পেট্রলবোমা থেকে রক্ষা পেতে বিজ্ঞানী ফারুকের নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন

ইমদাদুল হাসান রাতুল
রাজনৈতিক দাবি আদায়ের পরিবর্তিত ধারায় এখন নতুন আতঙ্কের নাম পেট্রলবোমা। বর্তমানে এটা রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। কম খরচ আর সহজে বহন করা যায় বলে, মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াতে বাড়ছে এর ব্যবহার। এরই মধ্যে এ বোমায় ঝড়ে গেল শতাধিক প্রাণ। শরীরে যন্ত্রণার ক্ষত চিহ্ন নিয়ে হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছেন আরও অনেকে। পুরো দেশই এখন পেট্রলবোমা আতঙ্কে। যার প্রভাব পড়ছে মানুষের জীবন-জীবিকায়। তবে পরিবহন খাতে ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি।
পেট্রলবোমা আতঙ্কের ঘোর এই অন্ধকারের মাঝেই এক টুকরো আশার আলো দেখাচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী ফারুক বিন হোসেনের নতুন এক আবিষ্কার। পেট্রলবোমার আগুন থেকে রক্ষার প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন তিনি। যা থামিয়ে দিতে পারে পেট্রলবোমার ভয়াবহতা, রক্ষা করতে পারে অসংখ্য তাজা প্রাণ। একটি বড় বাসে এ প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য খরচ হবে মাত্র ৪০০-৫০০ টাকা। অগি্নরোধক কাচ ?ও পর্দা সুরক্ষা এই দুই পর্যায়ে কাজ করবে নতুন উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তি। ফারুক হোসেন এর আগে সমুদ্র বা নদীতে ছড়িয়ে পড়া অনাকাঙ্খিত তেল শোষণের প্রযুক্তি, পানিতে ডুবে যাওয়া জাহাজ, নৌকা বা অন্যকোন বস্তুর অবস্থান নির্ণয়ের প্রযুক্তি, মাটির আদ্রতা নির্ণয়ের প্রযুক্তি, এক টাকায় ফরমালিন পরীক্ষার প্রযুক্তি ও শাক-সব্জি ও ফল-মূল টাটকা রাখার মাটির ফ্রিজ উদ্ভাবন করেছেন।
নতুন আবিষ্কৃত এই প্রযুক্তি নিয়ে সংবাদকে ফারুক বিন হোসেন বলেন, পেট্রলবোমার আগুন থেকে জীবন ও পরিবহন সুরক্ষিত রাখার কোন সহজ ও কম মূল্যের লাগসই প্রযুক্তি দেশে বর্তমানে নেই। এ চিন্তা থেকেই সাধারণের জীবন রক্ষায় এই সহজ কার্যকর প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। একটি বড় বাসে এ প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য মাত্র ৪০০-৫০০ টাকা খরচ হবে।
প্রযুক্তিটির প্রস্তুত প্রণালী সম্পর্কে ফারুক বিন সংবাদকে জানান, প্রযুক্তিটির প্রথম পর্যায় হলো অগি্নরোধক কাচ। এতে যানবাহনের জানালার কাচের দুপাশ তিন ইঞ্চি চওড়া স্বচ্ছ স্কচটেপ দিয়ে লেমিনেশন করে নিতে হবে, যা বোমার আঘাতে জানালার কাচ ভাঙা ঠেকাবে এবং ভাঙলেও কাচের টুকরা ভিতরে ছিটকে পড়া রোধ করবে। এটি পেট্রল ও আগুন ছড়িয়ে পড়াও রোধ করবে। এটি ব্যবহারে পেট্রলবোমার ক্ষতি ৭০ শতাংশ রোধ করা সম্ভব।
দ্বিতীয় পর্যায় সম্পর্কে এই বিজ্ঞানী বলেন, এতে জানালার ভেতরে বিশেষ একটি পর্দা ব্যবহার করতে হবে। স্টেশনারি দোকান থেকে চক পাউডার ও আঠা কিনে নিয়ে পানি মিশিয়ে কাই তৈরি করতে হবে। এরপর হার্ডওয়ারের দোকানে কাঠে বার্নিশ করার জন্য যে পাতলা জালি কাপড় পাওয়া যায় তার উপর ওই কাইয়ের প্রলেপ দিতে হবে। পরে রোদে শুকিয়ে কাইয়ের প্রলেপযুক্ত কাপড় পর্দা হিসেবে ব্যবহার করতে হবে গাড়ির জানালার ভেতরে। কাইয়ের মিশ্রনটি তৈরি করতে এক কেজি চক পাউডারের সঙ্গে এক লিটার পানি ও ২৫০ গ্রাম আঠা বা গাম প্রয়োজন হবে। আর পরিমাণ বেশি প্রয়োজন হলে ওই অনুপাত ঠিক রেখে মিশ্রণটি তৈরি করে নেয়া যাবে। বিশেষ পর্দাটি অতি উচ্চ শোষণ ক্ষমতা সম্পন্ন হওয়ার কারণে নিক্ষিপ্ত বোমার পেট্রল বা অকটেন দ্রুত শুষে নেবে এবং এতে তেল কম ছড়িয়ে পড়বে। বোমার কিছু অংশ বাসের জানালার কাচ ভেঙ্গে ভেতরে ঢুকলেও তা পর্দার জন্য ক্ষতি হবে না।
আগুন নেভাতে এই বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, চক পাউডার (কার্বনেট) আগুনে কিছু জ্বলে সাময়িক কার্বন-মনো-অক্সাইড ও কার্বন-ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন করে এবং আবার আগুন দ্রুত নিভিয়ে ফেলে। এ বিশেষ পর্দাটি পোড়ে না এবং অন্য কিছু না জ্বলাও বোধ করে।
এই আবিষ্কার সম্পর্কে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) মহাপরিচালক রফিকুল ইসলাম ম-ল বলেন, বারির এ তরুণ বিজ্ঞানীর উদ্ভাবনী শক্তি অনেক বেশি। যখনই কোন সমস্যা দেখা দেয়, তখনই তিনি সমসাময়িক ওই সমস্যার সমাধানে কাজ শুরু করেন এবং একটা প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে ফেলেন, সেটা কৃষি ক্ষেত্রেই হোক আর কৃষিবহির্ভূত বিষয়েই হউক।