নীলিগিরি বাংলাদেশের দার্জিলিং

মেঘের কোলে ভেসে ভেসে আকাশ ছুঁতে চান কতইনা মজা। ভাবতে মনটা কেমন নেচে উঠে। আপনি যদি মেঘের কোলে ভেসে আকাশটাকে ছুঁতে চান তাহলে আপনাকে যেতে হবে বান্দরবানের পর্যটন স্পট নীলগিরিতে। আকাশ ছুঁয়ে দেখা যায় বান্দরবানের এই নীলগিরি পর্যটন স্পটে। জেলা সদর থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ের চূড়ায় নীলগিরির অবস্থান। অল্প সময়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পরিচালিত পর্যটন স্পট নীলগিরি সারাদেশে পরিচিতি লাভ করেছে। পাহাড়ি আঁকা-বাঁকা পথে বান্দরবান থেকে চাঁদের গাড়ি কিংবা জিপ-মাইক্রো বাসে চড়ে খুব সহজেই নীলগিরিতে যাওয়া যায়।

নীলগিরি যেন প্রকৃতির এক অনন্য দান। যারা আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখেন নীলগিরিতে গেলে তার কিঞ্চিত স্বপ্ন পূরণ হতে পারে। নীলগিরিতে গেলে মনে হবে আপনি আকাশের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। মেঘেরা নিজ থেকেই আপনাকে ছুঁয়ে যাবে। নীলগিরির চূড়া থেকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাহাড় কেওক্রাডং, প্রাকৃতিক আশ্চর্য বগালেক, কক্সবাজারের সমুদ্র, চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরের আলো-আঁধারি বাতি এবং চোখ জুড়ানো পাহাড়ের সারিও দেখতে পাওয়া যায়।

দুর্গম পাহাড়ে নীলগিরি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে আকাশ নীলা, মেঘদূত, নীলাতানা নামে পর্যটকদের জন্য সকল সুবিধা সম্বলিত তিনটি কটেজ। কটেজগুলো রাত যাপনের জন্য ভাড়া পাওয়া যায় এক হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকার মধ্যে। এখানে এক কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা হয়েছে অত্যাধুনিক একটি রেস্টুরেন্টও। নীলগিরির কাছাকাছি রয়েছে বেশ কয়েকটি ম্রো উপজাতীয় গ্রাম। নীলগিরির একদম কাছে কাপ্রু পাড়া, আপনি সহজেই পরিদর্শন করে ম্রো আদিবাসী সম্পর্কে জানতে পারবেন। নীলগিরিতে রয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি ক্যাম্প। ফলে এখানে নিরাপত্তার কোন ঘাটতি নেই। আপনার যে কোন প্রয়োজনে সেনা সদস্যরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে।

 রাতের নীলগিরি :

নীলগিরির রাতের সৌন্দর্য আপনাকে আরো হতবাক করে তুলবে। চারিদিকের হরিণ, শিয়ালসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণীর ডাক আর পাহাড়গুলোর আলো-আঁধারির খেলা দেখে আপনার জীবনকেই যেন রহস্যময় বলে মনে হবে। যারা জীবনে এডভেঞ্চার পছন্দ করেন তাদের জন্য রাতের নীলগিরি হতে পারে উৎকৃষ্ট স্থান।

কীভাবে যাবেন :

সারা দেশের সাথে বান্দরবানের একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম সড়কপথ। প্রতিদিন সড়ক পথে ঢাকার ফকিরাপুল, সায়েদাবাদ, মতিঝিল, আরামবাগ, কমলাপুর, কলাবাগান থেকে বিভিন্ন কোম্পানির বাস বান্দরবানের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। এসব ষ্টেশন থেকে এস.আলম, সৌদিয়া পরিবহন, হানিফ পরিবহন, ইউনিক সার্ভিস, শ্যামলী এন্টারপ্রাইজ, বি.আর.টি.সি, সেন্টমার্টিন, ঈগল পরিবহনের বাসগুলো যাত্রী পরিবহন করে থাকে। এসি এবং নন এসি উভয় বাসই বান্দরবান যাতায়াত করে। ভাড়া ৮শ থেকে ১হাজারের মধ্যে। সড়ক পথের যানজট এড়িয়ে আকাশ পথে আসতে চাইলে দেশের সব বিমানবন্দর থেকে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর হয়েও বান্দরবানের উদ্দেশ্যে রওনা করা যায়। চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট নামক বাস টার্মিনাল থেকে এবং রেলষ্টেশন সংলগ্ন বি.আর.টি.সি ষ্টেশন থেকে বান্দরবানে উদ্দেশ্যে বিভিন্ন বাস সার্ভিস চালু আছে।

