তেল ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রের দিকেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে নতুন দুটি সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ঈশ্বরদী ও সিরাজগঞ্জে এ কেন্দ্র স্থাপিত হবে। এতে ব্যয় হবে ৪৬ কোটি টাকা। যার পুরোটাই সরকারি কোষাগার থেকে অর্থায়ন করা হবে। কেন্দ্র দুটি নির্মাণের দায়িত্বে থাকবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। ২০১৮ সালের জুনের মধ্যেই এ বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাবে।
জানা গেছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটির বিষয়ে একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। এতে মোট ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে। শিগগিরই এ বিষয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির বৈঠক ডাকা হবে। বৈঠকে প্রকল্পের বিভিন্ন দিক যাচাই-বাছাই করে এটির চূড়ান্ত প্রস্তাবনা তৈরি করা হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেল ও কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কারণে পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে ওই স্থানীয় বাতাস, পানি সম্পদ, জীব বৈচিত্র্যসহ বনভূমির ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ে। হুমকির মুখে পড়ে মানুষসহ প্রাণীকুল। এজন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নবায়নযোগ্য জ্বলানি তথা পরিবেশবান্ধব বিকল্প জ্বালানির প্রতি জোর দেয়া হচ্ছে। আর বিকল্প জ্বালানির তালিকায় শীর্ষের রয়েছে সৌরশক্তি। প্রযুক্তির কল্যাণে অফুরন্ত এ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন দেশে বৃহৎ পরিসরে সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। আর সীমিত সম্পদের কারণে বাংলাদেশেও এর প্রতি ব্যাপক জোর দেয়া উচিত।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি অনুযায়ী আগামী ২০২১ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুতের ১০ ভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে হবে। এরমধ্যে দুই হাজার মেগাওয়াট হবে সৌর থেকে। এ ছাড়া ২০২১ সালের মধ্যে এক হাজার ১২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বায়ু থেকে উৎপাদন করার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, পরিবর্তিত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়েও তারাও নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জোর দিচ্ছে। এজন্য ব্যক্তি, সরকারি ও সরকারি-বেসরকরি উদ্যোগকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যেই প্রায় ২০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে। ২০০ মেগাওয়াটের এই সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র করতে এক হাজার একর জমি প্রয়োজন হবে।

সূত্র জানায়, বিদ্যুতে বেসরকারি অংশগ্রহণ এবং সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানিসংক্রান্ত বিভিন্ন যন্ত্রাংশ আমদানি সুলভ ও সহজ করাও হবে। সরকারি জমিতে কেন্দ্র করার বাধ্যবাধকতা থাকায় বেসরকারি খাতের প্রসার ঠিকভাবে হচ্ছে না। বর্তমান নীতিতে শুধু সরকারি জমিতেই বড় আকারে সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। সংশোধনীতে বেসরকারি উদ্যোক্তারাও তাদের পছন্দমত জমিতে সৌর অথবা বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে পারবে। বড় পরিসরে সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ উৎসাহিত করতে এ উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

জানা গেছে, দেশের প্রত্যন্ত অনেক অঞ্চল রয়েছে যেখানে বিদ্যুৎ পৌঁছানো ব্যয়সাপেক্ষ। এজন্য সেসব এলাকায় সৌর বিদ্যুতে জোর দেয়া হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট সৌর বিদ্যুৎ স্থাপন হলেও বড় সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র হয়নি। দেশে বর্তমানে ১০ লাখ সৌর বিদ্যুতের গ্রাহক আছে। বিভিন্ন এনজিও এবং নিজস্ব উদ্যোগে ছোট আকারে সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে সরকারি অর্থে আরো দুটি সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন রয়েছে। এর একটি চট্টগ্রামের কাপ্তাইয়ে, অপরটি নোয়াখালীর হাতিয়ায়। কাপ্তাইয়ের কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র সংলগ্ন এলাকায় এ সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ চলছে। এই কেন্দ্র থেকে ৫-১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। প্রায় ৫০ একর জমির ওপর সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বসানো হচ্ছে।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে ১২৪ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এর মধ্যে ২.৭ মিলিয়ন সোলার হোম সিস্টেম থেকে ১১১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসছে। নতুন বিদ্যুৎ সংযোগের বিপরীতে স্থাপিত এসএইচএস থেকে ৯.৩৭ মেগাওয়াট, বিদ্যুৎ বিভাগের বিভিন্ন বিতরণ কোম্পানির অধীনে গ্রিড এলাকায় বসানো সোলার হোম সিস্টেম প্যানেল থেকে ১.১০ মেগাওয়াট, বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে বসানো সোলার হোম সিস্টেম প্যানেল থেকে ১.৫ মেগাওয়াট, বাণিজ্যিক ও বিভিন্ন শপিং মলে বসানো সোলার হোম সিস্টেম থেকে ১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।