অচলায়তন ভেঙে এগোচ্ছে নারী সাফল্য সবখানে

অচলায়তন ভেঙে এদেশে নারীর অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে অনেক আগেই। শিক্ষা অর্জন, স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া, প্রশাসনের শীর্ষ পদসহ সব ক্ষেত্রেই নারীরা নিজ যোগ্যতাবলেই এগিয়েছে। তবে নারী পুরুষের সমতা অর্জনের প্রশ্নটি এখনও বহু দূরের পথ। বিশ্লেষকদের মতে, এর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নারীর ক্ষমতায়ন। রাষ্ট্রপতির পদটি বাদে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, জাতীয় সংসদের স্পিকার, উপনেতা, হুইপ, সচিব, বিচারপতি, জেলা প্রশাসক, শীর্ষ ব্যাংক কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক, শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে প্রায় সবক্ষেত্রেই নারী তার যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখছে। সংখ্যায় কম হলেও পাইলট, সশস্ত্রবাহিনীর কর্মকর্তা, প্যারাসুটার, খেলোয়াড়, ব্যবসায়ী, আইনজীবী, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, কৃষক, লেখক, ভাস্করসহ সব ধরনের পেশায় স্বমহিমায় উজ্জ্বল নারী। পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত চূড়া হিমালয়ের এভারেস্টেও পড়েছে এদেশের নারীর পদচিহ্ন। শিক্ষা, পরিবেশ ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য নারীরা আন্তর্জাতিকভাবে নানা পুরস্কারে ভূষিত হচ্ছেন। সাহসী সাংবাদিকতার জন্য পেয়েছেন সম্মাননা।

সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন হিসাবে দেখা যায়, দেশের ৮০ ভাগ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী গার্মেন্ট শ্রমিকদের সিংহভাগই নারী। গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর অবদান ৫৩ শতাংশ। মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় ইতোমধ্যে নারী ও পুরুষের সমতা অর্জিত হয়েছে। কিন্তু কলেজ ও উচ্চ শিক্ষায় এ সমতা অর্জন করতে আরও কয়েক বছর সময় লাগবে। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সম্প্রতি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে বলেছেন, আগামী দু’বছরের মধ্যে উচ্চ মাধ্যমিকে এবং পাঁচ বছরের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নারী-পুরুষের সমতা অর্জন করা সম্ভব হবে। তবে শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে নারীর সাফল্য কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে গিয়ে কিছুটা ম্লান হয়ে পড়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, ১৯৯১ সালে প্রাথমিক স্কুলে ভর্তি হওয়া ১ কোটি ২৬ লাখ ৩৫ হাজার ৪১৯ জনের মধ্যে ৫৭ লাখ ২৫ হাজার ৩২৭ জন ছিল মেয়ে। আর ২০১৩ সালে ভর্তি হওয়া ১ কোটি ৯৫ লাখ ৮৪ হাজার ৯২৭ জনের মধ্যে ৯৮ লাখ ৪ হাজার ২০ জন ছিল মেয়ে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্যানুযায়ী ১৯৯০ সালের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষার ৪ লাখ ৩৫ হাজার ৯১৮ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৫১২ জন ছিল ছাত্রী। সেখানে ২০১৪ সালের এ পরীক্ষার ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৮৭০ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৫ লাখ ৫১ হাজার ৯৭২ জন ছিল মেয়ে।

১৯৯০ সালের উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষার ২ লাখ ৯৪ হাজার ৩১৯ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৭৭ হাজার ৯২৭ জন ছিল মেয়ে। অন্যদিকে ২০১৪ সালের এ পরীক্ষার ১১ লাখ ৪১ হাজার ৩৭৪ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৮১ জন ছিল নারী। ব্যানবেইসের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাথমিকে দেশে যত শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে, তার মধ্যে ৫০ ভাগই ছাত্রী। মাধ্যমিক স্তরের ৫৩ ভাগ ছাত্রী। কলেজ পর্যায়ে এ হার ৪৭ ভাগ। কিন্তু উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত শিক্ষার স্তরে গিয়ে নারীর সংখ্যা অনেক কমে যাচ্ছে। ব্যানবেইসের সর্বশেষ হিসাবে চিকিত্সা, আইনসহ পেশাগত শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ এখন ৩৮ শতাংশ। আর বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অধ্যয়নরত মোট শিক্ষার্থীর ৩৩ ভাগ নারী। তবে প্রতিবছর এসব স্তরেও নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি চাকরিতে অনুমোদিত পদ আছে ১৪ লাখ ৭১ হাজার ৩৬টি। এর মধ্যে ২০১৪ পর্যন্ত কর্মরত চাকুরের সংখ্যা ১১ লাখ ৯৪ হাজার ৪৪৯ জন। এর মধ্যে নারী চাকরিজীবী হলেন ২ লাখ ৮৮ হাজার ৮০৪ জন। তবে প্রতি বছর এই সংখ্যা বাড়ছে। ২০০৯ সালে নারী চাকরিজীবী ছিলেন ২ লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ জন, ২০১০ সালে ২ লাখ ২৭ হাজার ১১৪ জন, ২০১১ সালে ২ লাখ ৫০ হাজার ১৯৯ জন এবং ২০১২ সালে নারী চাকরিজীবীর সংখ্যা দাঁড়ায় ২ লাখ ৫২ হাজার ৮৪৫ জন।