থাকবেন কোথায় :

বান্দরবানে এসেই আপনাকে কোন একটি আবাসিক হোটেলে রুম নিয়ে বিশ্রাম নিতে হবে। শহরের মধ্যে বিভিন্ন দামের এসি/ ননএসি হোটেল পাওয়া যায়। পর্যাপ্ত হোটেল থাকায় রুম পেতে কোন ঝামেলা পোহাতে হয় না। তবে পর্যটনের ভরা মৌসুমে আগেভাগে বুকিং দিয়ে আসা ভালো। এখন বেশির ভাগ আবাসিক হোটেলের সাথেই খাবারের রেস্তোরা রয়েছে। খাবার-দাবার সেরে রুমে খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে আপনি নীলগিরির পথে রওনা হতে পারেন।

নীলগিরি যাবার পথে শৈলপ্রপাত ঝর্নাও আপনি দেখে যেতে পারেন। এই এলাকায় নেমে ঝর্ণার স্বচ্ছ জলে আপনি একটু মুখ-হাত ধুয়ে নিলে যাত্রা পথের ক্লান্তি অনেক কমে যাবে। স্থানীয় বম সম্প্রদায়ের বিচিত্র জীবন প্রণালি উপভোগ করাটা হবে যাত্রা পথে অতিরিক্ত পাওনা। শহরের রুমা বাস স্টেশন থেকে বিভিন্ন চাঁদের গাড়ি, জীপ ইত্যাদি নীলগিরি পর্যটন কেন্দ্রে চলাচল করে। আপনাকে এসব গাড়ি রিজার্ভ করেই যেতে হবে গন্তব্যে। কারণ রিজার্ভ গাড়িতে না গেলে আপনাকে পথে অনেক ঝামেলা পোহাতে হতে পারে। যা আপনার ভ্রমনের আনন্দকে ম্লান করে দিতে পারে। গন্তব্যে পৌঁছাতে এসব গাড়ী ২ থেকো ৩ ঘণ্টা সময় নিতে পারে।

শহর থেকে চাঁদের গাড়িগুলো নীলগিরী পর্যন্ত ৩/৪ হাজার টাকা ভাড়া নিয়ে থাকে। এসব চাঁদের গাড়িগুলো একসাথে ২০/২৫ জন পর্যন্ত যাত্রী পরিবহণ করে। নীলগিরী পৌঁছে আপনি সেখানে রাত যাপনও করতে পারবেন। এখানকার কটেজগুলো একটু ব্যয়বহুল। এখানকার প্রতিটি কটেজের ভাড়া রাতপ্রতি ৪/৫ হজার টাকার মধ্যে। আর থাকতে না চাইলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আপনাকে আবার বান্দরবান শহরের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে হবে।

নীলাচল :

বান্দরবান শহর থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরে নীলাচল পর্যটন কেন্দ্র। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ২ হাজার ফুট উচ্চতায় এই পর্যটন কেন্দ্রের অবস্থান। জেলা প্রশাসনের তত্বাবধানে পরিচালিত নীলাচলের এই পাহাড়ি এলাকাটিকে অনেকে বাংলার দার্জিলিং বলে থাকেন। এখান থেকে বান্দরবান শহরটি একনজরে দেখা যায়। সন্ধ্যায় মেঘমুক্ত আকাশে কর্নফুলী নদীর মোহনায় দাঁড়ানো অসংখ্যা লাইটারেজ জাহাজের আলোকছটা আপনার মনে এনে দেবে অপুর্ব তৃপ্তি। বিকেলের সুর্যাস্তের দৃশ্যও মন মাতানো।

