নীল সমুদ্রের অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ

মোহাম্মদ আরজু: সেভ আওয়ার সি’র প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী

বঙ্গোপসাগরে সার্বভৌম সমুদ্র সীমানার বাইরে এক লাখ ছেষট্টি হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল রয়েছে বাংলাদেশের। দেশের মূল ভূভাগের আয়তনের চেয়ে ঢের বেশি। সে তুলনায় সামুদ্রিক সম্পদের ব্যবহার আমাদের দেশে ব্যাপক নয়; টেকসই তো নয়ই। যেমন মৎস্য সম্পদের কথা বলা যাক। ২০১১-১২ সালে মোট সামুদ্রিক মৎস্য উৎপাদন ছিল মাত্র পাঁচ লাখ ৭৮ হাজার টন। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ চাষ করা মাছের উৎপাদন ছিল ১৭ লাখ ২৬ হাজার টন। বিশ্বে চাষ করা মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ পঞ্চম। অথচ নদীমাতৃক বাংলাদেশে, সমুদ্র উপকূলীয় বাংলাদেশে হওয়ার কথা ছিল এর উল্টোটাই। চাষ ছাড়া সাধারণভাবে অভ্যন্তরীণ নদী-জলাশয় থেকে এবং সমুদ্র থেকেই বেশি মাছ পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যথাযথ তথ্য ও পরিকল্পনার অভাবে তা হয়নি। সমুদ্র থেকে যে সামান্য সম্পদ আহরণ করা হচ্ছে, তাও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে দীর্ঘ মেয়াদে সামুদ্রিক পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হচ্ছে।
মনে রাখতে হবে, স্রেফ আহরিত নগদ সম্পদের মূল্য হিসাব করে সমুদ্রের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন খুবই ভুল ও ক্ষতিকর উপায়। বাংলাদেশের মতো উপকূলীয় দেশে তো বটেই, পুরো দুনিয়া যে মানুষের বাসযোগ্য হয়ে উঠল ধীরে, এখনও যে নানা পরিবেশগত বিপর্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য কোনোমতে টিকে আছে, তার প্রধান নিয়ামক হচ্ছে পৃথিবীর এ মহাসমুদ্র। এ কারণে সভ্যতা এগোনোর পাশাপাশি সাগরনির্ভরতাও বাড়ছে। বর্তমানে পৃথিবীর দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ উপকূল থেকে ৪০ মাইলের মধ্যে বসবাস করে। এর চেয়ে দূরেও যারা বাস করে, তারাও সাগরের হাতছানির বাইরে নয়। পুরো পৃথিবীর জীবনদায়িনী শক্তি হচ্ছে এই মহাসাগর। এ জলেই জীবনের শুরু, এ জলই জীবনের সবচেয়ে বড় বসতি। মহাসমুদ্রের এই জলই পৃথিবীর জলহাওয়া বা আবহাওয়া-জলবায়ুর সবচেয়ে বড় নিয়ন্ত্রক। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডসহ মানুষের যে কোনো কর্মকাণ্ড কতটুকু টেকসই হবে তা নির্ভর করছে জলবায়ুর ভারসাম্যের ওপর।
বিশ্বে প্রাণ ধারণের উপযোগী যে পরিমাণ জায়গা আছে, তার ৯৭ শতাংশই এই মহাসাগরে। শুধু বিপুল প্রাণের বসতিই নয়, বৈচিত্র্যেও অনন্য এই জলরাশি। পৃথিবীর এ মহাসাগর বিপুল প্রাণবৈচিত্র্যের আধার। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনাঞ্চল, যেমন মহাবন আমাজনের প্রাণবৈচিত্র্যের সমাহারে দীর্ঘকাল ধরে অভিভূত হয় মানুষ। কিন্তু এমন প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর বনের চেয়ে অনেক বেশি বৈচিত্র্য প্রাণের বসতি এখনও সাগরতলেই। নানা ধরনের প্রাণ, প্রাণী ও উদ্ভিদের এত অপরূপ জগৎ! অথচ প্রায় পুরোটাই অচেনা। ওয়ার্ল্ড রেজিস্টার ফর মেরিন স্পেসিসের মতে, সাগরের প্রাণবৈচিত্র্যের তিন-চতুর্থাংশেরও সম্পর্কে মানুষের তেমন জানাশোনা নেই।
