বিদ্যুৎ খাতের চ্যালেঞ্জে সফল সরকার : রেকর্ড ৭ হাজার ৫৭১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন

বিশেষজ্ঞদের অভিমত : বাংলাদেশের সমমানের কোনো দেশ এত অল্প সময়ে বিদ্যুৎ খাতে এমন অর্জন দেখাতে পারেনি

টিটু সাহা : দেশে ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে প্রশংসনীয় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে বর্তমান সরকার। এই খাতে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ সাফল্যের সঙ্গে মোকাবেলা করে গত সাড়ে ছয় বছরে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়িয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। এ সরকারের দুই আমলে ৬৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে এসেছে। চুক্তি হয়েছে ৭৭টি কেন্দ্রের। গত ১৫ এপ্রিল দেশে সর্বোচ্চ ৭ হাজার ৫৭১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের রেকর্ড সৃষ্টি করেছে সরকার। প্রতিশ্রæতি মতো ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করেছে। দ্রুত ত্রিপুরা থেকে আরো ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির প্রক্রিয়া চলছে। রাশিয়ার সহযোগিতায় রূপপুরে পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়াও এগিয়ে চলেছে। সরকারের দাবি, বাংলাদেশে এ পর্যন্ত যতগুলো সরকার এসেছে তার মধ্যে তারাই বিদ্যুৎ খাতে সবচেয়ে বেশি সফল। বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, জ্বালানি খাতে কিছুটা কম সাফল্য থাকলেও বাংলাদেশের সমমানের কোনো দেশ এত অল্প সময়ে বিদ্যুৎ খাতে এমন অর্জন দেখাতে পারেনি।

তবে সমালোচকরা বলছেন, গত সরকারের শুরুতে বিদ্যুৎ খাতে রেন্টাল-কুইক রেন্টাল, সম্প্রতি সুন্দরবনের কাছে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে বিতর্ক এবং গত বছরের নভেম্বরে জাতীয় সঞ্চালন লাইনে ত্রুটির কারণে এ সরকারের সাফল্য কিছুটা ¤øান হয়েছে। আবাসিক গ্যাস সংযোগে দুর্নীতি ও অনিয়ম, সারা দেশে স্বল্পমূল্যে এলপিজি গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে অনগ্রগতি এবং দেশের চারটি খনি থেকে কয়লা উত্তোলন নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে না পারায় জ্বালানি খাতে সরকার আশানুরূপ ফলাফল অর্জন করতে পারেনি। তবে জ্বালানি খাতে সমুদ্রসীমা নিয়ে মায়ানমার ও ভারতের সঙ্গে বিরোধ মীমাংসা করে নতুন জ্বালানি প্রাপ্তির সুযোগ সৃষ্টি করেছে সরকার। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকলেও গ্যাসের উৎপাদন বাড়িয়েছে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এটাও ভালো।

সরকারি পক্ষ বলছে, দুয়েকটি ক্ষেত্রে সামান্য বিফলতা থাকলেও তা সরকারের সাফল্যকে ¤øান করতে পারেনি।

এদিকে সরকারি পরিসংখ্যান মতে, গত ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে মহাজোট সরকার দায়িত্বভার নেয়ার সময় দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছিল ৩ হাজার ২৬৮ মেগাওয়াট। অন্যদিকে গত ১৫ এপ্রিল দেশে সর্বোচ্চ ৭ হাজার ৫৭১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে। শতকরা হিসাবে গত কয়েক বছরে দেশে বিদ্যুতের উৎপাদন বেড়েছে ১০০ ভাগেরও অনেক বেশি। শেখ হাসিনার সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর গত দুই দফায় এ পর্যন্ত ৬৮টি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হয়েছে। অপেক্ষায় আছে আরো কয়েকটি কেন্দ্র।

