বীজের খামার নদীর চরে

বীজ বর্ধন খামার প্রকল্পের পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, খামারে ধানসহ বিভিন্ন ফসলের বীজ উত্পাদনে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে। এখানে উত্পাদিত দুর্যোগ সহিষ্ণু ও মানসম্মত বীজ এই অঞ্চলে ফসল উত্পাদন বৃদ্ধি এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশেষ অবদান রাখবে।বীজের খামার নদীর চরে

চারপাশে তেঁতুলিয়া নদী। এর মাঝেই মাঠ জুড়ে ধান ও অন্যান্য ফসলের ছড়াছড়ি। ১৭ কিলোমিটার বাঁধ দিয়ে সীমানা চিহ্নিত মাঠে ফসলের পরিচর্যায় প্রতিদিন কাজ করছে অন্তত দেড়শ কৃষি শ্রমিক। এক হাজার একরের বেশি এলাকা জুড়ে কেউ নিড়ানি, কেউ সেচ, আবার কেউ বা মাড়াইকাজে ব্যস্ত। আর কৃষি শ্রমিকদের তদারকিতে ব্যস্ত ৭০ কর্মকর্তা-কর্মচারী। এছাড়া নদীপাড় ভেঙে যাওয়া থেকে রক্ষার জন্য কাজ করছে নৌবাহিনীর একটি টিম। এ চিত্র পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার তেঁতুলিয়া নদীর বুকে চরবাঁশবাড়িয়া বীজ বর্ধন খামারের।

কৃষি বিভাগ বলছে, এটিই দেশের একক বৃহত্তম বীজ বর্ধন খামার। যেখানে উত্পাদন করা বীজ পৌঁছে দেয়া হবে পুরো দক্ষিণাঞ্চলে। ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের অনেক অনাবাদী জমি চাষাবাদের আওতায় আসবে। এক ফসলি জমি দুই বা তিন ফসলি জমিতে পরিণত হবে। বরিশাল-পটুয়াখালী অঞ্চল পুনরায় দেশের ‘শস্য ভাণ্ডার’ হিসেবে হারানো গৌরব ফিরে পাবে।

২০১৩ সালের ১৯ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই বীজবর্ধন খামার প্রকল্প উদ্বোধন করেন। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) প্রায় আড়াইশ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে। খামারের এলাকা ১ হাজার ৪৪ একর।

এই খামার থেকে বছরে সাড়ে ১১ হাজার টন বিভিন্ন ফসলের বীজ উত্পাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণ করা হবে। এই বীজ দিয়ে ৪২ হাজার ২০০ একর জমিতে চাষ করা যাবে। এ থেকে ৯০ লাখ টনেরও বেশি ফসল উত্পাদন হবে।

খামারটির মাধ্যমে স্থানীয় জাতের ধান যেমন বালাম, কাজলশাইল, সাদামোটা, লালমোটা ইত্যাদিকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ধান, গম, ভুট্টা, আলু, ডাল ও তেল জাতীয় ফসলের মৌল বীজ থেকে ভিত্তি বীজ উত্পাদন করা হয়েছে।

যা থাকছে এ প্রকল্পে :প্রকল্পের কাজ শেষ হলে এখানে থাকবে তিনটি পুকুর, লেবার শেড ও গার্ড/আনসার ক্যাম্প, ১৫শ বর্গমিটারের কভার্ড থ্রেসিং ফ্লোর, ৯০০ বর্গমিটারের গোশালা, দুই হাজার ৪০০ বর্গমিটারের সানিং ফ্লোর, কর্মকর্তাদের জন্য দুই হাজার বর্গমিটারের ডরমিটরি, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, কর্মচারীদের জন্য ডরমিটরি, সেচ সুবিধার জন্য ৯ কিলোমিটার ও ৬ কিলোমিটারের দুটি নালা, দেড় লাখ লিটার ধারণ ক্ষমতার ৩টি ওভারহেড ট্যাংক। খামারের পাশাপাশি এ প্রকল্পে দুই হাজার মেট্রিক টন ধারণ ক্ষমতার একটি বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র থাকবে। খামারের অধীনে বরিশালে এক হাজার মেট্রিক টন ধারণ ক্ষমতার আর্দ্রতা নিরোধক বীজ সংরক্ষণাগার, ২ হাজার মোট্রক টন ধারণ ক্ষমতার একটি আলু বীজ হিমাগার তৈরি করা হবে। খামারের ভেতরে বিদ্যুত্ ও জৈব সারের জন্য একটি বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট, একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন স্থাপনা থাকবে।

