সার্কভুক্ত দেশে প্রথম ওসিআর বাংলাদেশের

বাংলা ভাষায় লিখিত সব ধরনের কনটেন্ট ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষণ করতে, খুঁজে পেতে এবং সম্পাদনযোগ্য করতে সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সবার আগে বাংলাদেশে চালু হয়েছে অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিকগনাইজার বা ওসিআর। এ দেশে এই ওসিআর-এর নাম রাখা হয়েছে পুঁথি। আর তৈরি করেছে টিম ইঞ্জিন লিমিটেড। বিশ্বের ১৯৪টি দেশের মধ্যে মাত্র ৩৬টি দেশে ওসিআর চালু আছে। সে হিসেবে বাংলাদেশ ওসিআরভুক্ত ৩৭তম দেশ। সম্প্রতি আইসিটি ডিভিশন পরিদর্শন করতে এসে এসব তথ্য দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। টিম ইঞ্জিনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সামিরা জুবেরী হিমিকার এই ওসিআর উদ্বোধনও করেন প্রধানমন্ত্রী। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাতে লেখা, টাইপ করা এবং ছাপার হরফের লেখাকে যন্ত্রে পাঠযোগ্য করতে সক্ষম এই ওসিআর সফটওয়্যারটি পৃথিবীর সব বাংলা ভাষাভাষী আগ্রহী মানুষের জন্য তৈরি করা হয়েছে। পদ্ধতিটি ছবিতে সংরক্ষিত অক্ষরও চিনতে পারে। এটি মাত্র ৪ সেকেন্ডেই বইয়ের একটি পাতাকে ডিজিটাল এবং সম্পাদনযোগ্য করতে সক্ষম। হাজার বছরের বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি ২৩৭ বছরের বাংলা মুদ্রণের ইতিহাসে ওসিআর একটি নতুন মাত্রা যোগ করতে যাচ্ছে। ১৯৬৯ সালে মুনীর কিবোর্ড আবিষ্কার, ১৯৭৩ সালে বাংলা টাইপরাইটার প্রবর্তন, ১৯৮৬ সালে শহীদলিপির আত্মপ্রকাশ, ১৯৮৭ সালে বাংলা পত্রিকা আনন্দপত্র প্রকাশ, ১৯৮৮ সালে বিজয় কিবোর্ড প্রকাশ এবং ২০০৩ সালে অনলাইনে বাংলা লেখার সফটওয়্যার অভ্রের যাত্রা শুরুর পর এই ওসিআর পুঁথিকে বাংলা ভাষার নতুন মাইলফলক হিসেবে ধরা হচ্ছে। ১৭৭৮ সালের পরবর্তী মুদ্রিত বাংলা বিষয়বস্তুকে ডিজিটাল যুগে সংযুক্ত করার জন্য বাংলা ওসিআর একটি বড় হাতিয়ার। ১৭৭৮ সালে হলহ্যাডের বাংলা ব্যাকরণের মুদ্রণ, পঞ্চানন কর্মকারের ছেনিকাটা হরফ, উইলকিন্সের ডিজাইন, বাংলা সিসার হরফ, বাংলা লাইনো-মনো, ফটোটাইপসেটার, ফিয়োনা রসের বাংলা হরফমালা এবং কম্পিউটার ও অন্যান্য ডিজিটাল যন্ত্রের হরফমালার সঙ্গে ওসিআরের সম্পর্ক রয়েছে। সম্পর্ক আছে ৩৫ কোটি বাংলা ভাষাভাষীর হাতের লেখার সঙ্গে। অহমিয়া বা পূর্ব ভারতীয় ভাষাগুলোতেও এটি কাজে দেবে। কারণ তারাও বঙ্গলিপি ব্যবহার করে। বর্তমানের হাতের লেখা, পুঁথির হস্তলিপি, প্রাচীন বাংলার অক্ষরসমষ্টিসহ বাংলা মুদ্রণের সঙ্গে যুক্ত সব ধরনের টাইপোগ্রাফি এবং বাংলা বর্ণমালার বিভিন্ন রূপ ও বৈশিষ্ট্য, যুক্তাক্ষর গঠনের পদ্ধতি, পাঠ্যবইয়ের স্পষ্টীকরণ, সিসার হরফ ও আসকি-ইউনিকোড ফন্টসমূহের যাবতীয় বৈচিত্র্য সবই ওসিআর এক ডিজিটাল সংস্করণে সংযুক্ত করতে পারবে। বাংলা ওসিআর সম্পর্কে টিম ইঞ্জিনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সামিরা জুবেরী হিমিকা বলেন, আমাদের অনলাইন লাইব্রেরি অ্যানসেস্টর তৈরি করতে গিয়ে বাংলা ওসিআরের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। আমরা পৃথিবীর প্রায় আশি হাজার বিভিন্ন রিসোর্সের বইকে এক জায়গায় এনেছি। কিন্তু বাংলায় সেটা করতে গিয়ে দেখলাম ওসিআর ছাড়া সেটা সম্ভব নয়। সেই ২০১০ সাল থেকে আমরা এটি নিয়ে গবেষণা ও নানা খোঁজখবর শুরু করলাম। তারপর ২০১২ সালে নিজেরাই কাজ শুরু করেছি। অনেক বাধাবিপত্তির মধ্যে এগিয়েছি আমরা। রিসোর্স নিয়ে খুব কম সহযোগিতা পেয়েছি। কিন্তু থেমে যাইনি এবং শেষ পর্যন্ত আমরা এটি করতে পেরেছি। বাংলা ওসিআরের গুরুত্ব সম্পর্কে হিমিকা বলেন, বাংলা ওসিআর দিয়ে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে নতুন-পুরনো বই, নথি ডিজিটালাইজড করা যাবে। এতে এসব বই, নথি একেবারে হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবে। বই, নথি, কাগজের স্তূপ থেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করে কোনো তথ্য খুঁজে বের করতে হবে না। ওয়েবে থাকলে সার্চ দিলেই সব তথ্য পাওয়া যাবে। এ ছাড়া অনলাইন লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠায় বাংলা ওসিআর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। ই-গভর্নেন্স ও কাগজ-ফাইলবিহীন অফিসের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবে ওসিআর। এর মাধ্যমে পুরনো সব কাগুজে ফাইল নথিপত্র ডিজিটাল ফরম্যাটে ওয়েব বা সার্ভার কিংবা কম্পিউটারের হার্ডডিস্কে সংরক্ষণ করে ডিজিটাল রিসোর্স তৈরি করা যাবে।