চার দশকে নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন

বেগম জাহান আরা প্রচ্ছদ : শতাব্দী জাহিদ, অঙ্গসজ্জা : শিবশংকর দেবনাথদ্বিতীয় মহাযুদ্ধ মানবজাতিকে এক অপরিমেয় ধ্বংস ও সংঘর্ষের বিভীষিকায় ঢেকে দিয়েছিল। বিপন্ন ভীত-বিধ্বস্ত মানবজাতির সার্বিক অকল্যাণ রোধে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জাতিসংঘ। ১৯৪৫ সালের অক্টোবরে জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত হয় কয়েকটি সনদ। তার মধ্যে বিশ্বমানের শান্তি-নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি ছিল শীর্ষে। ফলে মানুষের মৌলিক স্বাধীনতার দাবির প্রতি সমর্থন দেয়া সংস্থাটির অন্যতম প্রধান আদর্শ এবং কর্ম বলে স্বীকৃত হলো। আর জাতিসংঘ ঘোষিত মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে স্বাভাবিকভাবেই উচ্ছারিত হলো নারীর সমঅধিকারের প্রসঙ্গ।
ধ্বংসের মধ্য থেকেই মাথা উঁচু করেছিল সচেতন নারীসমাজ। ক্রমেই গড়ে তোলে তারা নারীমুক্তি আন্দোলনের বিভিন্ন রকম সৃজনশীল কর্মসূচি। তারই ফসল হিসেবে বিশ্বনারী সমাজ পায় ১৯৭৫ সালের ‘নারীবর্ষ’। এবং এ বছরের শেষেই জাতিসংঘ ঘোষণা দেয় নারী দশকের। বাংলাদেশ তখন বলতে গেলে সদ্য স্বাধীন দেশ। নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের মহাধ্বংসের ক্ষত এখনো মাটি ও মানুষের গায়ে দগদগে হয়ে আছে। স্বাধীনতাকে ধারণ করার প্রাণান্ত প্রস্তুতি চারদিকে। প্রয়োজন হলো কর্মীর হাত। ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সবাই। সব সংস্কার ভেঙে বেরিয়ে এলো নারীরাও। ততদিনে আমরা জেনেছি যুদ্ধক্ষত নারী জনগোষ্ঠীর যন্ত্রণাকাতর বেদনার্ত কয়েক লাখ জীবনের করুণ কথা। ব্যাপক আয়োজন হতে লাগল তাদের পুনর্বাসনের জন্য। সেও তো দেখতে দেখতে প্রায় চার দশক হয়ে গেল।

স্বাধীন বাংলাদেশেও গড়ে উঠল জাতীয় নারী সংগঠন। তা ছড়িয়ে পড়ল দেশের প্রতিটি জেলায়। সত্তরের দশকেই দেখা গেল ব্যাপকহারে মেয়েদের সংখ্যা বাড়ল শিক্ষার জগতে। শিক্ষা ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়, এ কথাটা কোনো দার্শনিকের প্রচার থেকে তারা জানেনি, জেনেছে কর্মী হতে গিয়ে। শিক্ষা গ্রহণের পর মেয়েরা পেশা বা চাকরির জগতে ক্রমেই হতে লাগল সঙ্কোচহীন এবং প্রতিশ্রুতিশীল। আমাদের সমাজের সনাতন ধারণায় মেয়েরা শিক্ষক বা সেবক (নার্স) ছাড়া আর কোনো কাজের যোগ্য নয় বলে মনে করা হতো। ধারণার সেই জগদ্দল সংস্কার ভেঙে দিল মেয়েরাই। যার যেটুকু যোগ্যতা, সেটুকু বিনিয়োগ করেই তারা কারো সাহায্য ছাড়াই অর্থনৈতিক মুক্তির পথ তৈরি করল। অফিস আদালতের ছোটখাটো কাজে মেয়েদের সংখ্যা তো বাড়লই, নির্মাণ কাজের শ্রমিক হিসেবেও বেরিয়ে এলো গ্রামীণ মেয়েরা। ইট ভাঙা, মাটি কাটা, পণ্যবহন করা, কোনো কাজেই বিমুখ রইল না অবহেলিত