পাঁচ বছরে গার্মেন্টসে রফতানি বেড়েছে দ্বিগুণ ॥ নতুন রেকর্ড

পাঁচ বছরে গার্মেন্টসে রফতানি বেড়েছে দ্বিগুণ ॥ নতুন রেকর্ড

০ সরকারের শিল্পবান্ধব নীতির ফলে সাফল্য
০ শ্রমিকের বেতন বাড়ছে, নতুন কর্মসংস্থান পাঁচ লাখ
০ ’০৮-০৯ অর্থবছরে রফতানি ১২ বিলিয়ন থেকে এ বছর শেষে ২১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে
০ স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক সরকার চায় ক্রেতারা

এম শাহজাহান ॥ পাঁচ বছরে পোশাক শিল্পে নতুন রেকর্ড অর্জন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। নানামুখী চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও এই সময়ে পোশাক রফতানি বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করায় শ্রমিকদের বেতন তিনগুণ হওয়ার পথে। এ ছাড়া কারখানা বাড়ার পাশাপাশি এ শিল্পে নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে আরও ৫ লাখ অর্ধশিক্ষিত এবং অশিক্ষিত শ্রমিকের। ওই সময়ে বেড়েছে দেশের মোট রফতানিও। পণ্য রফতানিতে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুততার সঙ্গে। বিশ্ব বাণিজ্যে বাংলাদেশের শক্ত অবস্থান সৃষ্টিতে সক্ষম হয়েছে। শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, দেশে গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা বহাল থাকায় এটা সম্ভব হয়েছে। সরকার শিল্পবান্ধব নীতি গ্রহণের ফলে এই সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ। এ জন্য স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থার কথাও তাঁরা বলছেন।
সূত্রমতে, গত ২০০৯ সালে মহাজোট সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরই দেশের রফতানি খাতে উজ্জ্বল সম্ভাবনা তৈরি হয়। নতুন বাজার সৃষ্টির পাশাপাশি বাড়তে থাকে পোশাক রফতানি। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও বিজিএমইএর তথ্যমতে, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে প্রায় সাড়ে ১২ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি হয়। এটা বাড়তে বাড়তে সর্বশেষ ২০১২-১৩ অর্থবছরে প্রায় সাড়ে ২১ বিলিয়ন ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই পোশাক রফতানি ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। তাই বছর শেষে রফতানি আরও যে বাড়বে এমনটাই আশা করছেন এ শিল্পের উদ্যোক্তারা।
এ ছাড়া এই সময় পোশাক শিল্পে শ্রমিকদের সর্বনিম্ন বেতন ছিল ১,৬৬২ টাকা। তবে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার এক বছরের মাথায় তা ৩,০০০ টাকা করা হয়। এ ছাড়া শ্রমিকদের জীবন মান উন্নয়নে নতুন মজুরি বোর্ড অনুযায়ী বেতন ধার্যের লক্ষ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। ওই বোর্ড নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণে কাজ করছে। ধারণা করা হচ্ছে, নতুন মজুরি বোর্ড অনুযায়ী একজন পোশাক শ্রমিকের সর্বনিম্ন বেতন হবে ৫ হাজার টাকা। যদিও শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর জন্য বিদেশী ক্রেতাদের চাপ রয়েছে। এ ছাড়া বর্তমান সরকারের সাড়ে চার বছরে নতুন কারখানার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ৬৭৫টি। বিজিএমইএর তথ্যমতে, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশে পোশাক কারখানা ছিল ৪৯২৫টি, তবে ২০১২-১৩ পর্যন্ত তা ৫৬০০টিতে দাঁড়িয়েছে। চলতি অর্থবছর শেষে নতুন কারখানার সংখ্যা হাজারটি ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করছে বিজিএমইএ। কারণ, সরকার গার্মেন্টস পল্লীর উদ্যোগ নেয়ায় নতুন বিনিয়োগ বাড়ছে পোশাক খাতে।
এদিকে শুধু পোশাকই নয়, গত পাঁচ বছরে দেশের মোট রফতানিও বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতে সাড়ে ১৫ বিলিয়ন ডলার রফতানি হতো। বর্তমান তা ২৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। গত ২০১২-১৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ ২,৭০২ কোটি ডলারের বিভিন্ন পণ্য বিদেশে রফতানি হয়েছে, তার মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ এসেছে প্রধান রফতানি পণ্য তৈরি পোশাক বিক্রি থেকে। এ খাতের মোট রফতানি আয় ২,১৫১ কোটি ডলারের মধ্যে ওভেন পোশাক রফতানি থেকে এসেছে ১,১০৪ কোটি ডলার, আর নিট পোশাক রফতানি থেকে আয় হয়েছে ১,০৪৭ কোটি ডলার।