এতসব কিছুর পরও নারী-পুরুষের সমতা অর্জন এখনও বহুদূরের পথ। নারীদের নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের মতে, এর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নারীর ক্ষমতায়ন। নারীরা নিজ নিজ উদ্যোগে অনেক ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করলেও প্রকৃত অর্থে ক্ষমতায়ন ও অধিকার রক্ষায় এখনও পিছিয়ে আছে তারা।

পুলিশ সদর দফতরের দেওয়া তথ্য তুলে ধরে মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি গত ২৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে বলেছেন, ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত গত পাঁচ বছরে দেশে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৫২টি। এসব নির্যাতনের ঘটনায় বিভিন্ন থানায় মামলা হয়েছে। মামলাগুলোর মধ্যে ধর্ষণ মামলা রয়েছে ১৬ হাজার ৭৭৪টি।
জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) এক প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, দেশে এখনও ১৮ বছরের আগেই ৬৬ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে উচ্চশিক্ষার আগেই ঝরে পড়ছে তারা। আবার উচ্চশিক্ষা শেষ করেও পারিবারিক ও সামাজিক বাধায় নারীরা কর্মে যোগদান করতে পারছেন না। বিভিন্ন সংগঠনের হিসাবে এখনও ৪২ শতাংশ নারী পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন।

এ বিষয়ে নারীগ্রন্থ প্রবর্তনার নির্বাহী পরিচালক ফরিদা আখতার বলেন, রাজনৈতিকভাবে নারীর ক্ষমতায়ন ও অগ্রযাত্রায় বর্তমানে সবচেয়ে বড় বাধা রয়েছে। রাজনৈতিকভাবে যেসব জায়গায় দুর্বলতা আছে সেগুলো দূর না করলে অন্যান্য ক্ষেত্রেও ক্ষমতায়ন হবে না। রাজনৈতিকভাবে ওপরের দিকে অল্প কিছু নারী ক্ষমতাবান থাকবেন আর বাকি সব ক্ষমতাহীন থাকলে সার্বিকভাবে নারীর ক্ষমতায়ন ও অগ্রযাত্রা সঠিকভাবে হবে না। তিনি বলেন, রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি জরুরি হচ্ছে দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ থাকা এবং গণতন্ত্রের জন্য নারীদের সংগ্রামে যুক্ত থাকা জরুরি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে নারীরা গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য কোনো সংগ্রামে যুক্ত নেই। এতে করে তারা নিজেরাই নিজেদের অগ্রযাত্রায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সালমা আলী মনে করেন, বর্তমানে নারীর অগ্রযাত্রা ও অধিকার রক্ষায় সবচেয়ে বড় বাধা পুরুষের মানসিকতা। তিনি বলেন, নারীরা আজ যত কিছুই করুক না কেন এখনও পুরুষরা ঘরে, কর্মক্ষেত্রে, চলার পথে কোথাও নারীর অধিকারকে মেনে নিতে পারেনি। এখনও পারিবারিকভাবে ছেলে ও মেয়েশিশুর মধ্যে বৈষম্য করা হয়। নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে এসব বৈষম্য বাধা হয়ে আছে। নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করতে বর্তমানে বিদ্যমান আইনগুলোর শক্তিশালী ও কার্যকর প্রয়োগ করতে হবে। পুরুষের নেতিবাচক মানসিকতা এবং সব ধরনের বৈষম্য কাটিয়ে উঠতে পারলেই নারীর অধিকার রক্ষা হবে এবং ক্ষমতায়নের পথে বাধা দূর হবে।

তবে মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ গত শুক্রবার এক মানববন্ধনে বলেছেন, আজকে যে মেয়েশিশুটি জন্মাবে সে যখন ২০ বছর বয়সী হবে তখন সে জেন্ডার বৈষম্যহীন একটি বাংলাদেশ পাবে। সে লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে।

বাংলাদেশের নারীদের এমন এক অবস্থায় আজ ৮ মার্চ ‘নারীর ক্ষমতায়ন : মানবতার উন্নয়ন’-এই প্রতিপাদ্য নিয়ে দেশব্যাপী উদযাপিত হবে আন্তর্জাতিক নারী দিবস।