মেট্রোরেল চালু ২০১৯ সালে

রাজধানীর যানজট নিরসনে মাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) বা মেট্রো রেল পরীক্ষমূলকভাবে ২০১৯ সাল থেকে চালু করা হবে। প্রাথমিকভাবে রাজধানীর উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত অংশটি চালু করা হবে। এর পরের বছরই মতিঝিল পর্যন্ত পুরো অংশেই মেট্রোরেল চলাচল শুরু করা হবে। এরই মধ্যে প্রকল্পের তিনটি অংশের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। বাকি ৫টি অংশের দরপত্র চলতি বছরের মধ্যেই আহ্বান করা হবে। তবে এই প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নে প্রকল্প এলাকায় অবস্থিত ভূ-গর্ভস্থ পরিষেবা সংযোগ লাইন স্থানান্তর এবং নির্মাণকালীন সময়ে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এ রুটটিতে ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট বিষয়টি মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। গতকাল রাজধানীর প্রবাসী কল্যাণ ভবনে প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয়ে এক মতবিনিময় সভায় এই তথ্য তুলে ধরা হয়।’মিডিয়া পার্টনারশীল মিট’ শীর্ষক এই মতবিনিময় সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মেট্রোরেল প্রকল্পের পরিচালক মো. মোফাজ্জেল হোসেন। এ সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মেট্রোরেল প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক মো. মাহ্বুবুল আলম, যুগ্ম-সচিব মোহাম্মদ নুরুল আমিন ও মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদ, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিপ্পন কোয়াই অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের টিম লিডার হিদো ওমোরি, সেফ গার্ড এঙ্পার্ট নুরুল আমিন, লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্স ম্যানেজার খান মো. মিজানুর রহমান, ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার এবিএম আরিফুর রহমান প্রমুখ।সভায় প্রকল্পের পরিচালক মো. মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, ২০১৯ সালে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত অংশটি চালু করা হবে। পরের বছর থেকেই মতিঝিল পর্যন্ত পুরো অংশেই মেট্রোরেল চলাচল শুরু করবে। এরই মধ্যে প্রকল্পের তিনটি অংশের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। বাকি ৫টি অংশের দরপত্র চলতি বছরের মধ্যেই আহ্বান করা হবে।এ সময় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাজধানীতে অবকাঠামো বিষয়ক যে কোন প্রকল্প বাস্তবায়নেই বড় চ্যালেঞ্জ পরিষেবা সংযোগ লাইন স্থানান্তর। মেট্রোরেলের উত্তরা থেকে পল্লবী অংশটি অনেকটাই গ্রিন ফিল্ড। ওই অংশে কোন ধরনের ভূ-গর্ভস্থ পরিসেবা সংযোগ লাইন নেই। তাই ওই অংশটির কাজ দ্রুত শুরু করা যাবে। তবে অন্যান্য অংশে ১৩ ধরনের পরিষেবা সংযোগ লাইন রয়েছে। এগুলো চিহ্নিত ও দ্রুত স্থানান্তরে চেষ্টা করা হচ্ছে। এখন পল্লবী থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত অংশটির পরিসেবা সংযোগ লাইন চিহ্নিত করা হচ্ছে। এরই মধ্যে মিরপুর-১০ থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ৩২ হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন চিহ্নিত করা হয়েছে। এটি স্থানান্তরে আলোচনা শুরু করা হয়েছে।ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে মো. মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, প্রকল্পের কাজ করতে গিয়ে কোনো সড়কের লেন বন্ধ করা হবে না। যেখানে চার লেনের সড়ক আছে সেখানে তাই থাকবে, যেখানে তিন লেনের আছে সেটাও অপরিবর্তিতই থাকবে। তবে লেনের দৈর্ঘ্য কিছুটা কমানো হবে। এজন্য সড়কের মাঝে মিডিয়ান ও ফুটপাত সমন্বয় করা হবে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার আরেকটি অংশ হবে যানবাহন ডাইভারশন। এক্ষেত্রে পল্লবী থেকে বিজয়স্মরণী পর্যন্ত বিকল্প সড়ক খোঁজা হচ্ছে। এছাড়া ২০১৭ সালের আগেই মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার নির্মাণ সম্পন্ন হয়ে যাবে। তখন বিজয় স্মরণী থেকে ওই সড়কে কিছু যানবাহন ডাইভার্ট করা যাবে। এতে প্রকল্প এলাকায় চাপ কিছুটা কমবে।