কৃষিতে অভাবনীয় সাফল্য

রপ্তানি হচ্ছে চাল, খাদ্য উৎপাদনে রেকর্ড

সাঈদুর রহমান রিমন ও শেখ সফিউদ্দিন জিন্নাহ্

বাংলাদেশ শুধু ডিজিটালের দিকেই এগোচ্ছে না। খাদ্য উৎপাদনসহ কৃষিতেও এগিয়ে যাচ্ছে তাল মিলিয়ে। বহুমুখী সমস্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করেও এ খাতে এসেছে অভাবনীয় সাফল্য। ছোট আয়তনের এই দেশ এখন বছরে চার কোটি টন চাল উৎপাদনে সক্ষম। দুই বছর আগেও যা ছিল সাড়ে তিন কোটি টনের নিচে। অল্প সময়েই খাদ্য উৎপাদনে ব্যাপক সাফল্য এনেছেন দেশের কৃষকরা। ধান উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে চাল রপ্তানি করে বাংলাদেশ ছুঁয়েছে আরেকটি মাইলফলক। কৃষির উন্নয়নে বদলে যাচ্ছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও জীবিকার ধারা। নতুন নতুন ধানের জাত উদ্ভাবনে অর্থনীতির নতুন এক দিগন্ত দেখছে দেশবাসী। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার জ্বলন্ত উদাহরণ এ বছর শ্রীলঙ্কায় বাংলাদেশের ৫০ হাজার মেট্রিক টন চাল রপ্তানি। ধারাবাহিকভাবে এ সাফল্যের কারিগর এ দেশের লাখ লাখ সাধারণ কৃষক। আর কৃষকের নেপথ্যে কাজ করেছেন বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) অভিজ্ঞ গবেষকরা। কৃষকের শ্রম, কৃষি কর্মকর্তাদের তদারকি, কৃষিবিজ্ঞানীদের গবেষণা ও সরকারের সদিচ্ছায় ধান চাষ ও চাল উৎপাদনের এ রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। আর এতে পাল্টে গেছে জাতীয় প্রবৃদ্ধি বা গ্রস ডমেস্টিক প্রডাক্ট বা জিডিপির গ্রাফ। জাতীয় পরিসংখ্যান অনুসারে শুধু কৃৃষি খাতে জিডিপির অবদান ২১%। আর কৃষিশ্রমে ৪৮%। কৃষির সাব-সেক্টরসহ এ পরিসংখ্যান ৫৬%।