যেভাবে যাবেন

বান্দরবান শহর থেকে চাঁদের গাড়ি, সিএনজি, মাহেন্দ্র, জিপ ইত্যাদি ভাড়ায় চলাচল করে এই রুটে। প্রতিটি চাঁদের গাড়ির আসা যাওয়া ভাড়া ৫শত টাকা। অন্যান্য যানগুলো আলোচনা সাপেক্ষে। নীলগিরি যাওয়ার পথে আপনি দেখে যেতে পারেন বান্দরবানের অপার সৌন্দর্যময় শৈলপ্রপাত। এখানে আদিবাসী বম তরুণীরা আপনাকে স্বাগত জানাবে। এখান থেকে কিনে নিতে পারেন আদিবাসীদের হাতের তৈরি নানা পণ্য। এর পরই চোখে পড়বে স্বপ্নচূড়া। স্বপ্নচূড়া থেকেও বান্দরবানের অবাক করা সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।

বাংলার দার্জিলিং খ্যাত চিম্বুকে

স্বপ্নচূড়ার পরই বাংলার দার্জিলিং খ্যাত চিম্বুকে পৌঁছে যাবেন আপনি। চিম্বুকের সুনাম সারা দেশব্যাপী। এখানে রয়েছে টি এন্ড টির বিশাল টাওয়ার, উন্নয়ন বোর্ড তৈরি করেছে সকল সুবিধা সম্বলিত রেস্ট হাউস। সড়ক ও জনপথ বিভাগের পুরনো একটি রেস্ট হাউসও রয়েছে এখানে। চিম্বুকে পৌঁছেই স্থানীয় আদিবাসীদের হাতের তৈরি এক কাপ চা খেয়ে নিজেকে চাঙ্গা করে রওয়ানা দিতে পারেন নীলগিরির দিকে। অথবা এর একটু দূরেই সেনাবাহিনী পরিচালিত ক্যান্টিন রয়েছে। এখানে আপনি সেরে নিতে পারেন দুপুরের খাবার অথবা হালকা খাবার।

নীলগিরি পর্যটন কেন্দ্রকে ঘিরে রয়েছে অপার সম্ভাবনা। অল্প সময়ের মধ্যেই দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করতে সম্ভব সব কিছুর ব্যবস্থা করা হয়েছে এখানে। অতি কম সময়ে এটি পরিচিতিও লাভ করেছে। প্রতিদিন শত শত পর্যটক আসছে এখানে। স্থানীয়দের ধারণা অদূর ভবিষ্যতে নীলগিরি পর্যটন কেন্দ্র হবে পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র। এছাড়াও স্পটটিকে ঘিরে সরকারেরও রয়েছে নানা পরিকল্পনা। সরাসরি গাড়ি নিয়ে নীলগিরি চূড়ায় আরোহণ করা যায়। ফলে পাহাড়ি পথে কোন দুর্ঘটনার ভয় নেই।

নীলগিরির সবচেয়ে মজার বিষয় হলো এখান থেকে চোখে পড়ে বান্দরবানের উপর দিয়ে বয়ে চলা সর্পিল সাঙ্গু নদী। এখান থেকে মনে হবে সাঙ্গু নদী আপনার খুব কাছে। সাঙ্গু নদীর অপরূপ সৌন্দর্য এখান থেকে উপভোগ করা যায়। সাঙ্গুর বুক চিরে বয়ে চলা ছোট ছোট নৌকাগুলোকে দেখলে দূর থেকে মনে হবে স্বপ্নের কোন ডিঙি বয়ে চলছে সাঙ্গু নদী দিয়ে।

ভিআইপিদের সরাসরি অবতরণের জন্য এখানে নির্মাণ করা হয়েছে হেলিপ্যাডও। তবে সাধারণ দর্শনার্থীদের হেলিপ্যাডে প্রবেশ করা নিষেধ। নীলগিরিতে সৃষ্টি করা হয়েছে ফুলের বাগান,পাহাড়ের উপরে সুন্দর এই ফুলের বাগানও অবাক করার মত। নীলগিরিতে যাওয়ার জন্য বান্দরবান হিলবার্ড এর সামনেই রয়েছে নানা ধরনের গাড়ি। আপনার পছন্দের গাড়িটি ভাড়া করে চলে যেতে পারেন নীলগিরিতে। তবে কটেজ বুকিং-এর জন্য আগে থেকেই কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করতে হবে।