বাস্তবায়নের পথে মেট্রোরেল প্রকল্প

* মেট্রোরেলের রুট চূড়ান্ত

* ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ প্রায় শেষ

* ইঞ্জিন-কোচ ক্রয়ে দরপত্র আহ্বান

* অবকাঠামো নির্মাণ শুরু ২০১৬ সালে

* চালু হবে ২০১৯ সালের গোড়াতেই

টিটু সাহা : দেশে বর্তমানে চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও এগিয়ে চলেছে মেট্রোরেল প্রকল্পের বাস্তবায়নের কাজ। সংসদে এ সংক্রান্ত একটি বিল পাস হওয়ার পর পরই এই প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় সব জরিপ শেষ পর্যায়ে প্রায়। ভূ-তাত্তি¡ক জরিপের কাজও চলছে জোরকদমে। মেট্রোরেলের রুটও হয়ে গেছে পুরোপুরি চূড়ান্ত। এছাড়াও মেট্রোরেলের ইঞ্জিন ও কোচ ক্রয় করতে প্রথম আন্তর্জাতিক দরপত্রও আহ্বান করেছে সরকার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সব ঠিক থাকলে যেভাবে

কাজ চলছে তাতে আগামী ২০১৬ সালে শুরু হবে এর অবকাঠামোর নির্মাণকাজ। আর ২০১৯ সালের গোড়াতেই এই পরিবহনের সুবিধা ভোগ করতে পারবেন রাজধানীবাসী।

সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ২০-২৫ বছরে নতুন নতুন সরকার এসেছে। এসব সরকার এ সময়ে নিয়েছে নতুন নতুন অনেক পরিকল্পনা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীতে যানজট সমস্যা কমেনি। বরং বেড়েছে কয়েকগুণ। এরপর গত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে বিশ্বের সর্বাধুনিক সুবিধাসম্পন্ন দ্রুতগতির যোগাযোগ ব্যবস্থা এই মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজে হাত দেয়। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারেও মেট্রোরেলকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ওই সরকার নানা জটিলতায় কাজটি শুরু করতে পারেনি। কিন্তু এবার সরকার এই প্রকল্পটিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছে।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এম এ এন ছিদ্দিক বলেন, মেট্রোরেল প্রকল্পের রুট চূড়ান্ত হয়ে গেছে। মেট্রোরেলের জন্য প্রয়োজনীয় ইঞ্জিন ও কোচ ক্রয় করতে প্রথম আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। বাকি যে অবকাঠামো রয়েছে সেগুলোর জন্য এই অর্থবছরে আরো সাতটি কন্ট্রাক্ট প্যাকেজের টেন্ডার আহ্বান করা হবে। চলছে ভূ-তাত্তি¡ক জরিপ কাজ। আশা করছি আগামী ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকল্পের অবকাঠামোর নির্মাণকাজ শুরু হয়ে যাবে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ডেভেলপমেন্ট কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের ইঞ্জিনিয়ার সাইদুর রহমান জানান, উত্তরা থার্ড ফেজ থেকে কাজ শুরু করা হয়েছে। মতিঝিলে গিয়ে শেষ হবে। মোট ভূ-তাত্তি¡ক জরিপের কাজ ২০ দশমিক ১ কিলোমিটার। ভূ-তাত্তি¡ক জরিপের কাজ প্রায় শেষের দিকে চলে এসেছে।

মেট্রোরেলের প্রকল্প পরিচালক মোফাজ্জেল হোসেন জানান, মোট আটটি প্যাকেজে বাস্তবায়ন করা হবে মেট্রোরেল। ২০১৬ সালের জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন দরপত্র প্রক্রিয়া চলবে। ২০১৬ সালের অক্টোবরে চুক্তি সই হতে পারে। সব ঠিক থাকলে প্রথম পর্বের নির্মাণকাজ ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে শেষ হবে। ২০২৪ সালে শেষ হবে সম্পূর্ণ কাজ।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. এস এম সালেহ উদ্দিন বলেন, রাজধানী ঢাকার সমস্যা এতটাই জটিল হয়ে উঠেছে যে গণপরিবহন হিসেবে বাস দিয়ে সমস্যার সমাধান করা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় সমস্যা সমাধানের সবচেয়ে বড় বিকল্প হচ্ছে মেট্রোরেল। এ প্রকল্প আরো আগে বাস্তবায়ন করা উচিত ছিল। দেরি করার কারণে এরই মধ্যে প্রকল্পের ব্যয় অনেকটাই বেড়ে গেছে। তবে তারপরেও এটি যদি এখনো শুরু করা যায়, তা-ও নগরবাসীর জন্য একটি সুখবর হবে। রাজধানীর যানজট নিরসনের পাশাপাশি এ প্রকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন বয়ে আনবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, রাজধানীর উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে মেট্রোরেল প্রকল্পটিতে ব্যয় হবে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। এই টাকার মধ্যে ১৬ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা দিচ্ছে জাইকা। আর বাকি টাকার জোগান দেবে সরকার। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরা থেকে মাত্র ৩৮ মিনিটেই পৌঁছানো যাবে মতিঝিলে। মেট্রোরেলে থাকবে ১৬টি স্টেশন। ঘণ্টায় ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব হবে। ঘণ্টায় মেট্রোরেলের গতি হবে গড়ে ৩২ কিলোমিটার। মেট্রোরেলের নির্ধারিত রুট অনুযায়ী উত্তরা থেকে পল্লবী, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, শাহবাগ, টিএসসি, দোয়েল চত্বর, প্রেসক্লাব ও মতিঝিল পর্যন্ত যাবে। মেট্রোরেল পুরোটাই হবে উড়ালপথে। বিদ্যমান সড়কের মাঝখানে আড়াই মিটার জায়গা নেয়া হবে। উচ্চতা হবে মাটি থেকে আট থেকে ১৩ মিটার পর্যন্ত। তিন পর্যায়ে বাস্তবায়িত হবে প্রকল্পটি। প্রথম ধাপে ২০১৯ সালে পল্লবী থেকে সোনারগাঁও হোটেল পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার পথ চালু হবে। ২০২০ সালে সোনারগাঁও থেকে মতিঝিল এবং ২০২১ সাল নাগাদ উত্তরা থেকে পল্লবী অংশে মেট্রোরেল চালু হবে। মেট্রোরেলের জন্য ১৬টি স্টেশন প্রস্তাব করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে, উত্তরার উত্তর, উত্তরা কেন্দ্র, উত্তরা দক্ষিণ, পল্লবী, আইএমটি, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, তালতলা, আগারগাঁও, বিজয়সরণি, ফার্মগেট, সোনারগাঁও, জাতীয় জাদুঘর, দোয়েল চত্বর, জাতীয় স্টেডিয়াম ও বাংলাদেশ ব্যাংক। স্টেশনগুলো ওপরে হবে এবং নিচ থেকে লিফট বা চলন্ত সিঁড়ির মাধ্যমে যাত্রীদের উপরে যাওয়ার ব্যবস্থা থাকবে।

প্রসঙ্গত, প্রকল্পের কাজ বছর দুয়েক আগেই শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুই দফা রুট পরিবর্তনের কারণে প্রকল্প থমকে যায়। প্রথমবার গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী উড়ালসড়কের কারণে এবং দ্বিতীয়বার বিমানবাহিনীর আপত্তির মুখে রুট পরিবর্তন করা হয়। গত ২৬ জানুয়ারি সংসদে মেট্রোরেল বিল পাস হয়।