দক্ষিণ এশিয়ায় নারী কর্মসংস্থানে বাংলাদেশ দ্বিতীয়

একদশক আগেও বাংলাদেশের নারীরা সক্ষমতা, কর্মসংস্থান এবং নেতৃত্বে পিছিয়েছিলেন। নানা বাধাঁ অতিক্রিম করে নারীদের কর্মসংস্থানে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এখন বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়।
সম্প্রতি অর্থ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান মাস্টার কার্ড প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে নারীদের সার্বিক উন্নয়নের এ চিত্র উঠে এসেছে। একদশক আগেও দেশে কর্মসংস্থানে নারীর অংশগ্রহণ ছিল খুবই কম। সে অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশ।
সক্ষমতা, কর্মসংস্থান, নেতৃত্ব— এ তিন ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের অনুপাতের ওপর জরিপ চালিয়ে ‘মাস্টার কার্ড ইনডেক্স অব উইমেনস অ্যাডভান্সমেন্ট
(এমআইডব্লিউএ) ২০১৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে মাস্টার কার্ড। এক্ষেত্রে প্রতি ১০০ পুরুষের বিপরীতে নারীর অনুপাত কত তার ভিত্তিতে স্কোর নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নারীর কর্মসংস্থানে দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচটি দেশের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে আছে নেপাল। দ্বিতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ। এর পরই রয়েছে ভারত, শ্রীলংকা ও পাকিস্তান।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারীর কর্মসংস্থানে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে সফল নেপাল। দেশটির স্কোর ৯৬। কারণ সাম্প্রতিক কর্মসংস্থানে নিয়মিত হওয়া নারীর অনুপাত ১০০ পুরুষের বিপরীতে ১০০ দশমিক ১। এছাড়া শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও নেপালের নারীরা বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছেন। বর্তমানে এ অনুপাত ১০০ পুর“ষের বিপরীতে ৯২ দশমিক ২।
এদিকে কর্মসংস্থানে নিয়মিত হওয়া ও শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণে বাংলাদেশে নারীদের স্কোর ১০০ পুরুষের বিপরীতে ৮৩ দশমিক ৩। এছাড়া ভারতের স্কোর ৫৯ দশমিক ৮, শ্রীলংকার ৪৬ দশমিক ২ ও পাকিস্তানের ৪১ দশমিক ৪।
গত এক দশকে দেশে নারীর কর্মসংস্থানে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে কৃষি ও তৈরি পোশাক খাত। এ দুটি খাতে নারী শ্রমিকের চাহিদা বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারের সহায়ক নীতি, নারী শিক্ষা বাড়ানোয় বিশেষ পদক্ষেপ ও নারীর প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে উদ্যোগ নারী কর্মসংস্থান বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। এছাড়া সামাজিক বিভিন্ন প্রচলিত রীতিনীতির পরিবর্তনও সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রম জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে কৃষিকাজে নিয়োজিত রয়েছে আড়াই কোটি শ্রমিক। এর মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৫ লাখই নারী। এক দশক আগেও তা ছিল মাত্র ৩৮ লাখ। যেখানে কৃষি খাতে পুরুষ শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ সাড়ে ৩ শতাংশ কমছে, সেখানে নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ বাড়ছে প্রায় ১৭ শতাংশ হারে। সুযোগ তৈরির পাশাপাশি কৃষির বিভিন্ন পর্যায়ে শ্রম বিভাজন নারী শ্রমিকের চাহিদা বাড়িয়েছে। তুলনামূলক কম ভারী কাজ, বিশেষ করে ফসল বা খাদ্যশস্য কাটার পর তা বাছাই ও প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রেও সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হচ্ছে নারীদের। তাছাড়া অপেক্ষাকৃত বেশি সময় ধরে চলা কাজ, যেমন সেচকাজ পরিচালনা, ফসলের ক্ষেত তদারকিতেও নারীর অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ছে। তবে এ খাতে নিয়োজিত নারী শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষায় পদক্ষেপ দাবি করেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে তৈরি পোশাক খাতে বর্তমানে কর্মরত আছে প্রায় ৪৪ লাখ শ্রমিক, যার ৯০ শতাংশ বা ৪০ লাখই নারী। খাতটির নারী শ্রমিকের ওপর নির্ভর করেই ২০২৫ সালের মধ্যে ৫০ বিলিয়ন ডলার রফতানির স্বপ্ন দেখছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। সুতরাং নারী এখন শুধু নিয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। তারা দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
