সার্বভৌম তহবিল গঠন করছে সরকার

প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগের লক্ষ্যে ‘সার্বভৌম সম্পদ তহবিল’ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ তহবিল গঠন হলে একদিকে যেমন দেশ আর্থিকভাবে লাভবান হবে অন্যদিকে দেশের জন্য তা সম্মানেরও। সাধারণত এ তহবিলের অর্থ অন্য দেশে বিনিয়োগ করা হয়।
তহবিল গঠনের বিষয়ে সম্প্রতি একটি গেজেট প্রকাশ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরীকে সভাপতি করে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে মর্মে বলা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের ট্রেজারি ও ঋণ ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগের প্রকাশিত ওই গেজেটে।  ওই কমিটি তহবিল গঠনের সম্ভাব্যতা যাচাই, কার্যপ্রণালি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এর উত্তম ব্যবস্থাপনার নীতিগত ও কারিগরি দিকগুলো পর্যালোচনা করে একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করবে। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এ তহবিল গঠন ও পরিচালিত হবে। ৩০ এপ্রিলের মধ্যে ওই প্রতিবেদন জমা দিতে হবে কমিটিকে।
জানা গেছে, সার্বভৌম সম্পদ তহবিল হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ তহবিল। কোনো দেশ বা জাতির বৈদেশিক লেনদেনে আয়ের চেয়ে ব্যয় কম হলে উদ্বৃত্ত রিজার্ভ দিয়ে এ ধরনের তহবিল গঠন করা হয়। সার্বভৌম সম্পদ তহবিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকও গঠন করতে পারে এবং এ ধরনের তহবিলের সামষ্টিক অর্থনীতি বা বাজেটীয় গুরুত্ব থাকে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ তহবিল থেকে স্টক, বন্ড, ভূমি, মূল্যবান ধাতু এবং আর্থিক সম্পদে বিনিয়োগ করা হয়। বেসরকারি পুঁজি তহবিল অথবা হেডজ ফান্ডের মতো বিকল্প বিনিয়োগেও এ তহবিল ব্যবহার হয়। এ তহবিল বিনিয়োগ হয় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে। বাংলাদেশে এ ধরনের তহবিল গঠন করা সম্ভব হলে সেটি মূলত অবকাঠামো খাতে, বিশেষ করে পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হতে পারে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
এ বিষয়ে সার্বভৌম সম্পদ তহবিল কমিটির সভাপতি এসকে সুর চৌধুরী বলেন, তহবিল গঠনের জন্য এখন পর্যন্ত একটি কমিটি করা হয়েছে। এ কমিটি শিগগিরই একটি বৈঠকে বসবে। তার পরই জানা যাবে এ তহবিল কী কাজে ব্যবহার হবে। আগামী সপ্তাহের শেষের দিকে সভা হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ও কমিটির সদস্য বিরূপাক্ষ পাল বলেন, কমিটির সদস্যদের আনুষ্ঠানিক সভার আগে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। প্রথমে আগ্রহী ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে তাদের বক্তব্য জানা হবে। এর পর কমিটি একটি বৈঠক করে বাকি সিদ্ধান্ত নেবে।
কমিটির আরেক সদস্য বলেন, যেসব দেশের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ বেশি সেসব দেশ তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত রিজার্ভ অন্য দেশের কাছে দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ করে যাতে সেখান থেকে কিছু আয় হয়।
কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এ আর এম নজমুস্ ছাকিব, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী, যুগ্ম সচিব অরিজিত্ চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আহসান উল্লাহ, অর্থ বিভাগের উপ-সচিব ইকবাল আবদুল্লাহ হারুন, সিনিয়র সহকারী সচিব আবু দাইয়ান মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ, বাংলাদেশ  ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক বিষ্ণুপদ সাহা এবং উপ-মহাব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম।  জানা গেছে, ২০১১ সালে স্বল্পোন্নত ৪৮টি দেশের অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা আরও বৃদ্ধির পাশাপাশি একটি সার্বভৌম সম্পদ তহবিল গঠনের তাগিদ দিয়েছিল জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা ইউনাইটেড নেশনস কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আঙ্কটাড)। এক্ষেত্রে অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থা ভালো বলে আঙ্কটাডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল।
বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ২০১২ সালে সার্বভৌম বন্ড ছাড়ার একটি উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। মূলত পদ্মা সেতু নির্মাণে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে ওই বন্ড ছাড়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। বিশ্বের কয়েকটি দেশ সে সময় আন্তর্জাতিক বন্ড ছেড়ে বিপাকে পড়ে। তাই  সেসময় এ ধরনের বন্ড ছেড়ে ঝুঁকি নিতে চায়নি দেশের অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্টরা। তাই শেষ পর্যন্ত সার্বভৌম বন্ড ছাড়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি।