বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রথম মাইলফলক

সৈয়দ সাব্বির আহমেদ : ঘরের মাঠে বিশ্বকাপে সম্ভব হয়নি, তবে ওশেনিয়াতে সম্ভব হলো প্রথম মাইলফলক ছোঁয়ার। ক্রিকেটের জনক বলে খ্যাত ইংল্যান্ডকে হারিয়ে দিয়ে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নক আউট রাউন্ড নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ। মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের সেঞ্চুরি ও রুবেল হোসেনের দুর্দান্ত ডেথ ওভার বোলিংয়ের ওপর ভর করে ইংলিশদের ১৫ রানে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করেছে মাশরাফি বাহিনী।

২০১৫ বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই দলের কাছে সমর্থকদের একমাত্র চাওয়া ছিল যেন অন্তত কোয়ার্টার ফাইনাল খেলতে পারে টাইগাররা। মাশরাফিও পরিষ্কার ভাবে দেশ ছাড়ার আগে বলে গিয়েছিলেন যে কোনো মূল্যে কোয়ার্টারে নিয়ে যাবেন দলকে। এবং সে জন্য দরকার ছিল আফগানিস্তান ও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে প্রত্যাশিত জয়ের পাশাপাশি একটি টেস্ট খেলুড়ে দলের বিপক্ষে জয়। শুরু থেকেই মাশরাফি অ্যাডিলেডে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটিকেই পাখির চোখ করেছিলেন। শক্তি-সামর্থ্য এবং গত বিশ্বকাপে চট্টগ্রামে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয় ইংলিশদের বিপক্ষে জেতার ব্যাপারে বিশ্বাসী করেছিল টাইগারদের। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি

বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়ায় এক পয়েন্ট প্রাপ্তি বাংলাদেশকে আরো বেশি উজ্জীবিত করে। সেই আশায় ভর করেই অ্যাডিলেডে বাংলাদেশ খেলতে নামে। টস হেরে যাওয়ার পরেও তাই মাশরাফির মুখে হাসি, ইয়ন মরগান যে বোলিং বেছে নিয়েছেন। হাসতে হাসতে মাশরাফি ইংলিশ ধারাভাষ্যকার নাসির হোসাইনকে বলেন তিনি ব্যাটিংই বেছে নিতেন। তবে ব্যাট করতে নামার পর ইমরুল ও তামিম দায়িত্বজ্ঞানহীন সিøপে ক্যাচ দিয়ে আউট হওয়ার পরে মাশরাফির মুখের সেই হাসির কী অবস্থা হয়েছিল সেটা অবশ্য দেখা যায়নি। তবে সেখান থেকে আবার তার মুখে হাসিটা বজায় রাখার ব্যবস্থা করেন মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ ও সৌম্য সরকার। এই দুইজন তৃতীয় উইকেটে ৮৬ রানের জুটি গড়ে তুলে প্রাথমিক বিপর্যয় সামাল দেন। কিন্তু ৯৪ রানে বাউন্সারে বিভ্রান্ত হয়ে আউট যাওয়ার পর মঈন আলির বলে সিøপে খোঁচা দিয়ে আউট হয়ে যান সাকিব আল হাসানও। বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের এই বিপর্যয় আশঙ্কা জাগাচ্ছিল ২০০-এর মধ্যে অলআউট হওয়ার আশঙ্কা চোখ রাঙানি দিচ্ছিল। সেই আশঙ্কাকে ভুল প্রমাণ করে পঞ্চম উইকেটে ১৪১ রানের জুটি গড়ে তোলেন। ইংলিশ বোলারদের হতাশ করে দিয়ে মাহমুদুল্লাহ প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে বিশ্বকাপে সেঞ্চুরি করেন। বিশ্বকাপের ৩০তম ম্যাচে এসে বাংলাদেশ প্রথম সেঞ্চুরি পায় মাহমুদুল্লাহর হাত ধরে। উল্লেখ্য, ওয়ানডের ৩০তম ম্যাচেও প্রথম সেঞ্চুরি পেয়েছিল বাংলাদেশ আরেক ম, মেহরাব হাসান অপির হাত ধরে। সম্পর্কে মাহমুদুল্লাহর ভায়রা ভাই মুশফিকুর রহিম করেন ৮৯ রান। এই দুইজনের ইনিংসের ওপর ভর করে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত সাত উইকেট হারিয়ে ২৭৫ রান করে। যদিও এক সময় ২৯০-৩০০ শুধু সময়ের ব্যাপার মনে হচ্ছিল। তবে গতকাল সোমবার মাশরাফি বলেছিলেন ব্যাটসম্যানরা যদি ২৭০-৮০ রান স্কোরবোর্ডে এনে দিতে পারে তাহলে অ্যাডিলেডে তার বোলারদের সামর্থ্য আছে সেটি রক্ষা করার। তারপরেও অ্যাডিলেডের মরা উইকেটে ২৭৬ রান খুব নিরাপদ স্কোর মনে হয়নি। এই বিশ্বকাপে এর আগে দুইবার ৩০০ করেছে ইংল্যান্ড। মঈন আলি ও ইয়ান বেল ইংলিশদের হয়ে শুরুটা করেছিলেন চমৎকার। ১১ রানে একবার রুবেলের বলে এলবিডব্লিউ আউট হওয়ার পর মঈন আলি ডিসিশন রিভিউ নিয়ে বেঁচে যান। তবে ৪৩ রানে সৌম্য সরকার রান আউট করে তাকে ফেরত পাঠান। বিশ্বকাপে ইংলিশদের সবচেয়ে বেশি রান করা মঈন আলি ফেরত যাওয়ার পরে সেখান থেকে ইংলিশদের এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকেন গ্যারি ব্যালেন্সের জায়গায় সুযোগ পাওয়া অ্যালেক্স হেলস ও ইয়ান বেল। ৯৭ রানে হেলসকে উইকেটের পেছনে ক্যাচ বানিয়ে বাংলাদেশকে উদযাপনে ভাসিয়ে দেন অধিনায়ক মাশরাফি। এরপরে ইংল্যান্ডের দলীয় ১২১ রানে রুবেল হোসেন এক ওভারেই আউট করেন বিপজ্জনক হয়ে উঠতে থাকা ইয়ান বেল ও অধিনায়ক ইয়ন মরগানকে। ইয়ন মরগানের গত আট ম্যাচে এটা চতুর্থ শূন্য রানের ইনিংস। এরপর দলীয় ১৩২ রানে তাসকিন জেমস টেইলরকে ফেরত পাঠানোর পর বাংলাদেশের জয়টা শুধু সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। জস বাটলার ও ক্রিস ওকস অবশ্য বাংলাদেশি সমর্থকদের স্নায়ুর চরম পরীক্ষা নিয়েছেন। বাটলারের ৫২ বলে ৬৫ ও ওকসের ৪০ বলে ৪২ রান ইংল্যান্ডের জন্য স্মরণীয় এক জয় এনে দেয়ার দ্বারপ্রান্তে ছিল। কিন্তু তরুণ তাসকিন বাটলারকে উইকেটের পেছনে ক্যাচে পরিণত করেন। এরপরের বলেই ক্রিস জর্ডান সাকিব আল হাসানের দুর্দান্ত রান আউটের শিকার হন। কোয়ার্টার ফাইনাল ও বাংলাদেশের মধ্যে তখন শুধু ক্রিস ওকস দাঁড়ানো। অথচ তাসকিনের করা ৪৮তম ওভারে ওকস সহজ একটি ক্যাচ দেয়ার পরেও সেটি নিতে ব্যর্থ তামিম ইকবাল। ইংল্যান্ডের তখন প্রয়োজন ১৪ বলে ১৮ রান। ৪৯তম ওভারে বল করতে আসার সময় রুবেলকে কানে কানে কী যেন বলেন সাকিব আল হাসান। তখন দুইজনের মধ্যেই খুনসুটি করার মুখভঙ্গি। সাকিবের সেই কথায় কিনা রুবেল হোসেন প্রথম বলেই স্টুয়ার্ট ব্রডকে সরাসরি বোল্ড করে দেন। এরপরে ব্যাট হাতে নামতে এসে একটি বল ঠেকিয়ে পরের বলেই বোল্ড জেমস অ্যান্ডারসন। অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে ওকস হতাশ হয়ে দেখলেন দলের পরাজয়। রুবেল হোসেন চার উইকেট নিঃসন্দেহে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে জয়ে। আর মাঠে তখন উল্লাসে মেতেছে বাংলাদেশের ১১ জন এবং দেশের ১৬ কোটি মানুষ। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নক আউট রাউন্ড নিশ্চিত হয়েছে। তাও আবার সাবেক উপনিবেশিক শাসক ইংলিশদের হারিয়ে যারা আবার নিজেদের খেলাটির জনক হিসেবেও দাবি করে। এমন জয়ের পর আসলে আর কিছু চাওয়ার থাকে না। ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কারটি সেঞ্চুরি করা মাহমুদুল্লাহ পেলেও দলের জয়ের নেপথ্যে টিমওয়ার্ক। ম্যাচের স্নায়ু টান টান মুহ‚র্তগুলো মাশরাফির দল বেশ ভালোই সামলেছে। সৌম্যর করা সেই রান আউট, সীমানা থেকে সাকিবের মরগানের প্রায় অসম্ভব ক্যাচ ও একটি রান আউট ও দুর্দান্ত ফিল্ডিং, সবকিছুতে নিজেদের নিংড়ে দিয়েছে খেলোয়াড়েরা। এমন কী তামিম ইকবাল ক্যাচ মিস করার পর সে সময়েই তার পক্ষে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছেন ম্যান অব দ্য ম্যাচ রিয়াদ। ক্যাচ মিস হতেই পারে বলে তামিমের পাশে নিশ্চয় পুরো দলই দাঁড়াবে। রুবেল শেষ উইকেট নেয়ার পর মাশরাফি মাঠে শুয়ে পড়েছিলেন। ম্যাচের আগের দিনই বলেছিলেন এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটি জিতে অধিনায়ক সেটি উৎসর্গ করেছেন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোকিত সূর্য সন্তানদের, মুক্তিযুদ্ধের অদম্য সেনানীদের।