এদিকে বিদ্যুৎ বিভাগের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সরকারের বর্তমান মেয়াদে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি ৭৭টি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। নতুন সংযোগ দেয়া হয়েছে ৪০ লাখের মতো। আরো অনেক সংযোগ দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। আগের সরকারের সময়ে বিদ্যুতায়নের আওতায় ছিল ৪৭ ভাগ মানুষ যা বর্তমানে ৬০ শতাংশ পার করেছে। মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ ২২০ কিলোওয়াট পার আওয়ার থেকে বেড়ে প্রায় ৩০০ কিলোওয়াট পার আওয়ারে উন্নীত হয়েছে। এসব অর্জন সত্ত্বেও রেন্টাল-কুইক রেন্টাল বিতর্ক, এসব কেন্দ্রের মেয়াদ বাড়ানো, গ্রিড লাইন বিতরণ লাইনের ত্রুটি এবং কয়েক দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়ার কারণে এ নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে অনেক।

তবে সরকারের বক্তব্য- বিদ্যুৎহীন থাকার চেয়ে কিছুটা বেশি দামে বিদ্যুৎ পাওয়াটা বেশি ভালো। বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াতে সরকারকে অনেক কিছুই করতে হয়েছে। অনেকেই অনেক কথা বললেও কাজ হয়েছে। বিদ্যুৎহীন অবস্থায় দেশের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ত। বিভিন্ন গবেষণার বরাত দিয়ে বিশেষজ্ঞরাও বলেন, কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা না হলে জিডিপির অর্জন দশমিক ৮ ভাগ কম হতো।

সমালোচনা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ ও জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন, যারা কাজ করেনি তাদের কোনো সমালোচনা হয় না। যারা কাজ করে তাদের সফলতাও থাকে, ব্যর্থতাও হয়তো থাকতে পারে। বর্তমান সরকারকে নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে এর অর্থ তারা কাজ করেছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্র জানায়, বর্তমান সরকারের সময় ৬৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে এসেছে। এর মধ্যে ২০০৯ সালে ১২টি, ২০১০-এ মাঝারি আকারের ১০টি, ২০১১ সালে ২২টি, ২০১২ সালে আটটি কেন্দ্র উৎপাদনে এসেছে। এর পরের বছরগুলোতে আরো বেশ কয়েকটি কেন্দ্র উৎপাদনে এসেছে। এ বছরে আশুগঞ্জ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (এপিসিএল)-এর দুটি কেন্দ্র উৎপাদনে এসেছে। সবমিলিয়ে এগিয়ে চলছে কাজ। সরকারের মহাপরিকল্পনা অনুসারে ২০৩০ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাবে।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র আরো জানায়, গ্যাসভিত্তিক বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি এখন কয়লায় বড় প্রকল্প নির্মাণের দিকে ঝুঁকছে সরকার। কয়লাভিত্তিক তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে এমওইউ হয়েছে এর মধ্যেই। এসব চুক্তি হয়েছে ভারত, চীন, কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরের সঙ্গে।

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ এ প্রসঙ্গে বলেন, আমরা লক্ষ্য অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পেরেছি। বিদ্যুৎ খাতে বহু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। এখন সরকার বড় প্রকল্পের দিকে বিশেষ নজর দিচ্ছে।

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বড় বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে বর্তমানে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে জ্বালানি। দেশের বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো এখন গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু দেশে সে অনুযায়ী গ্যাসসম্পদ নেই। আবার সরকার দেশীয় কয়লাখনি থেকে এখনি কয়লা না উত্তোলনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে আমদানি করা কয়লার ওপর নির্ভর করেই ভবিষ্যতে বড় বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো এগোচ্ছে। তবে আমদানি করা কয়লা দিয়ে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে কনজ্যুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) বিদ্যুৎ ও জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক শামছুল আলম বলেন, বিদেশ থেকে তেল, গ্যাস, কয়লা আমদানি করলে তার দাম অনেক বেশি পড়বে। এতে আমাদের অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা অর্জনের পরই প্রকল্প হাতে নেয়া উচিত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ এবং গ্যাস উৎপাদন বাড়লেও ভবিষ্যৎ জ্বালানি চাহিদা নিয়ে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে সংকটের সমাধান করতে সরকার সেভাবে কাজ করছে না। দেশের কয়লাখনি থেকে কয়লা উত্তোলনে সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যাপারেও সরকারের তেমন সফলতা নেই। বিদেশ থেকে বিদ্যুৎ ক্রয় করলেও তা খুবই সামান্য। এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের ব্যাপারেও সরকার প্রত্যাশামতো এগোতে পারেনি। তাই এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে পারে।