কৃষিতে অদম্য যুবকের সাফল্য

সেলিম রেজা। বয়স ৩০-এর কোঠায়। নাটোর সদরের আহমেদপুর এলাকার মোঃ নাজিম উদ্দিনের ছেলে তিনি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স পাস করা এ যুবক কিছু একটা করার স্বপ্ন দেখেন ছোটবেলা থেকেই। একে একে চাকরি নেন সেনাবাহিনী, ওষুধ কোম্পানি ও বীমা কোম্পানিতে। কোনো চাকরিই যেন তার ভালো লাগে না। নিজেই কিছু করার চেষ্টা করতে থাকেন। ২০০০ সালে সারা দেশের ঔষধি বৃক্ষ রোপণের সরকারি প্রচারনায় উৎসাহিত হয়ে ২ বিঘা জমিতে ঘৃতকুমারী, মিছরিদানা ও শতমূল চাষ করেন। ভালো উৎপাদন হলেও উৎপাদিত পণ্য বিক্রির ভালো ব্যবস্থা না থাকায় ঔষধি চাষ বন্ধ করে দেন। ২০০৪ সালে ৩৮ বিঘা জমিতে রোপণ করেন আপেল কুল। মাত্র ৩ বছরেই আপেল কুলের গাছ নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণে তিনি কলম প্রযুক্তির মাধ্যমে এগুলোকে থাইকুলে রূপান্তরিত করেন। কুলের চেয়ে দাম বেশি হওয়ায় ২০০৬ সালে ৯ বিঘা জমিতে শুরু করেন বারোমাসি পেয়ারা চাষ। কিছুদিন পরে অসময়ে বাঙি, গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ, লেবু, পেঁপে, ড্রাগন ও শরিফা চাষ শুরু করেন। বর্তমানে ৭০ বিঘা জমিতে তার এসব ফসল রয়েছে। এ ৭০ বিঘার মধ্যে ২৪ বিঘা জমি নিজের এবং ৪৬ বিঘা প্রতি বছর ১০ থেকে ১২ হাজার টাকায় লিজ নেয়া। তার এসব ফসল রক্ষণাবেক্ষণে সার্বক্ষণিক নিয়োজিত রয়েছেন ২৮ শ্রমিক। ফসল তোলার মৌসুমে এখানে কাজ করেন শতাধিক শ্রমিক। এসব চাষাবাদের মধ্যে শরিফা ও ড্রাগন চাষে সে এখন দারুণ মনোযোগী। সেলিম রেজা মাটির স্বাস্থ্যরক্ষায় মাটিতে পচনশীল কৃষি প্রযুক্তি মালচিং পেপার ব্যবহার করেন, যার এক পৃষ্ঠা সাদা ও অন্য পৃষ্ঠা কালো রঙের হয়ে থাকে। শীতপ্রধান দেশে কালো পৃষ্ঠা মাটির উপরে এবং আমাদের দেশে সাদা পৃষ্ঠা মাটির উপরের দিকে রাখতে হয়। প্রথমে মাটিতে চাষ ও জৈব সার দিয়ে তৈরি করে মাটি ভালোভাবে মালচিং পেপার দিয়ে ঢেকে দিতে হয়। পরে নির্দিষ্ট দূরত্বে চারা রোপণ করতে হয়। এতে মাটিতে খাবার ও সেচ কম লাগে, আগাছা জন্মায় না, লেবার কম লাগে, পোকামাকড়ের আক্রমণ কম হয়, মাটির আর্দ্রতা রক্ষাসহ ফসলের খাবারের প্রয়োজন হলে মাঝে যে ড্রেন থাকে, তাতে সেচ দিয়ে খাবার প্রয়োগ করলে গাছ তা গ্রহণ করে। সেলিম রেজা মনে করেন, আমাদের দেশে এ পদ্ধতি চালুর মাধ্যমে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষাসহ অর্গানিক ও কম খরচে বিভিন্ন ফল, সবজি, ফুল যেমন স্ট্রবেরি, বাঁধাকপি, বেগুন, শসা, করলা, পটোল, পুঁইশাক, লেবু, শরিফা পেয়ারাসহ সবই উৎপাদন সম্ভব। ৩ বছর ধরে সেলিম তার খামারে পরীক্ষামূলক এ পদ্ধতির ব্যবহার করে আসছেন। সেলিম রেজা জানান, ২০০০ সালে মাত্র ২৫ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে ২ বিঘা জমিতে ঔষধি গাছ লাগানোর মধ্যেমে যে কাজ তিনি শুরু করেছিলেন, আজ তা বিশাল আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে ৭০ বিঘা জমিতে তার ফসল ফলাতে বীজ, পানি, শ্রমিকসহ নানা খাতে বছরে ব্যয় হয় প্রায় ৪০ লাখ টাকা। আর গেল বছর খরচ বাদেই তার লাভ হয়েছে কোটি টাকার উপরে। তিনি মনে করেন, যে কোনো চাকরির চেয়ে কঠোর পরিশ্রম, বুদ্ধি আর একাগ্রতা থাকলে আমাদের দেশের জমিতে ফসল ফলিয়ে যে কোনো যুবকের ১০ থেকে ১৫ বছরেই পুরোপুরি স্বাবলম্বী হওয়া সম্ভব।