নারীরা। উন্নয়ন মানে যে শুধু এগিয়ে যাওয়া নয়, শ্রমদানের পরিবেশ সৃষ্টি করা এবং ক্ষুধার বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করা, এ কথাটা এগিয়ে যাওয়া সংগ্রামী মেয়েরা বুঝেছিল স্বাধীন জীবনযাপনের সুবাদেই। যুদ্ধোত্তর দেশে দরিদ্র, বঞ্চিত জীবনের নাগপাশ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য মেয়েদের উদ্দেশে নতুন করে কেউ উচ্চারণ করেনি_ ‘মাথার ঘোমটা ছিঁড়ে ফেল নারী খুলে ফেল ও শিকল।’
জীবন ঘষে আগুন জ্বালাতে শিখেছিল তারা যুদ্ধ দেখেই। একান্ত গ্রামীণ নারীদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ সে কথাই প্রমাণ করেছে।
শিক্ষিত নারীসমাজের মধ্যেও দেখা গেল অবহেলিত নারীসমাজের জন্য কল্যাণমূলক সেবাদানের উৎসাহ। শিক্ষার সর্বস্তরে মেয়েদের পদচারণা বৃদ্ধি পেল। উচ্চশিক্ষায় ভালো ফল অর্জন করে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে, অফিস আদালতে, সরকারি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি পেতে লাগল মেয়েরা। গড়ে উঠল দেশি-বিদেশি অর্থে পর্যাপ্ত এনজিও। সব এনজিওতেই নারী ও শিশু উন্নয়ন কর্মসূচি রাখত তারা। দলে দলে গ্রামীণ ও নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়েরা কুটির শিল্পের কাজ শেখার জন্য এগিয়ে এলো। তারা কিছু টাকাও পেত প্রশিক্ষণের জন্য। তাদের হাতের কাজ প্রদর্শনীর মাধ্যমে বিক্রি করেও কিছু টাকা দেয়া হতো। অর্থকরী কাজ ও হাতে কলমে প্রশিক্ষণ গ্রহণের ফলে সাধারণ মেয়েদের মধ্যে গড়ে উঠল আত্মবিশ্বাস। পরিবারেও তাদের সম্মান বাড়ল। রোজগারে মহিলারা তাদের শিশুদের লেখাপড়ার বিষয়ে আগ্রহী এবং যত্নশীল হলো। বিশেষ করে কন্যাশিশুর শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে শিখল মহিলারা। শিক্ষাগত এবং অর্থনীতিকে উন্নয়নের পাশাপাশি মানসিক উন্নয়নও এলো। আর এর সব কিছুরই ভিত্তি গড়ে উঠল স্বাধীনতার প্রথম দশকেই।
আশির দশকে বিপ্লব এনে ফেলল পোশাকশিল্পের মহিলা শ্রমিকরা। অজগাঁ থেকেও দলে দলে মেয়েরা এসেছিল পোশাকশিল্পের কর্মী হিসেবে। ঘর ভাড়া করে বা মেস করে শহরে, নগরে থাকার কথা যারা কখনো কল্পনাও করেনি, তারাও সাহসী হয়ে উঠল অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের অন্তর্গত মন্ত্রে। কথা ঠিক যে, নাগরিক জীবনে কর্মী মেয়েরা আর ‘গেঁয়ো’ থাকতে চায়নি। সাধারণ কাপড়ই কুচিয়ে পরা এবং হালকা প্রসাধনে নিজেদের ঝকঝকে করে তুলতে চেয়েছে। আমাদের দেশের সুবিধাবাদী বেইমান শ্রেণিসচেতন কিছু মানুষ সজ্জিত গ্রামীণ মেয়েদের জীবনাচার খুব একটা ভালো চোখে দেখেনি। কটু মন্তব্য, শাসন-বারণ ফতোয়া-সবই দিয়েছে তাদের উদ্দেশে। তাতেও কিন্তু কর্মী মেয়েরা দমে যায়নি। এটাই কি কম উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের কথা?