কৃষি বিভাগ বলছে, এক সময় বরিশাল ‘খাদ্য শস্যের গুদাম’ হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু বন্যা, খরা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা ইত্যাদি প্রাকৃতিক কারণে মাটির গুণাগুণ ক্রমে হ্রাস পাচ্ছে এবং এ অঞ্চল অনুত্পাদনশীল হয়ে পড়ছে। এ থেকে রক্ষার জন্যই পটুয়াখালীর এই খামার।

খামার এলাকার মধ্যে স্কুল, মসজিদ, স্বাস্থ্য কেন্দ্রসহ কমিউনিটি সেন্টার, শিশুপার্ক ও খেলার মাঠ নির্মাণের কথা থাকলেও পরে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে বিএডিসি।

দশমিনা বীজ বর্ধন খামার প্রকল্পের পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, খামারে ধানসহ বিভিন্ন ফসলের বীজ উত্পাদনে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে। এখানে উত্পাদিত দুর্যোগ সহিষ্ণু ও মানসম্মত বীজ এই অঞ্চলে ফসল উত্পাদন বৃদ্ধি এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশেষ অবদান রাখবে। তিনি বলেন, দক্ষিণাঞ্চলে কৃষকরা বোরো আবাদের সাহস পেতেন না। এই খামারের আবাদ দেখে তারা উদ্বুদ্ধ হয়েছেন।

খামারের এ যাবত্ উত্পাদন

২০১২-১৩ সালে খামারের মোট জমির মধ্যে ১৯৩ একর জমি আবাদের মাধ্যমে ফেলন, মুগ (বারি-৫ ও বারি-৬), তিল (বারি-৩ ও বিনা-২) ও সয়াবিনের ১৮ টন বীজ উত্পাদন হয়েছে। ২০১৩-১৪ সালে আমনের বিভিন্ন জাত ৩৮২ একরে আবাদ করে ২ লাখ ৮০ হাজার কেজি বীজ পাওয়া গেছে। এছাড়া ১২ একর জমিতে চাষ করে ২৯ হাজার ২৫ কোজি বোরো, ২ একরে চাষ করে ১৪শ কেজি গম,  ১৪০ একর জমিতে আবাদ করে ৯ হাজার ২৯৫ কেজি মসুর, ৬৮ একরে আবাদ করে ১৬ হাজার ২৮০ কেজি খেসারি, ৪০ একরে আবাদ করে ৭ হাজার ৫শ কেজি সূর্যমুখীর বীজ পাওয়া গেছে। এই মৌসুমে মোট ৩২৮ একরে আবাদ করে ৩৩ হাজার ১৭৫ কেজি ডাল ফসলসহ মোট ৩৮০ টন বীজ উত্পাদিত হয়েছে বীজ বর্ধন খামারে। দুই বছরে মোট বীজ উত্পাদিত হয়েছে প্রায় ৪শ টন।

বিএডিসির সহকারী পরিচালক আসিফ বলেন, এই দুই বছরে বীজ বর্ধন খামারে যে বীজ উত্পাদিত হয়েছে তা বিএডিসির সংরক্ষণাগারে পৌঁছানোর পর কৃষকদের কাছে বিক্রি করা হয়েছে। বিএডিসির এই কর্মকর্তা জানান, খামারে উত্পাদিত বীজের মান খুবই ভালো। সব বীজ বিক্রি হয়েছে। কৃষকদের আরো বীজের চাহিদা রয়েছে।

২০১৪-১৫ সালে ৫০০ একর জমিতে ব্রিধান ৫২, বিনা ৭ ব্রিধান ৫১, বিআর ২৩ আবাদ করা হয়েছে। উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৩০ টন। চলতি রবি মৌসুমে ব্রিধান ২৮, বারি গম-২৫, বারি ছোলা ২৬, বারি ছোলা ৫, বারি মসুর ৩, বিনা মসুর ৫, খেসারি, আলু, সূর্যমুখী, চিনা, সরগম, কাউন ৩৫৫ একর জমিতে আবাদ করা হয়েছে। উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৪০ টন। সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে।