এগিয়ে চলছে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা

এক সময় বাংলাদেশ তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে বিশ্বে নিন্দিত হতো। যারা বলত তাদের বিশ্বাস ছিল বাংলাদেশ কখনো উন্নত দেশ হতে পারবে না। সাহায্যের জন্য বিদেশিদের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকবে। তাদের সে ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে, স্বাধীন সার্বভৌম এ দেশটি সামনের দিকে ক্রমাগত এগিয়ে যাচ্ছে। এখন আর বাংলাদেশ সাহায্যের জন্য বিদেশিদের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে না। শেখ হাসিনার প্রজ্ঞা আর পরিশ্রমের কারণে বাংলাদেশ একটি স্বনির্ভর দেশে পরিণত হয়েছে। যারা বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল, তারাই আজ বলছে, বাংলাদেশ এক মিরাকল। আমার মত শত কোটি মানুষ আজ বলতে বাধ্য_ সঠিক পথে এগিয়ে চলছে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শূন্য হাতে যাত্রা শুরু করেছিলেন। সাড়ে ৭ কোটি মানুষের জন্য দেশে খাদ্য ঘাটতি ছিল, আজ দেশে প্রায় ১৬ কোটি মানুষ, খাদ্যের কোনো অভাব নেই। কৃষিবান্ধব সরকারের নীতি ও বিনিয়োগের কারণে আজ বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। শুধু তাই নয়, শ্রীলংকায় ৫০ হাজার মেট্রিক টন চাল রপ্তানির মাধ্যমে প্রথমবারের মতো খাদ্যশস্য রপ্তানিকারক দেশের বনেদি তালিকায় যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ। শাকসবজি ও ফলমূলের সঙ্গে সাম্প্রতিককালে আলু রপ্তানি বাংলাদেশের কৃষির উল্লেখযোগ্য সাফল্য। নেপালের দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ খাদ্য সহায়তা পাঠিয়েছে।
স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের সরকারগুলোর তুলনামূলক বিচারে দেশের সার্বিক উন্নয়ন প্রশ্নে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং কৃষিসহ খেলাধুলা সব জায়গায় শেখ হাসিনা সরকারের উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে বললে মোটেও বাড়িয়ে বলা হবে না। বর্তমান সরকার নতুন সড়ক-মহাসড়ক, সেতু, ফ্লাইওভার নির্মাণ ও রাস্তার লেন বাড়িয়ে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। হাতিরঝিল প্রকল্প, মিরপুর-এয়ারপোর্ট ফ্লাইওভার, বনানী ফ্লাইওভার, কুড়িল ফ্লাইওভার, যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভার প্রভৃতি প্রকল্প সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের চারলেন প্রকল্প শেষের পথে।

জাপান আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থার (জাইকা) সঙ্গে ২২ হাজার কোটি টাকার ‘মেট্রোরেল’ প্রকল্প ২০১৯ সাল নাগাদ বাস্তবায়িত হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলোর আদলে দক্ষিণ এশিয়ার চার দেশ বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানের মধ্যে আঞ্চলিক সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। তিন বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ব্যয়ের মেগা প্রকল্প পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে নিজস্ব অর্থেই। উন্নয়ন হয়েছে রেডিমেট গার্মেন্ট এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে। পিছিয়ে নেই, অভিবাসন ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন সর্বকালের রেকর্ড ভেঙে বেড়েই চলেছে। দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি নেই বললেই চলে। এমনকি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই আছে। আজ একজন রিকশাচালক থেকে শুরু করে একজন খেটেখাওয়া মজুর, এমনকি বাসার কাজের সাহায্যকারী মহিলা থেকে গ্রামের গরিব কৃষক ভোগ করছে তথ্য কিংবা মোবাইল সেবা।

সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করা আর শিক্ষায় নারী-পুরুষের সমতা অর্জনের ক্ষেত্রে রীতিমতো ঘটে গেছে বিপ্লব যা বিশ্বের বহু দেশের কাছে অনুকরণীয়। সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি, বিদ্যালয়ে ভর্তির হার শতভাগ, ছাত্রছাত্রীর সমতা, নারী শিক্ষায় অগ্রগতি, ঝরে পড়ার হার দ্রুত কমে যাওয়াসহ শিক্ষার অধিকাংশ ক্ষেত্রই রোল-মডেল এখন বাংলাদেশ। শিক্ষা ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা সরকারের অর্জনের ধারে-কাছেও নেই অতীতের কোনো সরকার। পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ একটা অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে, বছরের প্রথম দিন ২২ কোটির বেশি বই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিচ্ছে বর্তমান সরকার। ১ ফেব্রুয়ারি এসএসসি এবং ১ এপ্রিল এইচএসসি পরীক্ষা আর ৬০ দিনের মধ্যে পরীক্ষার ফলাফল এখন রুটিন হয়ে গেছে। বেসরকারি সব মেডিকেল কলেজকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন আনার ফলে মেডিকেল শিক্ষার মান নিশ্চিত করা হয়েছে। সরকারি ভাষ্য নয় বরং বিশ্বব্যাংক, ইউনেস্কো, বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামসহ আন্তর্জাতিক দাতা ও গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশের শিক্ষার অগ্রগতিকে অন্যদের জন্য উদাহরণ অভিহিত করে বলছে, শিক্ষায় প্রতিটি পর্যায়ে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে বাংলাদেশ। একদশকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে দেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছে তখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও টেকসই। শিক্ষায় নারী-পুরুষের সমতা অর্জনে বাংলাদেশ ছুঁয়েছে নতুন মাইলফলক। বর্তমান সরকারের আমলে একটি যুগোপযোগী শিক্ষানীতি প্রণীত হয়েছে, যা অত্যন্ত আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক। এ শিক্ষানীতি অতীতের পশ্চাৎপদতা ও বিভ্রান্তি ঝেরে ফেলে যুগের চাহিদা পূরণে সক্ষম। এটি পূর্ণ বাস্তবায়ন হলে দেশ শিক্ষাক্ষেত্রে দ্রুত আরো সাফল্য অর্জন করবে। এ শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে সবাইকে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে। অবশ্যই শিক্ষা ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

শেখ হাসিনার সততা ও নিষ্ঠা দেশকে উন্নতির সোপানে নিয়ে গেছে। এটা আমাদের কথা নয়, বরং জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূমিকার প্রশংসা করে বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নদৃষ্ট সোনার বাংলা বাস্তবায়নে বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী স্টেট সেক্রেটারি নিশা দেশাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের উন্নয়ন-সহযোগী হওয়ায় গর্বিত। হেনরি কিসিঞ্জাররা একদা যেখানে বাংলাদেশের উন্নয়নের কোনো সম্ভাবনাই দেখেননি সেখানে বর্তমানে তাদের উত্তরসূরিরা বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে পেরে নিজেদের ধন্য মনে করছেন। মানছি, এসব বাকচাতুর্য এবং কূটনৈতিক কৌশল। কিন্তু তারপরও অস্বীকার করা যাবে না যে, বাংলাদেশের উন্নয়নের বিপরীতে দাঁড়ালে দিন শেষে উন্নয়ন তো ঠেকানো যাবেই না বরং তাদেরই আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দারিদ্র্যের হার হ্রাস, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস এসব কারণে জাতিসংঘ কর্তৃক বাংলাদেশকে মিলিনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল (এম ডি জি) পদকে ভূষিত করা হয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব বাংলাদেশকে উন্নয়ন রোল মডেল হিসেবে অভিহিত করেছেন। যা বাংলাদেশের জন্য বিরল অর্জন। আর বিগত জোট আমলে বাংলাদেশ পর পর ৫ বার দুর্নীতিতে ১ম হয়েছিল। ২০২১ সালের মধ্যে দেশ মধ্য-আয়ের দেশ হবে বলে শেখ হাসিনা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আমার মনে হয়, তা ২০১৯ সালের মধ্যেই সম্ভব। ডিজিটাল বাংলাদেশ করার পথেও আমরা অনেকদূর এগিয়েছি। ই-ব্যাংকিং আমাদের লেনদেনকে সহজতর করেছে। আমরা এখন অনলাইনে ট্রেন টিকিট কিনতে পারি। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি ফরম নিয়ে দেশের এক মাথা থেকে অন্য মাথায় দৌড়াতে হচ্ছে না। জমির পরচা, আয়কর সনদপত্র, পাসপোর্ট ফরমসহ নানাবিধ সরকারি ফরম অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে।

