বর্তমান সরকারের কূটনৈতিক সাফল্য

বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের উপস্থিতি ও তৎপরতা দৃশ্যমান করার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ সরকার নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সাফল্য হলো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ৬ ও ৭ জুন বাংলাদেশ সফর। তার আগে ওই দেশের সংসদে স্থলসীমান্ত বিল অনুমোদন হয়েছে। এটিও শেখ হাসিনার কূটনৈতিক সাফল্যের অন্যতম অর্জন। এর ফলে ছিটমহলবাসীর দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান হতে যাচ্ছে। ছিটমহলবাসীরা সম্পৃক্ত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ধারায়। এর ফলে দেশের উন্নয়ন কর্মকা-ের পরিধি ছিটমহল পর্যন্ত সম্প্রসারিত হবে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটে তাই তাদের এলাকার উন্নয়নের কথা বিবেচনায় নিয়ে সরকার ২০০ কোটি টাকার অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রস্তাব দিয়েছে। অন্যদিকে, রপ্তানি দ্রব্য বৈচিত্র্যকরণে তৈরি পোশাক খাতের পাশাপাশি সম্ভাবনাময় অন্যান্য শিল্প ও সেবা খাতে প্রণোদনা প্রদানের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে চীন ও ভারতের শক্তিশালী অবস্থান এবং আমাদের ভৌগোলিক নৈকট্য বিবেচনায় নিয়ে এসব দেশের সঙ্গে আঞ্চলিক যোগাযোগ, রপ্তানি বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রচেষ্টা জোরদার করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের উদ্যোগে বাংলাদেশ, ভুটান, নেপাল এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে একটি প্রকল্প আন্তঃদেশীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রসারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া প্রতিবেশী অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করার লক্ষ্যে সার্ক, বিমসটেক, ডি-৮, ওআইসি, ন্যাম প্রভৃতি ফোরামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন, জাতিসংঘ এবং অন্যান্য ফোরামে কার্যকর অংশগ্রহণ ও গঠনমূলক অবদানের মাধ্যমে দেশকে একটি প্রতিশ্রুতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে সরকার। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে ৫৪টি নদ-নদীর পানি বণ্টন এবং ব্যবস্থাপনার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মোদির সফর আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়কে আরো বেশি করে সামনে এনেছে। তিস্তা চুক্তির বিষয়ে আশান্বিত করে তুলেছে আমাদের।
চার বছর আগে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরে যে ইতিবাচক দিকগুলোর সূচনা ঘটেছিল তারই গতিশীল অগ্রগতি সূচিত হয়েছে ৬ ও ৭ জুন (২০১৫) বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আগমনে। উল্লেখ্য, মে মাসের প্রথম সপ্তাহে ভারতের লোকসভা এবং রাজ্যসভায় সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য যে বিল পাস হয়েছে তাতেই রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দেশবাসী আশাবাদী হয়ে উঠেছিল। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আমলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং আমাদের দেশ সফর করে গেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতামূলক সম্পর্কের সূত্রপাত। ভারতের অকুণ্ঠ সমর্থন ও যুদ্ধের সময় সহযোগিতার ঋণ এদেশের মানুষ কখনও ভুলতে পারবে না। এজন্য মনমোহন সিংয়ের আগমন ঐতিহাসিক সফর হিসেবে গণ্য হয়েছিল। ভারতের মন্ত্রীরাও বলছেন তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক গভীর আবেগ ও আস্থার সম্পর্ক। সে দেশের সঙ্গে অমীমাংসিত বিষয়গুলো মনমোহনের সফরের মধ্য দিয়ে মীমাংসা হয়েছে; আরো হওয়ার অপেক্ষায় আছে। এবারের সফরে চুক্তি না হলেও বলা হচ্ছে সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে পানি বণ্টন চুক্তি হবে। অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে হত্যাকা- ঘটাচ্ছে ভারত_ এ ভাষ্য ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর। তবে আমরা কেউ ফেলানির মতো হতভাগ্য কিশোরীর লাশ কাঁটাতারে ঝুলে থাকার দৃশ্য ভুলতে পারছি না। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সফরে একাধিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছিল। তখন অবকাঠামোগত চুক্তিসহ স্বাক্ষরিত হয়_ ১. নবায়নযোগ্য জ্বালানি চুক্তি ২. ফিশারিজ কো-অপারেশন ৩. বাংলাদেশ টেলিভিশন ও ভারতের দূরদর্শন ৪. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় ৫. সুন্দরবন সংরক্ষণ ও রয়েল বেঙ্গল টাইগার সংরক্ষণ ৬. ভারত ও বাংলাদেশের রেলওয়ে সমঝোতা স্মারক ৭. অনিষ্পন্ন ও অপদখলীয় জমির নিষ্পত্তি, ছিটমহল বিষয়ক সীমানা প্রটোকল স্মারক। এছাড়া চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারে ট্রানজিট চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। বিনিয়োগ সুবিধার জন্য ইতোমধ্যে দেশের মধ্য দিয়ে ভুটানের ট্রাক চলাচলের চুক্তি বহাল রয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতার দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফরের পর থেকে। সেপ্টেম্বরে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর দুই উপদেষ্টার দিলি্ল সফরে অনেক সমস্যার সমাধান হয়েছে।

চার বছর আগের মতো এবারো অনেকগুলো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, উপকূলীয় জাহাজ চলাচল ও দুই রুটে বাস চলাচলের বিষয়ে চারটি চুক্তিসহ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মোট ১৯টি চুক্তি, প্রটোকল ও সমঝোতা স্মারক সই হয়। ৬ চুক্তি ও প্রটোকলের মধ্যে রয়েছে_ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি (নবায়ন), উপকূলীয় জাহাজ চলাচল চুক্তি, অভ্যন্তরীণ নৌ-ট্রানজিট ও বাণিজ্য প্রটোকল (নবায়ন), বাংলাদেশ স্টান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউট (বিএসটিআই) ও ব্যুরো অব ইন্ডিয়ান স্টান্ডার্ডসের (বিআইএস) মধ্যে মান নির্ধারণের ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা চুক্তি এবং কলকাতা-ঢাকা-আগরতলা ও ঢাকা-শিলং-গোয়াহাটি বাস চলাচলে দুটি চুক্তি ও প্রটোকল। ১৩ এমওইউ ও আধা সরকারি এমওইউ হলো_ ভারত-বাংলাদেশের কোস্টগার্ডের মধ্যে সমঝোতা, মানব পাচার প্রতিরোধের বিষয়ে, পাচার ও জাল নোটের বিস্তার প্রতিরোধ, ২০০ কোটি ডলারের ভারতীয় নতুন ঋণচুক্তির বিষয়ে সমঝোতা, বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে বস্নু-ইকোনমি ও সমুদ্রসীমা বিষয়ে সমঝোতা এবং চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার নিয়ে সমঝোতা স্মারকে সই হয়েছে। সমঝোতা চুক্তিগুলোর আরো রয়েছে_ জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সার্কের জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য ভারতীয় সহায়তার (আইইসিসি) অধীনে প্রকল্প, ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন, ২০১৫-১৭ সালের জন্য সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচি, বাংলাদেশ-ভারত শিক্ষা সহযোগিতা বিষয়ে সম্মতিপত্র। এছাড়া আখাউড়ায় ইন্টারনেটের জন্য আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ ইজারার বিষয়ে বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি (বিএসএনএল) ও ভারত সঞ্চার নিগম লিমিটেডের (বিএসসিসিএল) মধ্যে সমঝোতা এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও নয়া দিলি্লর জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে গবেষণার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগ এবং কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ ইন্ডিয়ার মধ্যে আরেকটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। সরকার দেশে ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৪ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ভারতের দুটি কোম্পানির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মাধ্যমে ‘ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তি’ স্বাক্ষর ছিল একটি মাইলস্টোন। ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ সেই চুক্তির বিষয় ছিল শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, পারস্পরিক সহযোগিতা, আঞ্চলিক অখ-তা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শন। ১৯৯৭ সালের ১৮ মার্চ সেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ১৯৯৬ সালে ১২ ডিসেম্বর নয়া দিলি্লতে ত্রিশ বছর মেয়াদি ‘গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। ১ জানুয়ারি ১৯৯৭ থেকে চুক্তিটি কার্যকর হয়। উল্লেখ্য, ১৯৬১ থেকে শুরু হয়ে ১৯৭৪ সালে শেষ হয় ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণকাজ। ১৯৭৫ থেকে বাঁধ চালু হয়। ১৯৭৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ৫ বছর মেয়াদি ‘গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি’ স্বাক্ষর হয়েছিল। ১৯৮২ সালে তার মেয়াদও শেষ হয়। গঙ্গার পানি প্রবাহ ইস্যুটি ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘে উত্থাপন করা হয়। ফারাক্কায় গঙ্গার পানি বণ্টন সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক কল্যাণে। বন্যা ব্যবস্থাপনা, সেচ, নদী অববাহিকার উন্নয়ন ও পানি বিদ্যুৎ উৎপাদনে এই অঞ্চলের পানি সম্পদের সর্বাধিক ব্যবহারে আগ্রহী হয়ে এই চুক্তি সম্পন্ন করা হয়। সুষ্ঠু ও ন্যায়সঙ্গত সমাধান খুঁজে বের করার যে প্রচেষ্টা সেই চুক্তিতে প্রকাশিত হয় তা ভবিষ্যতে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তিতে হবে বলে আমাদের প্রত্যাশা। চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকগুলোর মাধ্যমে কোনো পক্ষের স্বার্থ বা অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে না অথচ সাধারণ মানুষ উপকৃত হচ্ছে; দেশ এগিয়ে চলছে।
ফারাক্কায় বাঁধ দেয়ার ফলে কুষ্টিয়া-যশোরে স্থাপিত দেশের প্রথম সেচ প্রকল্প ‘গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প’ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। ১৯৯৬ সালে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির পরও দেশের অর্থনীতি ও পরিবেশের ক্ষতি মোচন হয়নি। হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচে পদ্মা শুকিয়ে গেছে। গড়াই নদী বিপন্ন হয়েছে। একইভাবে বগুড়া, রংপুর ও দিনাজপুর জেলার ৩৫টি থানা নিয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সেচ প্রকল্প ‘তিস্তা সেচ প্রকল্প’ হুমকির সম্মুখীন হয় ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার গজলডোবায় মহানন্দা নদীতে বাঁধ নির্মাণ করায়। ১৯৮৩ সালের ভারত-বাংলাদেশ তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি অনুসারে ৩৬ ভাগ বাংলাদেশ, ৩৯ ভাগ ভারত ও ২৫ ভাগ সংরক্ষিত হলেও বাংলাদেশের ১৮ লাখ একর জমিতে পানি সেচের ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়ে। কারণ উজানের দেশ হওয়ায় ভারত আগেই বাঁধ ও সেচ-খালের মাধ্যমে পানি সরিয়ে ফেলায় বাংলাদেশে সেচ প্রকল্প শুষ্ক মৌসুমে অকার্যকর হয়ে পড়ে। আবার বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি প্রবাহ ছেড়ে দেয়ায় বাংলাদেশে বন্যা ও নদীভাঙনের সৃষ্টি হয়। মঙ্গাকবলিত উত্তরাঞ্চলে দারিদ্র্য দূর করার একমাত্র উপায় তিস্তার পানিপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধান। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৫৪টি অভিন্ন নদী আছে। এর ভেতর ২৩টি পঞ্চগড় দিয়ে প্রবেশ করেছে। এসব নদীতে বছরের পর বছর পানিপ্রবাহ কমেছে। নদী বাঁচাতে পানি দরকার। পানির ভাগাভাগি নয় দৃষ্টি দিতে হবে অববাহিকাভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনার ওপর। পানিবণ্টন করে সমস্যার সমাধান হবে না। অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা মানে সমুদ্র পর্যন্ত নদীর গতি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা। পশ্চিম ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলো নদীর পানি ভাগাভাগি করে না, করে নদীর অববাহিকাভিত্তিক যৌথ ও সমন্বিত ব্যবহার, উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ। ফলে নদীর অববাহিকার সব দেশের পক্ষে সমভাবে লাভবান হওয়া সম্ভব, পরিবেশ ও নদীর জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা সম্ভব। বহু বছর ধরে তিস্তার পানি পশ্চিমবঙ্গের সেচ কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তুলনামূলকভাবে ভারত সুবিধা পাচ্ছে বেশি। অথচ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি তিস্তা চুক্তিতে সন্তুষ্ট হতে পারছেন না। কারণ পশ্চিমবঙ্গের গজলডোবার পয়েন্টে অবস্থিত পানির ভাগ দিতে চায় না সেখানকার জনগোষ্ঠী। আমরা মনে করি, সেখানকার পানি ভাগাভাগি নয় বরং শুকনো মৌসুমে ভারতের উদারতা ও সহমর্মিতা এবং তিস্তার গতিপথে পানি প্রত্যাহারের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে সামনে আনা দরকার।
