাজধানীর ফুটপাত দখল করে রেখেছেন। উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে এসব সড়ক দখলমুক্ত করার পর দেখা গেছে আবারও দখল হয়ে গেছে। আমি নিজে উপস্থিত থেকে বিভিন্ন এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেছি এবং এক ঘণ্টা পরই আবার ওই সড়ক দখল হয়ে গেছে। যানজট নিরসনে যোগাযোগ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি এবং প্রকৌশলীদের পরামর্শে সড়কের জায়গা বাড়িয়ে চার লেন করা হয়েছে। কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি। কারণ যারা আইন প্রণয়ন করেন, তারাই আইন মানেন না। অনেক সংসদ সদস্য রয়েছেন যারা যানজট এড়াতে উল্টো পথে গাড়ি চালান। এ অবস্থা চলতে থাকলে ১৬ লেন করেও যানজট নিরসন করা সম্ভব হবে না।’ (জনকণ্ঠ-২৫/০৬/২০১৫)।

মন্ত্রীমহোদয়ের সৎ সাহসের তারিফ না করে কেউ পারবেন না। প্রকৃত চিত্রটাই তুলে ধরেছেন। তাহলে আমরা এ সিদ্ধান্তে আসতে পারি, সব সময় ক্ষমতাবানরা ক্ষমতাহীন সিভিল মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে থাকেন।

আমরা জানি মানুষ বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। বাংলাদেশ এমনি একটি দেশ, যে দেশের লোকজন রাজধানীমুখী। বর্তমান ১৬ কোটি মানুষের চাপ রাজধানীর ওপর। ক্রমাগত ঢাকা শহরের আয়তন বেড়ে যাচ্ছে। তবুও চাপ কমছে না। বর্তমানে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েই যাচ্ছে। তারা গাড়ি ছাড়া চলতে পারেন না। তাই ঢাকা শহরে যত বৈধ বাড়ি ও ট্রাক, প্রাইভেট কার, রিকশা, ভ্যান ও সিএনজি থাকার কথা তার দশ গুণ বেশি আছে অবৈধ, এমন পরিসংখ্যান পত্রিকায় পেয়েছি। নগরে যতটা সরকারনির্র্ধারিত ফুটপাত এবং গাড়ি চলার রাস্তা আছে, তার তুলনায় ঢের বেশি গুণ যানবাহন চলাচল করছে রাস্তায়। তাহলে যানজট কমবে কেন? সূত্র মেলাতে গেলে সেই অনিয়মের চিত্রই বের হয়ে পড়ে। সরকার যদি দলনিরপেক্ষভাবে অনিয়ম শক্ত হাতে দূর করতে পারে তাহলে যানজট কম হবে। শুধু উড়াল সেতু দিয়ে যানজটের সুরাহা হবে না।

উড়াল সেতু নির্মিত হচ্ছে মালিবাগ মোড় থেকে তেজগাঁও-এর শেষ মাথা পর্যন্ত। তাই পাবলিক বাসে মৌচাকে প্রবেশ করলেই মগবাজারের মোড় পর্যন্ত অভিশপ্ত যানজট। তেজগাঁওয়ে একটি দৈনিক পত্রিকা অফিসে যাওয়ার পথে সর্বোচ্চ আড়াই ঘণ্টা পর্যন্ত বাসে বসে প্রহর গুনেছি। এর চেয়ে যন্ত্রণা আর কী হতে পারে? আমার একটা সুবিধা আছে আমি ব্যাগে সব সময় বই রাখি, যানজটের সময় বইটি পড়তে পড়তে শেষ করে ফেলি। মহামতি এঙ্গেলসের ‘এন্টিডুরিং’ বইটি বাসে বসেই পড়েছি। ভাবছি বাসে বসেই লেখার অভ্যাসটা করে ফেলব, সঙ্গে চিড়া, গুড় রাখলে মন্দ হয় না। কিন্তু সাধারণ যাত্রীদের বেলায় তো এ পদ্ধতি প্রযোজ্য হবে না। তারা তো ধৈর্য হারিয়ে নিজের মাথার চুল ছিঁড়তে থাকে।

আমরা লক্ষ করেছি, উড়াল সেতুর কাজ চলছে শম্বুকগতিতে। এতে যানজট বৃদ্ধি পাচ্ছে। মন্ত্রীমহোদয় সত্য ভাষণ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করতে পারেন না। তিনি যদি কতিপয়ের কাছে অপ্রিয় হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে শক্ত হাতে উড়াল সেতুর কাজ মনিটরিং করেন, অনিয়ম দূর করেন, কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার চাপ দেন, তাহলে কাজের কাজ হবে।