উন্নত বিশ্বে এবং উন্নয়নশীল বিশ্বে নারীমুক্তি, নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন, নারীর মানবিক জীবনাচার এক রকম নয়। ইংরেজ নারীবাদী লেখক ভার্জিনিয়া উলফ যখন বলেন যে, একজন স্বাধীনচেতা নারীর একটা নিজস্ব ঘর, পড়ালেখার জন্য একটা টেবিল এবং বছরে ৫০০ পাউন্ড অর্থ বইপত্র প্রকাশের জন্য থাকা উচিত, তখনই তো আমরা স্ট্যান্ডার্ডটা বুঝতে পারি। এত চাহিদা বা সাহস কিংবা নারী স্বাধীনতার ধারণা আমাদের সাধারণ নারীসমাজের মধ্যে নেই। বেগম রোকেয়া নারী স্বাধীনতা বলতে মূলত শিক্ষা, মানসিক এবং মানবিক উন্নয়নকে বোঝাতেন। তিনি মুক্তিকামী মহিলাদের জন্য মন্ত্র রেখে গেছেন, ‘ভগিনীগণ তোমরা জাগো। … বলো আমরাও মানুষ।’ নারী উন্নয়নের প্রক্রিয়ায় যাবতীয় শিক্ষা প্রশিক্ষণ এবং কার্যক্রমে মানসিক ও মানবিক উন্নয়নের কথা এখনো বলতে হবে আরো বহুবছর। এবং নিরন্তর।
আশির দশকে আমাদের দেশে মহিলা পুলিশবাহিনী গঠন করা হয়। ক্রমে তারা অপরাধ বিভাগ ও গোয়েন্দা বিভাগেও কাজের যোগ্যতা অর্জন করে। গ্রামীণ ব্যাংকসহ অন্য এনজিও থেকে গ্রামীণ মেয়েদের ঋণ সুবিধে দেয়া হয়। যাতে তারা বুদ্ধি করে কৃষি খাতে টাকা বিনিয়োগ করে অর্থনীতিকে উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের পথে যেতে শেখে। শিখেছেও তারা। হাঁস-মুরগি, ছাগল-গরু, মাছ, সবজি এমনকি ধানচাষেও প্রচুর শ্রম দিয়েছে। আয় রোজগার বাড়িয়েছে পরিবারের তথা দেশের সমগ্র কৃষি উন্নয়নের জগতে। এ পথে হেঁটে এখন তারা অনেক সমস্যার মোকাবেলা করছে নিজেরাই। কর্মই খুলে দিয়েছে তাদের চোখ, কান, মন, বুদ্ধি। গ্রামীণ সমাজের যে চেহারা আমি পলাতক থাকা অবস্থায় নিজে দেখেছি মুক্তিযুদ্ধের সময়, সে চেহারা এখন অনেকটাই বদলে গেছে। অর্থাৎ আমাদের মাটির মর্মমূল ঘেঁষা অবহেলিত নারীসমাজের চেহারায় মননে জীবনচারিতায় প্রত্যয়ের ছাপ পড়েছে। এটা অবশ্যই চেয়েছি আমরা।
নম্বইয়ের দশকে মানবসম্পদ বিনিয়োগের প্রথম দিকে শুধু পুরুষ ছাড়া মহিলা কর্মীদের দেখা না গেলেও এখন তারা শ্রম বিনিয়োগ করতে বিদেশে যাচ্ছে দলে দলে। ভাষা না জেনে, শিক্ষায় তেমন জ্ঞান অর্জন না করেও তারা অর্থনৈতিক কর্মকা-ে শক্ত পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে। যা সত্তরের দশকেও কল্পনা করা যায়নি। তবে একটা কথা ঠিক যে, মাটির মানুষের কাছে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার আলো যতটা পেঁৗছে দেয়ার কথা ছিল, ততটা পারা যায়নি। তা আমাদের বিদ্ধ করে নিরন্তর। গ্রামীণ নারীসমাজ এবং নিম্নবিত্ত সমাজের মহিলারা তাই বুদ্ধিবৃত্তিগত কর্মে এখনো যথেষ্ট পশ্চাৎপদ। জনসংখ্যাবহুল এ দেশের অর্ধেকই নারী। তাদের শিক্ষা ও পেশাগত জীবনের দক্ষতায় সম্পৃক্ত তো করতেই হবে। নিয়ে যেতে হবে বুদ্ধিভিত্তিক উচ্চতায়। কারণ, মেধাহীন বিত্ত দিয়ে কোনো মহৎ কাজ হয় না।