ব্রির মহাপরিচালক ড. জীবনকৃষ্ণ বিশ্বাস বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বাংলাদেশ ধান উৎপাদনে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে। সরকার ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটকে (ব্রি) বিভিন্নভাবে তদারক করছে। ব্রির গবেষকদের মেধা ও কৃষকের শ্রম কাজে লাগানোয় এসেছে সাফল্য। ব্রি সূত্রে জানা গেছে, সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটি ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে মৌসুম ও পরিবেশ-উপযোগী উচ্চফলনশীল (উফশী) ধানের জাত এবং উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ফসল, মাটি, পানি, সারসহ নানাবিষয়ক কলাকৌশল উদ্ভাবন করছে। ব্রি উদ্ভাবিত ধানের জাত দেশের মোট ধানিজমির ৮০ ভাগে চাষাবাদ করা হচ্ছে। আর এ থেকে পাওয়া যাচ্ছে মোট উৎপাদনের ৯০ ভাগ। আর প্রতিষ্ঠানটি ব্যাপক গবেষণার মাধ্যমে এ পর্যন্ত ৭২টি ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। ব্রি সূত্র জানায়, বাংলাদেশ বিশ্বের ধান উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে চতুর্থ হলেও এখানকার হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ৪.২ মেট্রিক টন। চীন, জাপান ও কোরিয়ায় এ ফলন হেক্টরপ্রতি ৬ থেকে সাড়ে ৬ মেট্রিক টন। দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখার খাদ্য চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে ধানের ফলন বাড়ানোর বিষয়টি ভাবনায় এনে সনাতন জাতের ধান এবং মান্ধাতা আমলের আবাদ পদ্ধতি ছেড়ে উফশী ধান ও আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তির ব্যবহার কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয় করে তোলা হয়। গবেষণায় বিশ্বে প্রথম জিঙ্কসমৃদ্ধ নতুন ধানের জাত উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছে ব্রি। এর নাম ব্রি৬২ ও ব্রি৬৪। জিঙ্কসমৃদ্ধ ধানের চালে কেজিপ্রতি ২৪ মিলিগ্রাম জিঙ্ক রয়েছে, যা থেকে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ শরীরের চাহিদার ৪০ ভাগ জিঙ্কের ঘাটতি পূরণ করতে সক্ষম। অন্যদিকে ব্রির গবেষকরা গোল্ডেন রাইস নামের ভিটামিন-‘এ’ সমৃদ্ধ একটি নতুন ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন, যা এখনো কৃষকের হাতে পৌঁছায়নি। উদ্ভাবিত এসব জাতের মধ্যে হাইব্রিড ধানের ধরন রয়েছে চারটি। উন্নত জাতের ধানের মধ্যে আট থেকে নয় টন পর্যন্ত ফলন দিতে পারে সাত-আটটি জাত। আটটি জাতের উৎপাদনক্ষমতা ছয়-সাত টনের বেশি। হেক্টরপ্রতি পাঁচ টন উৎপাদন হয় ১২টি জাতের। তিন টনের বেশি উৎপাদন হয় মাত্র তিনটি জাতে। তিন মৌসুমে চাষাবাদে রয়েছে খড়াসহিষ্ণু, বন্যাসহিষ্ণু, লবণাক্ততাসহিষ্ণু, শীতসহিষ্ণু ধানের জাত। এতে ফলন, জীবনকাল ও বীজের মান পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে রাখা হয়েছে। আর এজন্য ধান গবেষণায় কৃষকের আস্থা ও বিশ্বে খ্যাতি অর্জন করেছে ব্রি। বন্যাকবলিত মানুষের জন্য আশার বাণী নিয়ে এসেছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়র পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা)। আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি)-এর সহায়তায় বন্যাসহিষ্ণু বিনাধান-১১ ও বিনাধান-১২ উদ্ভাবন করা হয়েছে; যা প্রায় ২৫ দিন পর্যন্ত সম্পূর্ণ জলমগ্ন থাকলেও স্বাভাবিক ফলন দিতে সক্ষম। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. মির্জা আশাবাদ ব্যক্ত করেন, আকস্মিক বন্যাসহিষ্ণু ধানের নতুন এ জাতটি চাষ করা হলে শতকরা প্রায় ৪০-৫০ ভাগ বন্যাকবলিত এলাকা ধান চাষের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে। উল্লিখিত জাত দুটির রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণও অনেক কম বলে জানান গবেষকরা। এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, গত ৪২ বছরে বোরো চাষের উপযোগী ধান চাষের জমি কমেছে। কিন্তু বেড়েছে ধানের উৎপাদন। শুধু বোরো ধানের উৎপাদন বেড়েছে ১৬ হাজার ৬৮৯ মেট্রিক টন। আমন ধানের উৎপাদন বেড়েছে ৭ হাজার ৭৫৩ মেট্রিক টন এবং আউশ উৎপাদন বেড়েছে ১২৭ মেট্রিক টন। আউশের উৎপাদন তুলনামূলক কম হওয়ার কারণ এর জমি কমেছে সবচেয়ে বেশি। ব্রির উফশী আধুনিক ধানের জাত (শীতকালীন) ৮২%, গ্রীষ্মকালীন ৩৬% এবং প্রতিস্থাপিত আমনের বর্ষাকালীন ধান চাষ হচ্ছে ৪৭% এলাকায়। ব্রির উফশী আধুনিক জাত প্রতি বছর ধান উৎপাদন বৃদ্ধিতে মুখ্য ভূমিকা রেখে চলেছে। ফলে ১৯৭০-৭১ উৎপাদন বছরে যেখানে দেশে ধান হয়েছে এক কোটি ১০ লাখ টন, সেখানে ২০১২-২০১৩ উৎপাদন বছরে তা দাঁড়িয়েছে তিন কোটি ৪৮ লাখ টনে। এ বৃদ্ধি ২০১৩-১৪ ও ২০১৪-১৫ উৎপাদন বছরে প্রায় চার কোটি টনে গিয়ে পৌঁছেছে বলে দাবি করেছেন কৃষিবিদরা।একই গাছে ছয় মাসে দুবার ধান! : জিন বিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরী উদ্ভাবিত এক গাছে দুবার ধান ফলনের জিন এখনো সবাইকে অবাক করে দেয়। একই জমিতে একবার ধান চাষ করলে দুবার ফসল পাওয়া যাবে। প্রথমবার ধান কাটার পর ওই গাছেই পুনরায় ধান হবে। মাত্র ছয় মাসেই কৃষকের ঘরে ফসল উঠবে দুবার। মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার হাজীপুর ইউনিয়নের কানিহাটি গ্রামে ড. আবেদ পরীক্ষামূলকভাবে এ ধান চাষ করেন। জানা গেছে, একটি খেতে প্রথমে বোরো ধানের চারা রোপণ করে পরিমাণমতো ইউরিয়া সার প্রয়োগ করতে হয়। সঠিকভাবে সেচ ও পরিচর্যার ১৩০ দিনের মধ্যে ৮৫ সেন্টিমিটার থেকে ১ মিটার উচ্চতার গাছে প্রথমবারের মতো ফসল (ধান) বেরিয়ে আসে। পরে মাটি থেকে ৩৫ সেন্টিমিটার উচ্চতায় পরিকল্পিতভাবে ওই ধান কেটে ফেলতে হয়। খেতে নতুন করে চাষাবাদ ছাড়াই পরিমাণমতো ইউরিয়া সার প্রয়োগ করে পরবর্তী ৫২ দিনের মাথায় দ্বিতীয়বার ফলন মেলে। প্রথমবার ধান কেটে নেওয়ার পর দেখা যায় প্রতি হেক্টরে ছয় দশমিক চার টন এবং দ্বিতীয়বার তিন টন উৎপাদিত হয়। ব্রির মহাপরিচালক ড. জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস ভারতীয় বিজ্ঞানী ড. স্বামী নাথানকে উদ্ধৃত করে বলেন, বিজ্ঞানের আবিষ্কার, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কৃষকের ঘামের সমন্বয় ছাড়া কৃষিতে সাফল্য সম্ভব নয়।এ তিনের সমন্বয়ের ফলেই আজ বাংলাদেশ খাদ্যে যথেষ্ট স্বয়ংসম্পূর্ণ।