ট্রাফিক আইনের সংস্কার করতে হবে। আমরা ভুক্তভোগী নাগরিকরা হাড়ে হাড়ে জানি, ট্রাফিক আইন যথাযথ পালিত হচ্ছে না। ট্রাফিক আইন প্রয়োগের গাফিলতি যানজট বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। নাগরিকদেরও দায়িত্বহীনতা আছে। এদেশের জনগণের ঘোড়ার রোগ আছে। এক কিলোমিটার পথ হেঁটে যাওয়া যায়, তা না করে গাড়ি কিংবা রিকশায় যাওয়া হয়, এতেও যানজট বৃদ্ধি হচ্ছে। ড. মযহারুল ইসলামের একটি কলামে পড়েছি, কলকাতার নাগরিকরা মাইলকে মাইল পথ হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছায়। সহজে গাড়ি কিংবা রিকশায় চড়ে না। চড়ে ট্রামে। বারান্তরে আরও একটি কথা বলা দরকার, ঢাকা শহরের কোনো কোনো উড়াল সেতু মানুষ ব্যবহার করে না, যেমন সদরঘাটের মোড়ের উড়াল সেতুটি। ওই সেতুর ওপর জমেছে ময়লা-আবর্জনা, ওখানে দিনে-রাতে গাঁজাখোররা গাঁজা সেবনের আড্ডা জমিয়েছে। কোটি কোটি টাকা খরচ করে এজন্যই কি সরকার উড়াল সেতু বানিয়েছে? ব্যাপারটি নগর কর্তৃপক্ষ পর্যবেক্ষণ করলে আমার কথার সত্যতা মিলবে।

সরকারকে অনুরোধ জানাব, সব জায়গায় একসঙ্গে উড়াল সেতুর কাজ না ধরতে। কাজের সিরিয়াল মানা হলে কাজ সময়মতো সম্পন্ন হবে। একটা জায়গার কাজ নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করে অন্য জায়গায় কাজ ধরলে কাজের বরকত হবে, যানজট এত প্রকট হবে না। উড়াল সেতু নির্মাণের কারণে পুরো ঢাকা শহরের মানুষকে দুর্ভোগের মধ্যে ফেলা যুক্তিসঙ্গত মনে হচ্ছে না।

পুরান ঢাকার অলিগলির পথগুলো হাঁটাচলা ও রিকশা চলার অনুপোযগী হয়ে পড়েছে মেরামতের অভাবে। এসব এলাকার মানুষ অনুভব করে না তারা আধুনিক যুগের রাজধানীর বাসিন্দা। রাস্তার চামড়া উঠে গেছে, গর্ত হয়েছে, বৃষ্টি নামলে কোমর পানি হয়ে যায়। ম্যানহোলের ঢাকনা নেই, ময়লা-আবর্জনা থৈ থৈ করে। বছরের পর বছর কেন পুরান ঢাকার অলিগলিগুলো মেরামত করা হচ্ছে না?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, নগর পরিকল্পনাবিদ নূরুল ইসলাম নাজেম বলেছেন, সার্বিক দিক বিবেচনা করলে এটা রাজধানী শহর তা বোঝা যায় না। যে দিকেই তাকানো যায়, সে দিকেই পরিকল্পনার অভাব চোখে পড়ে। অর্থাৎ রাজধানী ঢাকাকে অপরিকল্পিতভাবে সাজানোর চেষ্টা চলছে শুরু থেকেই। যে কারণে আজকের দিনগুলোতে যানজটসহ হাজারও সমস্যা মোকাবেলা করে এ শহরে বসবাস করতে হচ্ছে নাগরিকদের।

নবনির্বাচিত মেয়রদের কাছে প্রত্যাশা অনেক। নাগরিকদের দুর্বিষহ জীবন থেকে মুক্তি দেয়ার সদিচ্ছায় যদি তারা নিরলস চেষ্টা করেন, অনিয়ম দূর করেন, সুষ্ঠু পরিকল্পনা হাতে নেন, সব মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করেন, ট্রাফিক আইন সংস্কার করেন, অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধ করতে পারেন, পুরনো ভাঙাচোরা রাস্তা মেরামত করেন, তাহলে সমস্যার দৈত্য পরাজিত হবে। ঢাকার সমস্যা এভারেস্টের মতো উঁচু। মেয়রদ্বয়কে হিলারী হতে হবে।

মাহমুদুল বাসার : কলাম লেখক, গবেষক