রফতানি ও কারখানা বৃদ্ধি প্রসঙ্গে বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও এক্সপোর্টার্স এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট আব্দুস সালাম মুর্শেদী জনকণ্ঠকে বলেন, এটা সম্ভব হয়েছে অবকাঠামো উন্নয়নের ফলে। তবে আরও বেশি অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারের নজর দেয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পর যখন নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেল, তখন থেকেই রফতানি বাড়ছে। দুই বছরের মধ্যে রফতানি বাড়ল ৬ বিলিয়ন ডলার। অথচ ওই সময়ে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা চলছিল। সরকার রফতানি বাড়াতে প্রণোদনা দেয়ার পাশাপাশি নতুন বাজার সৃষ্টিতে কাজ শুরু করল। তারই ধারাবাহিকতায় দেশের রফতানি খাতে এই সাফল্য।
অর্থনীতিতে বাংলাদেশ যে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে, এর মূলে রয়েছে আমাদের রফতানি বাণিজ্য। যার আবার ৮০ শতাংশ হচ্ছে তৈরি পোশাক। তিনি বলেন, রফতানির এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। দেশে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা আছে বলেই ব্যবসা-বাণিজ্য টিকে আছে। তবে বিজিএমইএর সহসভাপতি রিয়াজ-বিন-মাহমুদ সুমন মনে করেন, পোশাক শিল্পের এই সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে প্রতিযোগী দেশগুলো ষড়যন্ত্র করছে। কিন্তু তার পরও সরকার ও মালিকপক্ষের বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে এ শিল্পের অগ্রগতি কেউ থামাতে পারবে না। তিনি বলেন, সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনায় রফতানিতে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ যুক্ত হয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় পোশাক ক্রেতাদের বড় দুই সংগঠন এ্যাকোর্ড ও এ্যালায়েন্স আমাদের সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ ছাড়া বিদেশী সংস্থা কমপ্যাক্টও নতুন করে কাজ শুরু করেছে।
পাশাপাশি সরকারের শ্রুম ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বিজিএমইএ নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি ও ফায়ার সেফটি নিয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। শ্রম অধিকার বাস্তবায়নে নতুন শ্রম আইন তৈরি করেছে সরকার। এ ছাড়া রানা প্লাজা ধস এবং তাজরীনে অগ্নিকা-ের ঘটনায় নিহত ও আহত শ্রমিকদের পাশে দাঁড়িয়েছে সরকার ও মালিকপক্ষ। ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। এসব পদক্ষেপের ফলে বহির্বিশ্বে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে। আশা করছি, এসব কারণে ডিসেম্বরের মধ্যে ওবামা প্রশাসন জিএসপি স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে নেবে।
রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছেন ক্রেতারা ॥ বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছেন বিদেশী ক্রেতারা। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। বড় বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা দেখতে চায়। রানা প্লাজা ধসের পর সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ বিশেষ করে মুন্সীগঞ্জের বাউশিয়ায় নতুন করে গার্মেন্টস পল্লীর ঘোষণায় ক্রেতাদের মধ্যে আস্থা ফিরে এসেছে। নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের কারণেই এ শিল্প উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে বলে মনে করছেন তাঁরা।
আগামীতেও দেশে স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক সরকার দেখতে চায় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো। যদিও বড় বড় ক্রেতারা ইতোমধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে থাকার ঘোষণা দিয়েছে। বিশেষ করে রানা প্লাজা ধসের পর ভারত, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম কিংবা কম্বোডিয়ার উদ্যোক্তারা আশা করেছিল বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাকের অর্ডার তাদের কাছে চলে যাবে। কিন্ত বাস্তবে তা হয়নি। এর মূলেও রয়েছে সস্তায় পোশাক কেনার সুযোগ। দামের কারণেই বাংলাদেশ থেকে ক্রেতারা সরছে না। তার পরও রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর দেশের ভাবমূর্তি নির্ভর করছে। সরকার জঙ্গীবাদ দমনে কঠোর হওয়ায় বিদেশী ক্রেতাদের আস্থাহীনতার সঙ্কট দূর হয়েছে। কারণ, ইতোমধ্যে জঙ্গীবাদের কারণে পাকিস্তান ছেড়েছে বড় বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো। এ প্রসঙ্গে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক প্রথম সহসভাপতি আবুল কাশেম আহমেদ জনকণ্ঠকে বলেন, দেশের অর্থনীতি বিশেষ করে রফতানি ও রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা রক্ষায় স্থিতিশীল ও সংবিধান সমুন্নত গণতান্ত্রিক সরকারের বিকল্প কিছু নেই। নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের অধীনে দেশ পরিচালিত হচ্ছে বিধায় মাথাপিছু আয় বাড়ছে। বাড়ছে বিনিয়োগ ও রফতানি।