২০১৮ সালের মধ্যেই খুলবে পদ্মা সেতু

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে অর্থ কোনো সঙ্কট নয়; প্রতিবন্ধকতা বা বাধা একটাই- সেটা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলে নির্ধারিত সময় ২০১৮ সালের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ- এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা।

বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রফেসর ড. শামসুল হক শুক্রবার আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিশেষত বন্যা দেখা না দিলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা দেখছি। তিনি বলেন, এবছর বা আগামী দুই বছর দেশ বন্যার কবলে না পড়লে সেতু নির্মাণ কাজের ক্ষেত্রে বিলম্ব হওয়ার কোনো লক্ষণ এখন পর্যন্ত নেই। ড. হক বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই মূল সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হবে। হয়তো সেতুর রেলপথটি ব্যবহার উপযোগী হবে না। কারণ, সেতুতে থাকা রেলপথের সুবিধা পেতে দুই প্রান্তে লাইন থাকতে হবে। মুন্সীগঞ্জ বা শরীয়তপুরে আমাদের পুরনো কোনো রেললাইন নেই।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্মকর্তারাও নির্ধারিত সময়ে সেতুর কাজ শেষ করার বিষয়ে আশাবাদী। অভ্যন্তরীণ খাত থেকে প্রতি বছর সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ার উদাহরণ টেনে সেতু বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক রেজাউল হায়দার বৃহস্পতিবার আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, পদ্মা সেতু প্রকল্প সরকারের অগ্রাধিকার তালিকার অন্যতম প্রধান প্রকল্প। এ কারণে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়া নিয়ে আমরা কোনো ধরনের সংশয়ে ভুগছি না।

৪ জুন জাতীয় সংসদে দেয়া বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, পদ্মা বহুমুখী সেতুর নির্মাণ কাজ নির্ধারিত সময়েই শেষ হবে। নিজস্ব অর্থায়নে এই সেতুর নির্মাণ কাজ এরই মধ্যে অনেক এগিয়েছে। ২০১৮ সালেই এই সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল শুরু হবে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও ২০১৮ সালের মধ্যেই সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ করার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী। এজন্য নিয়মিত বিরতিতে তিনি প্রকল্প এলাকা পরির্দশন করে কাজের গতি বাড়াতে তদারকি চালিয়ে যাচ্ছেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, পদ্মা সেতু প্রকল্পের প্রধান অনুষঙ্গগুলোর মধ্যে রয়েছে- মূল সেতু, নদী শাসন কাজ, জাজিরা সংযোগ সড়ক ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা, মাওয়া সংযোগ সড়ক ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা, সার্ভিস এরিয়া-২, পুনর্বাসন, পরিবেশ, ভূমি অধিগ্রহণ, সিএসসি (মূল সেতু ও নদী শাসন), সিএসসি (সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এরিয়া-২), ইঞ্জিনিয়ারিং সাপোর্ট অ্যান্ড সেফটি টিম (ইএসএসটি)। প্রকল্প এলাকায় এখন সমান্তরালভাবে সব অনুষঙ্গেরই কাজ চলছে। এভাবে চললে মূল সেতুর কাজের পাশাপাশি সংযোগ সড়ক ও নদী শাসনসহ সেতুর সঙ্গে সম্পৃক্ত সব কাজ আগামী তিন বছরের মধ্যেই সম্পন্ন হবে। সূত্র জানায়, পদ্মা সেতু প্রকল্পের অগ্রগতি বিষয়ে ১১ জুন সেতু ভবনে অনুষ্ঠিত হয় একটি বিশেষ সভা। সভায় সভাপতিত্ব করেন সেতু বিভাগের সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। সভায় প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম জানান, প্রকল্পের ভৌত কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক। বর্তমানে যে গতি ও প্রক্রিয়ায় পদ্মা সেতুর কাজ চলছে তা অব্যাহত থাকলে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই সেতুর নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হবে। তিনি বলেন, এরই মধ্যে জাজিরা সংযোগ সড়কের ৪৫ ভাগ, মাওয়া সংযোগ সড়কের ৪৭ ভাগ এবং সার্ভিস এরিয়া-২ এর ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৪০ ভাগেরও বেশি। তিনি আরও জানান, মূল সেতুর মোবিলাইজেশন কাজ চলমান রয়েছে। এরই মধ্যে দুটি টেস্ট পাইল ড্রাইভ এবং ভায়াডাক্টের ৬টি অ্যাংকর পাইল ড্রাইভ সম্পন্ন হয়েছে। সেতুর কাজে ব্যবহারের জন্য ২৪০০ টন ক্ষমতার পাইল ড্রাইভিং হ্যামার জার্মানি থেকে এবং এক হাজার টন ক্ষমতার ফ্লোটিং ক্রেন চীন থেকে সাইটে পৌঁছেছে। এছাড়াও পাইল নির্মাণ কাজে ব্যবহারের জন্য ৩ হাজার টন স্টিলপ্লেট সাইটে পৌঁছেছে। অন্যান্য নির্মাণ সামগ্রী ও যন্ত্রপাতি সাইটের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। তাছাড়া নদী শাসন কাজের মোবিলাইজেশন ভৌত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক সভাকে জানান, পুনর্বাসন খাত থেকে মে পর্যন্ত মোট ৫৩৩ কোটি ৪৬ লাখ টাকা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। পুনর্বাসন সাইটে একই সময়ের মধ্যে ২৫৯২ প্লটের মধ্যে ১২৯০টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে হস্তান্তর করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৬০টি ভূমিহীন (ক্ষতিগ্রস্ত) পরিবারকে বিনামূল্যে প্লট দেয়া হয়েছে। অবশিষ্ট প্লটগুলো হস্তান্তরের বিষয়ে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। ভূমি অধিগ্রহণ কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে জানানো হয়, প্রস্তাবিত ১৪২৩ দশমিক ৫৪ হেক্টর জমির মধ্যে অধিগ্রহণ করা হয়েছে ১৩৪১ দশমিক ৪৬ হেক্টর। এর মধ্যে ১২২১ দশমিক শূন্য ৪ হেক্টর জমির দখল বুঝে নেয়া হয়েছে।

জানা যায়, প্রকল্পের পরিবেশ কার্যক্রমের আওতায় পদ্মা সেতুর উভয় প্রান্তে পুনর্বাসন ও সার্ভিস এরিয়াগুলোতে মে পর্যন্ত ৫৫ হাজার ১৫০টি গাছ লাগানো হয়েছে। এছাড়া প্রকল্প এলাকায় একটি জাদুঘর স্থাপনের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সঙ্গে একটি চুক্তি হতে যাচ্ছে।

পদ্মা সেতুর ব্যয় বাড়ার বিষয়ে মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা জানান, পদ্মা সেতুর প্রাথমিক নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার। ওই সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্যমান ছিল ৬৯ টাকা। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের মূল বৃদ্ধি পেয়ে ৭৮ দশমিক ৪ টাকা হওয়ায় সেতুর নির্মাণ খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার। এতে করে প্রাথমিক খরচের তুলনায় ব্যয় বাড়বে ২৩ দশমিক ৫ ভাগ।