জনশক্তি রপ্তানি প্রক্রিয়া শুরু পাসপোর্ট তৈরির হিড়িক

সৌদি আরব এবং মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রফতানির প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর রাজধানীসহ সারাদেশে পাসপোর্ট তৈরির হিড়িক পড়েছে। নতুন পাসপোর্টের জন্য পাসপোর্ট অফিসগুলোতে এখন আবেদনকারীদের উপচেপড়া ভিড়।

সারাদেশে বিভাগীয় ও জেলা সদরে বর্তমানে ৬৭টি পাসপোর্ট অফিস রয়েছে। ইতিপূর্বে এসব পাসপোর্ট অফিসে দৈনিক সর্বোচ্চ ১০ হাজার পাসপোর্টের আবেদন জমা পড়ত। কিন্তু পক্ষকাল যাবত্ এ আবেদন ১৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এরমধ্যে ঢাকায় তিনটি আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে প্রতিদিন জমা পড়ছে তিন হাজারের বেশি আবেদন। নতুন পাসপোর্ট ছাড়াও হস্তলিখিত পাসপোর্টের পরিবর্তে অনেকে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) করার জন্য আবেদন করছেন। আবেদন বৃদ্ধির সাথে সাথে কাজের চাপ বেড়ে গেছে পাসপোর্ট অফিসগুলোতে। এসব অফিসে কর্মচারী স্বল্পতা রয়েছে। ফলে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আনসার বাহিনীর সদস্যদের দিয়ে কাজের চাপ সামলানো হচ্ছে।

পাসপোর্ট আবেদনকারীদের ভিড় বাড়ার সাথে সাথে দালালদের দৌরাত্ম্যও বেড়ে গেছে। আগারগাঁও আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে একাধিক সংঘবদ্ধ দালাল চক্র দীর্ঘদিন যাবত্ তত্পর। কোন আবেদনকারী এ পাসপোর্ট আঙ্গিনায় আসামাত্রই একাধিক দালাল ঘিরে ধরে। শুরু হয় ‘নির্বিঘ্নে পাসপোর্ট তৈরির কাজ’ সম্পন্ন করার প্রতিশ্রুতি। দালালরা আবেদনকারীর কাজ থেকে আগাম টাকা হাতিয়ে নেয়। অফিসের ভিতর ও বাইরে পুলিশ ও আনসার বাহিনীর সদস্যদের নাকের ডগায় দালালরা তত্পরতা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের খপ্পরে পড়ে আবেদনকারীদের প্রতিদিনই প্রতারণা ও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। দালালদের বিরুদ্ধে প্রতি মাসে দুইবার অভিযান পরিচালনা করে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী। গত সপ্তাহেও এমন এক অভিযানে ৩১ জন দালাল ও তাদের সহকারীদের গ্রেফতার করে র্যাব। কিন্তু বন্ধ হচ্ছে না দালালদের দৌরাত্ম্য।

গতকাল সোমবার বিকালেও আগারগাঁও আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সামনে সাইফুল ইসলাম নামের এক আবেদনকারীকে এক দালালের সাথে ঝগড়া করতে দেখা যায়। তিনি জানান, টুটুল নামের ঐ দালাল এক সপ্তাহের মধ্যে পাসপোর্ট তৈরি করে দিবে বলে ৬ হাজার টাকা নিয়েছিল। কিন্তু দুই সপ্তাহ কেটে গেলেও এখনও পাসপোর্ট হাতে পাননি তিনি। এখন হয় পাসপোর্ট, নয়তো টাকা ফেরত চাইলে দালাল তার সাথে দুর্ব্যবহার করছে। দালালদের দৌরাত্ম্যের কারণ সম্পর্কে আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসের একজন কর্মকর্তা জানান, প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই হাজার আবেদন গ্রহণ ও সম্পূর্ণ করার ক্ষমতা রয়েছে এ অফিসের। কিন্তু প্রতিদিন তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার আবেদন পড়ে। গত কয়েক সপ্তাহে আবেদনের সংখ্যা আরও বেড়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে কিছু আবেদনকারী পাসপোর্ট পান না। ব্যবস্থাপনার এই ঘাটতির সুযোগ নেয় দালালরা। তারা প্রচারণা চালায় যে, নির্ধারিত ফি দিয়েও সময়মত পাসপোর্ট পাওয়া যায় না। তাদেরকে টাকা দিলে দ্রুত পাসপোর্ট পাওয়া যাবে। এমন প্ররোচনায় বিভ্রান্ত হয়ে আবেদনকারীরা দালালদের টাকা দেন। অথচ সরকারিভাবে নির্ধারিত সময়ের আগে কেউই পাসপোর্ট পেতে পারে না। তাই বিভিন্ন সময় পাসপোর্ট অফিসের সামনে দালাল ও ভুক্তভোগীদের মধ্যে তর্ক-ঝগড়া দেখা যায়।

পাসপোর্ট অফিসকেন্দ্রিক বেশ কয়েকটি দালাল সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এদের মধ্যে জাহাঙ্গীর, ফারুক, কাশেম, আকরাম, বাবুল, নাজমা, সুমন, টুটুলসহ কয়েকটি সিন্ডিকেট বেশি সক্রিয়। এদেরকে পাসপোর্ট অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আনসার সদস্যরাও সহায়তা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

জানা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাসপোর্ট পেতে করণীয় এবং প্রক্রিয়া না জানার কারণেই আবেদনকারীরা ভোগান্তিতে এবং দালালদের খপ্পড়ে পড়েন। সরকার এমনিতেই ৭ দিনে জরুরি এবং ১৫ দিনে সাধারণ পাসপোর্ট সরবরাহ করার নিয়ম তৈরি করছে। তবে পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্টসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়াশেষে জরুরি পাসপোর্ট ১০-১২ দিনে এবং সাধারণ পাসপোর্ট ২০ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে পাওয়া যায়। কিন্তু এ ব্যবস্থার প্রতি আস্থা গড়ে উঠেনি অনেক আবেদনকারীর। আর দালালরাও তাদের ভুল বোঝান। বিশেষ করে মফস্বল ও গ্রাম থেকে আসা ব্যক্তিরা এবং বিদেশগামী অশিক্ষিত ও স্বল্পশিক্ষিতরা এ হয়রানির বেশি শিকার হন।