প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ৮ ধরনের সমীক্ষা করা হচ্ছে উল্লেখ করে প্রকল্প পরিচালক বলেন, প্রতিটি প্রকল্পেই কিছু না কিছু সমস্যা হয়। এজন্য বিভিন্ন ধরনের সমীক্ষা করা হচ্ছে, যাতে ক্ষতি বা সমস্যা সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা যায়। তবে কিছু না কিছু সমস্যা তো হবেই। মেট্রোরেলের জন্য এটুকু সমস্যা সহ্য করার আহ্বান জানান তিনি।মেট্রোতে যাত্রী ভাড়া কেমন হবে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক বলেন, মেট্রোরেল আইনে বলা আছে ভাড়া নির্ধারণ করতে সরকার কমিটি গঠন করবে। তারা বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে ভাড়া নির্ধারণ করবে। তবে প্রকল্পটি ভর্তুকি নির্ভর না লাভজনক হবে তা নির্ভর করছে সরকারের ইচ্ছার ওপর।সূত্র জানায়, প্রকল্পটির মোট ব্যয় প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা; যার মধ্যে ১৬ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা দেবে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। বাকি ৫ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা সরকারের তহবিল থেকে সরবরাহ করা হবে। পিক সময়ে প্রতি ঘণ্টায় ২০২১ সালে মেট্রোতে ২২ হাজার ৫৩০, ২০২৬-এ ২৫ হাজার ৫৬০ ও ২০৫১ সালে ৬১ হাজার যাত্রী পরিবহন করবে। এ হিসেবে ২০২১ সালে মেট্রোরেলে দৈনিক যাত্রী পরিবহন করা হবে ৪ লাখ ৮৩ হাজার। ২০২৬ সালে যাত্রী সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ৫ লাখ ৮৩ হাজার ও ২০৫১ সালে ১ লাখ ৩০ কোটি। মেট্রোরেল প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়া ৮ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ চালিত ২৪ সেট বিশেষ ট্রেন (ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট) কেনায় প্রাকযোগ্যতা যাচাই দরপত্র আহ্বান করা হয় গত জানুয়ারিতে। এতে ৮টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। এছাড়া বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার জন্য গত মার্চে প্রাকযোগ্যতা দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। আর ডিপোর মাটির উন্নয়নে দরপত্র আহ্বান করা হয় গত মাসে। এর বাইরে ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রোরেলের উড়ালপথ নির্মাণে চারটি দরপত্র আহ্বান করা হবে। এর মধ্যে ভায়াডাক্ট ও ১৬টি স্টেশন থাকবে। মূলত প্রতি ৫ কিলোমিটারের জন্য একটি করে দরপত্র আহ্বান করা হবে। ওয়ার্কশপসহ ডিপোর অবকাঠামো নির্মাণে আরেকটি দরপত্র আহ্বান করা হবে। প্রাথমিকভাবে এই প্রকল্পে জন্য সয়েল টেস্টের (মাটির ভূ-তাত্তি্বক জরিপ) কাজ চলছে। এর উপর ভিত্তিতে চূড়ান্ত করা হবে বিস্তারিত নকশা। এর পর জমি অধিগ্রহণ শেষে উড়ালপথ (ভায়াডাক্ট) নির্মিত হবে। উড়ালপথের ওপর থাকবে রেললাইন।জানা গেছে, রাজধানীতে প্রথম মেট্রোরেল চালু করার জন্য উত্তরা তৃতীয় পর্ব থেকে মতিঝিলের বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত ২০ দশমিক ১ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করা হবে। এর পুরোটাই হবে উড়ালপথে। তাই প্রথমেই উড়ালপথ নির্মাণ করতে হবে। এজন্য শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে চলছে মাটির নমুনা সংগ্রহ। উত্তরা থেকে মিরপুর, ফার্মগেট হয়ে বাংলামটর পর্যন্ত প্রায় অর্ধেক পথের মাটির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। অবশিষ্ট পথের কাজ এখনো শুরু হয়নি। প্রতি স্থানের মাটির নমুনা পরিক্ষার জন্য পাঠানো হচ্ছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট)। সয়েল টেস্টের প্রতিবেদন পেতে সময় লাগবে ছয়-আট মাস। মাটির গঠন অনুযায়ী বিস্তারিত নকশা প্রণয়ন করা হবে। সে অনুযায়ী জমি অধিগ্রহণ করা হবে বলে প্রকল্প সূত্র জানায়।