বাংলাদেশের কাছে শেখার আছে: অমর্ত্য সেন

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতসহ মানবিক ক্ষেত্রে উন্নতিতে ভারতের চেয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে রয়েছে বলে মনে করেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন।

সোমবার বিকালে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ মিলনায়তনে ‘ভারত: উন্নয়ন ও বঞ্চনা’ বইয়ের প্রকাশ উৎসবে এ কথা বলেন তিনি।

জঁ দ্রেজ ও অমর্ত্য সেন রচিত বইয়ের প্রকাশনা উৎসব উপলক্ষে ‘অর্থনেতিক উন্নয়ন ও মানবিক প্রগতি’ শীর্ষক উন্মুক্ত বক্তৃতা দেন এই নোবেল বিজয়ী।

তার বইয়ে ভারতবর্ষের সার্বিক চিত্র তুলে ধরার কথা জানিয়ে অমর্ত্য সেন জানান, ভারতের তিনটি খাতে উন্নতি হলেও সবার জন্য স্বাস্থ্য ও শিক্ষা নিশ্চিতে কিছুটা অনগ্রসর অবস্থা রয়েছে।

ভারতবর্ষে তথ্য প্রযুক্তি, ফার্মাসিউটিক্যালস ও অটোপার্টস খাতে অর্থনৈতিক উন্নতি সবচেয়ে বেশি হয়েছে বলে জানান তিনি।

অমর্ত্য সেন বলেন, “মানবিক প্রগতির অভাবে অর্থনৈতিক উন্নতি থেমে থাকতে পারে। ভারতবর্ষে আগের তুলনায় আয় অনেক বেড়েছে, বাংলাদেশের দ্বিগুণ প্রায়। এমন কোনো দেশ নেই অশিক্ষিত ও স্বাস্থ্যহীন কর্মপরিকল্পনা নিয়ে তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে পেরেছে।”

“ভারতের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি হলেও চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে গরিব লোক আরও গরিব হয়েছে। এমনিতে  একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেকে চিকিৎসা পায় না- এটা নিয়ে খুব একটা আলোচনা হচ্ছে না।

“আমি খুব বিশ্বাস করি, যে কোনো জিনিস যদি বদলাতে হয়, বিশেষ করে গণতন্ত্রে- তাহলে তা নিয়ে আলোচনা না করলে তা ভয়ানক, এর সম্ভাবনা খুব কম। আমার চিন্তা হচ্ছে- ভারতবর্ষে আলোচনার গণ্ডিটা ক্রমশ কমে গেছে।”

অমর্ত্য সেন জানান, ১৯৪৭ সালের তুলনায় ভারতের মাথাপিছু আয় সাত গুণ বেড়েছে। চারদিকে অর্থনৈতিক প্রগতি হলেও গড় আয় কম, মৃত্যু হার বেশি।

“অর্থনৈতিক প্রগতি সত্বেও কেন হলো না? দুটি কারণে মানবিক প্রগতি বাড়ে- লোকের আয়ু বাড়াতে হলে মানুষের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।”

তিনি বলেন, উপমহাদেশের একটা বড় সমস্যা মেয়েদের অনগ্রসরতা। কথা বলার সুযোগ, ক্ষমতায়নের অভাব। তা ভারতেও, পাকিস্তানেও।

“বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতবর্ষের পার্থক্যটা এখানে সবচেয়ে বেশি- বাংলাদেশ হওয়ার পরে এখানে একটা বড় পরিবর্তন ঘটেছে। মেয়েদের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ভূমিকার প্রসার ঘটেছে। পরিবার পরিকল্পনা, সরকারি চাকুরে মেয়েরা সুযোগ পেয়েছে।”

অমর্ত্য সেন বলেন, “ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে মেয়েরা স্বাস্থ্য খাতে অনেক বেশি। ১৯৭১ পর্যন্ত এটা দেখতে পাচ্ছি না, এটা ঘটেছে কিন্তু গত দুই-তিন দশকে। লিঙ্গ সমতায় বাংলাদেশের বড় একটা কৃতিত্ব রয়েছে। বাংলেদেশের এ কৃতিত্ব মানতে হবে।

“১৯৯০ সালে ভারতের মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের শতকরা ৫০ ভাগ বেশি। এখন ১০০ ভাগ বেশি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ডাবল ভারতের। তখন গড় আয়ু বাংলাদেশের ভারতের চেয়ে তিন বছর কম ছিল, এখন বাংলাদেশের তিন বছর বেশি। মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার প্রবণতা বাংলাদেশ-ভারত কাছাকাছি ছিল, এখন বাংলাদেশে অনেক বেশি।

“অতএব এটা বিশ্লেষণ করে দেখা যাবে, বাংলাদেশ থেকে ভারতের যদি কিছু শেখার থাকে সবচেয়ে বড় হচ্ছে- জেন্ডার ইক্যুইটি।”

তিনি জানান, ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে কেরালার অবস্থান বাংলাদেশের থেকে সব দিকে ভাল। এটা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বাইরে থেকে স্বকীয় কর্মপরিকল্পনার কারণে এগিয়েছে।

“আজকে যদি দেখি কোথায় আমরা আছি, কী পার্থক্য- সরকারি সহায়তায় শিক্ষা ব্যবস্থা করা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা করা, মেয়েদের শিক্ষা ও সব কিছু অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা- বাংলাদেশে অনেক বেশি।”

পৌনে এক ঘণ্টার মতো বক্তব্য রাখেন অমর্ত্য সেন। এরপর একডজনেরও বেশি প্রশ্নের জবাব দেন হাসিমুখে।
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার পরিবেশনায় রবীন্দ্রসঙ্গীত দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। বক্তব্যে অমর্ত্য সেন বন্যার ভক্ত বলেও উল্লেখ করেন।