অন্যদিকে স্থলভাগে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর জীববৈচিত্র্য কেমন হবে তা-ও নির্ভর করে এই বিপুল জলরাশির ওপর। পৃথিবীর এই মহাসমুদ্র প্রকৃত অর্থে অখণ্ড এক জলরাশিই। তবু এর রয়েছে নানা স্থানীয় ডাকনাম। বাংলাদেশের যেমন বঙ্গোপসাগর। বিশ্বের বৃহত্তম উপসাগর এই বঙ্গোপসাগর। ২১ লাখ ৭২ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তন এর। বাংলাদেশের মানুষের জীবনমান কেমন হবে, অন্যান্য প্রাণী ও উদ্ভিদ কেমন থাকবে, তা অনেকাংশেই বঙ্গোপসাগরের ওপর নির্ভর করে। কারণ, দেশে বৃষ্টির পরিমাণ ও ধরন, আবহাওয়া, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাফল্য অনেকাংশেই সাগরনির্ভর। বৃষ্টিপাতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষি, বন ও পরিবেশের সমৃদ্ধি ও সুস্বাস্থ্য।
দুঃখের বিষয় হচ্ছে, বিশ্বজুড়েই সাগর ক্রমশ অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। বঙ্গোপসাগরও এর ব্যতিক্রম নয়। বৈশ্বিক উষ্ণায়নসহ মানুষেরই সৃষ্ট নানা কারণে সাগরের দীর্ঘকালের পরিবেশ ও বাস্তুসংস্থান নষ্ট হচ্ছে। ধীরে ধীরে পাল্টে যাচ্ছে সাগরের আচরণ। বিশেষত বঙ্গোপসাগরে পরিকল্পনাহীনভাবে যথেচ্ছ মাছ শিকার, জলবায়ু পরিবর্তন, শিকারি প্রজাতিগুলোকে নির্বিচার নিধন, সামুদ্রিক প্রাণী ও উদ্ভিদের বসতি নষ্ট এবং সার্বিক দূষণের খারাপ প্রতিক্রিয়া ঘটতে শুরু করেছে। এসবের শুরুর কারণটি দরকারি তথ্যের ও জানাশোনার অভাব। কাজেই তার থেকে জন্ম নেয় অসচেতনতা ও সুরক্ষাহীন পরিস্থিতি।
এ ব্যাপারে আরও আনুষ্ঠানিক, নিবিড় গবেষণা ও জরিপ দরকার। এর মাধ্যমে সাগরে নানা বৈশিষ্ট্যের জলজ বসতির সীমারেখা শনাক্ত করে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বেশ কিছু সুরক্ষিত জলাঞ্চল প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে সামুদ্রিক পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্যের ভারসাম্য বজায় থাকে। সে ক্ষেত্রে একই সঙ্গে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের টেকসই আহরণ সম্ভব হবে, যা বর্তমানের চাষ করা মাছ ও অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ের মাছের চেয়ে পরিমাণে কয়েক গুণ ছাড়িয়ে যেতে পারে। সাগরে বেশ কিছু সুরক্ষিত জলাঞ্চল কার্যকর হলে সামুদ্রিক পরিবেশ বিপর্যয়ের বড় পাঁচটি কারণ_ দূষণ, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, জলজ প্রাণীর বসতি নষ্ট করা, নির্বিচার মাছ ধরা ও শিকারি প্রজাতি নিধন বন্ধ হওয়ার পথ সুগম হবে।
এই পথে আমাদের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থাপনার প্রতি সরকারি ও বেসরকারি ঝোঁক। সরকারি সংস্থাগুলোর সরাসরি কর্তৃত্বে কিংবা বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে কেন্দ্রীভূত সুরক্ষা ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে অভিজ্ঞতা হচ্ছে ; এসব আমাদের ভালো ফল দেয়নি। প্রতিবেশগত সম্পদ ও সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে কর্তৃত্ব ও ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ায় তারা একদিকে জীবিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, অন্যদিকে তাদের প্রতিবেশগত জ্ঞান ও পরিবেশবান্ধব জীবন চর্চার সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছে প্রকৃতি। বিপরীতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অন্তর্নিহিত কাঠামোগত দুর্বলতা এবং অনেক ক্ষেত্রে অসাধুতার সুযোগে অস্থানীয়-একচেটিয়া বাণিজ্যের কবলে পড়েছে প্রতিবেশ। এখন যখন সামুদ্রিক পরিবেশ ও অর্থনীতির প্রতি রাষ্ট্রীয় নজর এসেছে অনেক দেরিতে হলেও; ওই একই ভুল এ ক্ষেত্রে করা ঠিক হবে না। ৭১০ কিলোমিটার লম্বা উপকূল রেখাজুড়ে বসবাসরত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বেই সামুদ্রিক প্রাণসম্পদ ব্যবস্থাপনার পরিকাঠামো ও অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।