এ প্রসঙ্গে ব্র্যাকের ভাইস চেয়ারম্যান ও অন্তর্র্বতীকালীন নির্বাহী পরিচালক ড. এএমআর চৌধুরী বলেন, কৃষিকাজে নারীর কর্মসংস্থানে ভূমিকা রাখছে জমির মালিকানা ও জমির আকার পরিবর্তন। আবার বেশির ভাগ পুরুষ অকৃষিকাজে নিয়োজিত হচ্ছেন অথবা গ্রাম ছেড়ে পাড়ি জমাচ্ছেন শহর কিংবা বিদেশে। এ অবস্থায় কৃষিতে পরুষ শ্রমিকের সংকটে কৃষি উৎপাদনে নারীই হাল ধরছেন। সার্বিকভাবে পুরুষের পেশা পরিবর্তন ছাড়াও সরকারি ও বেসরকারি খাতের উদ্যোগ নারীদের এগিয়ে আসার সুযোগ করে দিচ্ছে। তবে নারীর অংশগ্রহণ শুধু বাড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, তাদের কর্মকান্ডে উৎপাদনশীলতাও বেড়েছে।
মানবাধিকার কর্মী খুশি কবির বলেন, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হলে নারীরা এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে নারীরা আগের তুলনায় বর্তমানে শিক্ষায় ও কর্মসংস্থানে এগিয়ে আসছে। ফলে নারীরা নিজের প্রতি অধিকার সচেতন হচ্ছে। এখন নারীরা অন্যায় অবিচার মুখ বুজে সহ্য করে না। কিন্তু নারী যতই সহিংসতার বিরুদ্ধে মুখ খুলছে, ঠিক তেমনি বাড়ছে নারীর প্রতি সহিংসতা। নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করতে হলে সমাজ ও পরিবারের মানসিকতা বদলাতে হবে। পুরুষতান্ত্রিক আইন ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে হবে।
আইনে বাংলাদেশের নারীদের বিয়ের বয়স ১৮ বছর ছিল। আর এখন পরিবার চাইলে ১৬ বছর বয়সে বিয়ে দিতে পারবে, যা নারীদের জন্য ক্ষতিকর। এ আইন কার্যকর হলে নারীদের স্বা¯’্যঝ্্্্্্্ুঁকি যেমন বাড়বে, তেমনি কমবে নারীদের শিক্ষার হার। সরকারের উচিত, নারীদের বিয়ের বয়স ১৮ বছর রাখা।
সরকারি প্রতিষ্ঠানে মাতৃত্বকালীন ছুটি ৬ মাস, কিন্তু অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মাতৃত্বকালীন ছুটি ৪ মাস দেয়া হয়। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান আবার ছুটিও দেয় না। ছুটির বদলে মাতৃত্বকালীন সময়ে চাকরি থেকে ছাটাই করা হয়। যা দুঃখজনক। কর্মক্ষেত্রে নারীরা মজুরি বৈষম্যসহ নানা হয়রানির শিকার হয়। নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ হলে, নারীরা আরও কাজে এগিয়ে আসবে। তারা পুরুষের মতো অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অবদান রাখবে। দেশের উন্নয়নে তারা কাজ করবে।
নারীদের নিয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হলে, নারীরা অনেক দূর এগিয়ে যাবে।
এদিকে নারীর ক্ষমতায়ন, মানবাধিকারের উন্নয়ন’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করেছে উন্নয়ন সংস্থা টিডিএস ।
এ উপলক্ষে রোববার বিকাল ৩ টায় রাজধানীর শাহ্জাহানপুর রেলওয়ে কলোনীতে টিডিএস’র স্থানীয় সিবিও’র সহযোগিতায় নারী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক চাহিদা থেকে মেয়েরা কর্মজীবী হচ্ছে। উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় নারী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীকে কম গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
তারা বলেন, কর্মক্ষেত্রে মজুরিসহ নারীদের প্রতি বিভিন্ন বৈষম্যে দূর করে নারীদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। পরিবারে সমাজে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রক্রিয়ায় নারীরা যতো বেশি অংশগ্রহণ করবে দেশ তত বেশি এগিয়ে যাবে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে নারীদের অধিকার ও ন্যায্যতা সম্বলিত ফেস্টুন নিয়ে বিভিন্ন পেশার নারীরা সমাবেশে অংশগ্রহণ করেন। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহর, জেলা, উপজেলা ও থানাগুলোতে নারী দিবস পালিত হয়েছে।