এই দশকেই শিক্ষিত মহিলারা প্রশাসনিক দপ্তরে যোগ্যতাসহ এসে উপস্থিত হয়। আশির দশকে দু-চারজন আলোকিত মহিলার দেখা পাওয়া যেত। যেমন_ সত্তরের দিকে একজন মহিলা মন্ত্রী, আশির দশকে কিছু যুগ্ম-সচিব, উপসচিব দেখা গেছে। কিন্তু বলতে গেলে জজ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে মহিলাদের পরিচিতিই ছিল না। দ্রুত পরিবর্তন দেখা গেল। বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে মেধার ভিত্তিতে উচ্চতরো প্রশাসনিক দপ্তরে স্থান করে নিল মেয়েরা। হিসাব মতে ওরা যুদ্ধোত্তর স্বাধীন দেশের একটু আগের বা সামান্য পরের প্রজন্ম। আদালতপাড়ায় মহিলা আইনজীবীদের সংখ্যা এখন প্রশংসা করার মতো। প্রশাসনিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে প্রজ্ঞা ও সাহসের সঙ্গে পুরুষ কর্মীদের সঙ্গে সহাবস্থানের স্থান করে নিয়েছে মহিলারা। নারীর এ পর্যায়ের উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন প্রক্রিয়া এখন আয়ত্ত বেগবান।
সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে আগে মেয়েরা তেমনভাবে সম্পৃক্ত হতে পারত না। মহিলা নাট্যশিল্পীর কথা তো ভাবতেই পারিনি আমাদের কালে। ওই সেই ঘেঁটুপুত্রের মতো ছেলেরা মেয়ে সেজে কাজ উদ্ধার করত। এখন রীতিমতো প্রশিক্ষণ নিয়ে মহিলারা নাটক-সিনেমায় অংশ নেয়াসহ পরিচালনা ও প্রডাকশনে নেতৃত্ব দিচ্ছে। মডেল জগতের কথাও একই রকম। এরপর ৫১ পৃষ্ঠায়
শিক্ষিত ভদ্র ঘরের মেয়েরা নাটক-সিনেমা বা মডেলিং করবে, এটা ছিল চিন্তার ঊধর্ে্ব। সব সংস্কার তথা সামাজিক ট্যাবু ভেঙেছে প্রতিভাবান সংস্কৃতিমনা মেয়েরাই। আর স্বাধীনতার আগে নাচ-গানের চর্চা ছিল খুবই সীমিত। খুব সখ করে কেউ নাচ-গান শেখার সুযোগ পেলেও বাইরের জগতে তার প্রকাশ ঘটতে দেয়া হতো না। আসলে মানুষের মধ্যে সুকুমার ললিত চারু ও কারুকলার বীজ থাকে জন্মগতভাবে। কারো কম। কারো বেশি। সেগুলোর লালন ও বিকাশ ঘটত না পরিবেশ প্রথাগত মূল্যহীন মূল্যবোধজনিত চর্চার অভাবে। স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্ত উদার আকাশের ছায়ায় জীবনাচার বদলে গেল প্রাণসত্তাগুলোর। আমরাই তো দেখলাম, জীবনের গোলাপ কলিগুলো বিকশিত হলো কী গভীর আশ্বাসে। এমনকি রেডিও, টেলিভিশনেও সংবাদ পাঠ, ঘোষণা, উপস্থাপনা, পরিচালনা ও সাংবাদিকতায় দেখা গেল গুণী মেয়েদের শক্তিশালী পদচারণা। সাংস্কৃতিক উন্নয়ন এবং ক্ষমতায়নের সবল চর্চা দুহাতে সরিয়ে দিয়েছে সুকুমার জীবনচর্চার রুদ্ধ দুয়ার। উচ্চশিক্ষার জন্য মেয়েরা, তা সে বিবাহিত বা অবিবাহিত হোক, বিদেশে যাবে, তা ছিলো অষ্টম আশ্চর্যের মতো তথ্য। সেখানেও পাহাড় ভেঙেছে মেয়েরা। উন্নত দেশগুলোয় মেয়েরা এখন দলে দলে উচ্চশিক্ষা নিতে যাচ্ছে। মেধারও স্বাক্ষর রাখছে তারা। তবে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যে কিছু ঘটে না, তা বলা যাবে না। কিন্তু অনেক অনেক ভালো কিছুর আনুপাতিক হারে তার সংখ্যা নগণ্য। দেশের শিক্ষা-মান নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেন। তারপরও স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে উপচেপড়া ছাত্রছাত্রী পড়ছে। বাণিজ্যকে ডিঙিয়ে এক্সেলেন্সও অর্জন করছে অনেকে। এমন অর্জনের কথাও তো বলতে হবে।
