পোশাকের পর এবার জুতা শিল্প দখল করবে বিশ্ববাজার

বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের নাম সব থেকে বেশি উচ্চারিত হয় পোশাকশিল্পের কারণে। শতভাগ রপ্তানিমুখী এই শিল্প থেকে সব থেকে বেশি রপ্তানি আয় আসে। এবার পোশাকের পর জুতা শিল্পে সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে। আর সেই সুযোগ তৈরি হয়েছে চীনের কারণে। এই খাতের উদ্যোক্তরা বলছেন, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পাদুকা প্রস্তুতকারী দেশ চীন এ খাত থেকে নজর সরিয়ে নেয়ায় বাংলাদেশই হতে চলেছে চামড়া শিল্পের বিদেশি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের পরবর্তী গন্তব্য।
উদ্যোক্তারা মনে করছেন, সুযোগ ও সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের ৫০ কোটি ডলারের জুতা শিল্পকে পাঁচ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। এ শিল্পের জন্য পর্যাপ্ত কাঁচামাল, চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, সস্তা শ্রম এবং জুতা তৈরির জন্য যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ বেশকিছু সরকারি উদ্যোগের ফলে বিদেশি উদ্যোক্তারা ইতোমধ্যে বাংলাদেশে বিনিয়োগের বিষয়ে আগ্রহী করে তুলছে বলে এ খাতের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। লেদার গুডস এন্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স এন্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর জানান, এরই মধ্যে অন্তত ৫১টি প্রতিষ্ঠান যৌথ বিনিয়োগে বাংলাদেশের পাদুকা শিল্পে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সবচেয়ে বেশি জুতা প্রস্তুতকারী দেশ চীন এখন বিশ্ববাজার থেকে নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছে। আর আমাদের দেশ এখন বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে প্রস্তুত হয়ে আছে এ খাতে বিদেশি বিনিয়োগ পাওয়ার জন্য। চীনের চামড়া শিল্প নিয়ে রিসার্চ এন্ড মার্কেট ডটকমের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১২-১৩ সালে চীনে চামড়ার তৈরি জুতা শিল্পের উৎপাদন ৫ দশমিক ২৯ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ কমেছে। চীনের ছেড়ে দেয়া বিশ্বের জুতার বাজারের ওই অংশটিই ধরতে চাইছেন বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে চামড়া, চামড়াজাত পণ্য ও চামড়ার জুতা বিদেশে পাঠিয়ে বাংলাদেশের আয় হয়েছে ১২৯ কোটি ডলার, যা মোট রপ্তানি আয়ের ৪ দশমিক ২ শতাংশ। চামড়া শিল্পের রপ্তানি আয়ের মধ্যে গত অর্থবছর জুতা রপ্তানি থেকে এসেছে ৫৫ কোটি ডলার। আগের অর্থবছর পাদুকা রপ্তানি করে ৪১ দশমিক ৯৩ কোটি ডলার আয় করেছিল বাংলাদেশ। চলতি ২০১৪-১৫ অর্থবছরেও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে আয় বেড়েছে ৭ শতাংশ; ফুটওয়্যার রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২২ দশমিক ১৬ শতাংশ। শুরুর বিবেচনায় এক দিক দিয়ে বাংলাদেশের চামড়া শিল্প পোশাক খাতের চেয়েও এগিয়ে আছে বলে মনে করছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় পাদুকা প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর।
তিনি বলেন, গার্মেন্ট শিল্পের ক্ষেত্রে শুরুতে যেটা হয়েছিল, তারা বিদেশি অর্ডার পেত কিন্তু ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ছিল না। পরে সেটা ডেভেলপ করে। আর চামড়া শিল্পের ক্ষেত্রে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ, মানের ম্যাটেরিয়াল বা কাঁচা চামড়া, সেই চামড়াকে প্রক্রিয়াকরণের কারখানা প্রচুর রয়েছে এখানে। অর্থাৎ চামড়ার জুতা তৈরির সব ধরনের সুবিধাই প্রস্তুত।
তিনি আরো বলেন, আর সবচেয়ে বড় কথা হলো চামড়ার জুতা উৎপাদনকারী প্রধান দেশ চীন, ভিয়তেনাম এবং ব্রাজিল এ খাত থেকে ধীরে ধীরে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে। তাই আমি মনে করি, গার্মেন্ট শিল্পের পর চামড়া শিল্পই এখন বিদেশি বিনিয়োগ আসার সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত।
লেদার গুডস এন্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স এন্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১১০টি রপ্তানিমুখী কারখানায় চামড়ার পাদুকা তৈরি হয়। এর মধ্যে এপেক্স, এফবি, পিকার্ড বাংলাদেশ, জেনিস, আকিজ, আরএমএম বেঙ্গল এবং বের রয়েছে নিজস্ব ট্যানারি ও চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা। এর বাইরে শুধু চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে এমন কারখানার সংখ্যা ২০৭টি।