সমুদ্রসীমা নিয়ে জোট সরকার ছিল নির্লিপ্ত ও নিষ্ক্রিয়। আর মহাজোট সরকারের দূরদর্শী প্রচেষ্টায় আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে মিয়ানমারের কাছ থেকে ১,১১,৬৩১ বর্গ কিমি সমুদ্রসীমা আদায় করেছে। আর ২০১৪ সালে ভারতের কাছ থেকে আরো এক লক্ষের অধিক সমুদ্রসীমা পেয়েছে বাংলাদেশ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে সাম্প্রতিক ছিটমহল বিনিময়ে স্থলসীমান্ত চুক্তির অনুসমর্থনের দলিল বিনিময় করেছে বাংলাদেশ ও ভারত, যার মাধ্যমে দশকের পর দশক অবরুদ্ধ জীবন কাটানো অর্ধলক্ষাধিক মানুষের মুক্তির পথ আনুষ্ঠানিকভাবে খুলল। ছিটমহল বিনিময়ে স্থলসীমান্ত চুক্তির অনুসমর্থনের দলিল বিনিময় হওয়া হাসিনা সরকারের সাফ্যলের মুকুটে আরো একটি নতুন পালক যুক্ত করল। হাসিনা-মোদির মধ্যে সম্পাদিত এই ঐতিহাসিক দলিল বিনিময় সহজেই মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। অবিভক্ত ভারতের অংশ থেকে পাকিস্তান হয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই সমস্যার অবসানে ১৯৭৪ সালে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি হয়। এই চুক্তির ফলে দুই প্রতিবেশী দেশের অসংখ্য ছিটমহলবাসীর দীর্ঘ ৬৬ বছরের দুর্ভোগের অবসান হলো। নিজ বাসভূমে থেকেও যারা পরবাসী ছিল, তারা সত্যিকার স্বাধীনতার স্বাদ পেল। পেল ভোটাধিকার। এখন তারা বলতে পারবে আমার একটি দেশ আছে, পতাকা আছে, জাতীয় সংগীত আছে। সারা পৃথিবীকে তারা বলতে পারবে_ আমি বাংলাদেশি। ছিটমহলবাসীদের এই অবস্থানটা যদি বঙ্গবন্ধু দেখে যেতে পারতেন তাহলে তিনি সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন। যা হোক, আমরা ১৬ কোটি বাংলাদেশি আজ অত্যন্ত আনন্দিত। আমরা ছিটমহলবাসীদের স্বাগত জানাই।

মিয়ানমারে পর ভারতের সঙ্গে জল, স্থলসীমার সমস্যার সমাধান ইতোমধ্যে হয়ে গেছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকর হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফাঁসি হয়েছে। জঙ্গি দমনে সরকারের সাফল্যের প্রশংসা করেছে পশ্চিমা দেশসমূহ, জাতিসংঘ, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। শেখ হাসিনার এখন আর পিছনে ফিরে তাকানোর অবসর নেই। তিনি এখন দেশকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে চলবেন শুধু সামনের দিকে।
পরিশেষে বলতে চাই, শেখ হাসিনা শুধু বঙ্গবন্ধু কন্যাই নন, তিনি বাংলাদেশের উন্নয়নের কান্ডারি, শেখ হাসিনা মানেই উন্নতি। শেখ হাসিনা মানেই শান্তির সুবাতাস। আমার বিশ্বাস একদিন বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবেই।

প্রফেসর মো. শাদাত উল্লা:উপাচার্য, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়