এসব ক্ষেত্রে সমঝোতার চাবি ভারতের হাতে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকেই পূর্ব বাংলা ও ভারতের মধ্যে সমস্যার সৃষ্টি হয়। বিশেষত পাকিস্তানি শাসকদের কারণে সেসব সমস্যা দীর্ঘদিন পর্যন্ত বহাল থাকে। মুক্তিযুদ্ধের পরে বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে এবং বর্তমান সরকারের সময় সেসব সমস্যা দূর হয়েছে। অনেকদিন পর সীমান্ত মানচিত্র তৈরি হয়েছে। বর্তমানে ছিটমহল ও অবৈধ দখলিকৃত জমি মুক্ত করা, তিন বিঘা করিডোরে যাতায়াত সমস্যার সমাধান, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মোকাবেলা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এসব ইস্যুতে দীর্ঘ মেয়াদি বন্ধুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে; আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধির জন্য যা খুব প্রয়োজন ছিল। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ ও যাতায়াত বেশি। সেখানকার বাঙালিরা বাংলাদেশিদের আপন মনে করে থাকেন। এদিক থেকে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের বিষয়ে মমতা ব্যানার্জির দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী অনেক বিষয়ে কেন্দ্রকে প্রভাবান্বিত করে আমাদের স্বার্থ সংরক্ষণও করতে পারেন; এটাও বিবেচনায় আনা দরকার। চিকিৎসার জন্য যে বিপুলসংখ্যক রোগী কলকাতায় যান তাদের ভিসামুক্ত অনুপ্রবেশের সুযোগ দেয়ার বিষয়টি মোদি সরকার বিবেচনা করবে বলে আমরা মনে করি। অবশ্য সার্কভুক্ত দেশের জন্য ভিসামুক্ত অনুপ্রবেশের দাবি অনেক দিনের।
নরেন্দ্র মোদির সফর আমাদের আরো একবার মনে করিয়ে দিল প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে তা পারস্পরিক আস্থা ও মর্যাদার ভিত্তিতে হওয়া দরকার।
৭ জুন মোদি ফিরে গেছেন অনেক আশার কথা শুনিয়ে। তিস্তার পানি বণ্টন ও সীমান্ত হত্যাসহ দুই দেশের মধ্যকার সমস্যার সম্মানজনক সমাধান হবে বলে আশা করছি। তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তিতে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ (বাধ্যবাধকতামূলক শর্ত) রাখার দাবি জানিয়েছে কেউ কেউ। তবে দুই দেশের জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হলে যে কোনো চুক্তি ফলপ্রসূ হবে। কেউ কেউ বলছেন চুক্তি করে বাংলাদেশ কখনো লাভবান হয়নি। পানি বণ্টনের ক্ষেত্রে ফারাক্কা ইস্যুতে ভারতের উদারতার অভাব রয়েছে। সেই বাঁধের প্রভাবে বাংলাদেশের ২০টি নদী আজ মৃত। পানিকে ঘিরে টানাপড়েনের অবসান চান সকলে। আমরা মনে করি, ‘ভারত প্রতিবেশীকে ছাড় দেয় না’_ এটা বর্তমান সরকারের আমলে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। দ্বি-পাক্ষীয় ভিত্তিক চুক্তি অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে বলে আমাদের বিশ্বাস। দুপক্ষ লাভবান হবে বিভিন্ন চুক্তিতে। শেখ হাসিনার প্রচেষ্টায় দুই দেশের অনেক দিনের সমস্যাগুলো সমাধান হয়েছে এবং আরো হতে যাচ্ছে। সীমান্ত সংকট মীমাংসা হয়েছে। ভারত সীমান্তজুড়ে বাংলাদেশের ২৮ জেলার মানুষ বাস করে। বাংলাদেশের সঙ্গে রয়েছে চার হাজার কিলোমিটারের সীমানা। আড়াই হাজার কিমি কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা। তবু অবৈধ অনুপ্রবেশ ও চোরাচালানি আছে। এজন্য সীমান্ত নিরাপত্তা করতে চুক্তি হয়েছে; গুলি চালানো বন্ধ হয়েছে। সীমান্তের নিরীহ মানুষ হত্যা বন্ধ হবে এবং পানির ন্যায্য হিস্যা প্রাপ্তি ঘটবে বাংলাদেশ-ভারতের সুসম্পর্কের প্রধান প্রত্যাশা এটাই।
মিল্টন বিশ্বাস: সাহিত্যিক, সহযোগী অধ্যাপক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়