বাণিজ্যিকভাবে শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় বহু মহিলা এখন দাপট ও যোগ্যতার সঙ্গে কাজ করছে। গড়ে উঠেছে প্রশংসনীয় এন্টারপ্রেনিওরশিপ। মহিলা ব্যবসায়ী উদ্যোক্তাদের কর্মকা-কে আরো সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার জন্য তারা শুধু মহিলাদেরই জন্য প্রতিষ্ঠিত করেছে ‘মহিলা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ’। অনেক ব্যবসায়ী মহিলা এখন সিআইপির (কমার্শিয়ালি ইমপর্ট্যান্ট পার্সন) মর্যাদা অর্জন করেছে। তাদের কাছেই শুনেছি, স্বাধীন দেশ না হলে কাজের এমন অবাধ পরিবেশ পাওয়া যেত না এবং এমন চৌকষভাবে মহিলা ব্যবসায়ীরা মাথা তুলতেও পারত না। বড় বড় প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বেও মহিলারা প্রশংসার্হ মেধা এবং পেশাগত দক্ষতার স্বাক্ষর রাখছে। মোকাবেলা করছে নানা রকম প্রবল প্রতিকূলতায়। নতুন প্রজন্মের মেয়েদের জন্য এগুলো প্রেরণার উৎস অবশ্যই।
সাহিত্যচর্চা এবং প্রকাশনার ক্ষেত্রে মহিলাদের অর্জনকে আর খাটো করে দেখার উপায় নেই। মনে আছে, পঞ্চাশের দশকে হাতেগোনা গুটি কয়েক মহিলা ভীরুপায়ে লেখালেখি করত। গ্রন্থ প্রকাশের সংখ্যাও তেমন ছিল না। ষাটের দশকেই মহিলা লেখকদের সংখ্যা বেড়েছিল। আশি এবং নব্বই দশকে সেই সংখ্যা আরো অনেক বেড়েছিল। সাহিত্যে তখন মুক্তিযুদ্ধকে পটভূমি করে অনেকে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছিল গল্প উপন্যাস এবং কবিতার মাধ্যমে। একবিংশ শতকের প্রথম দশকে মহিলা লেখকের সংখ্যাই শুধু বাড়েনি, গ্রন্থ প্রকাশনায় সংখ্যার দিক থেকে তা দুকূল প্লাবী বন্যার মতো উপচে উঠল। একুশের বইমেলায় তার প্রমাণ যে প্রত্যক্ষ করেছে, সে-ই স্বীকার করবে কথাগুলো। অনেকেই, বিশেষ করে নতুন মহিলা লেখকরা, শাড়ি-গয়না কেনার চেয়ে একটা বই প্রকাশকে মূল্য দিয়েছে বেশি। অর্থাৎ বস্তুগত জগতের স্থূল সুখের চেয়ে বুদ্ধি ও মেধার প্রকাশেই তারা সুখী হয়েছে। এমন মানসিক এবং বৌদ্ধিক ঔৎকর্ষকে সমাদর না জানিয়ে উপায় থাকে না। এ ক্ষেত্রে লেখালেখির গুণগতমান নিয়ে কেউ যে নেতিবাচক কথা বলেনি, তা নয়। তবে আমার বিচারে উন্নয়ন এবং সমৃদ্ধির পথে কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি থাকেই। নতুন লেখকদের ব্যাপারে আমি তাই একশো ভাগ ইতিবাচক মন পোষণ করি।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো রাজনৈতিক অঙ্গনে মহিলাদের আপসহীন সংগ্রাম। ষোল কোটি লোকের এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে এখন প্রধান নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী হলেন মহিলা। প্রধান বিরোধী দলের নেত্রীও হলেন মহিলা। সংসদে এখন নির্বাচিত এবং মনোনীত মহিলা সদস্যের সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশজন। বর্তমান উপজেলা নির্বাচনে বহু মহিলা অংশ নিয়েছে। পুরুষ প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় তাদের সংখ্যার আনুপাতিক হারও ঈর্ষণীয়। ঘুণে ধরা ন্যুব্জ দেহ নারীসমাজের কাছে তো বটেই। সহিংস এবং দাঙ্গাবাজি পরিবেশে নির্বাচনে অংশ নিয়ে এবং জয়লাভ করে তারা সত্যি সত্যি খুব সাহস এবং সুদৃঢ় প্রত্যয়ের পরিচয় দিয়েছে।
স্বাধীন দেশের নারীসমাজ তাদের অগ্রগতির জন্য রীতিমতো গর্ব করতে পারে। সত্যি যে, অনেক কিছুই এখনো আমাদের অধরা এবং অ-পাওয়া আছে। সেসব প্রাপ্তির জন্য বিলাপ না করে আরো কঠোর শ্রম দিতে হবে। যৌতুক নিরোধ নারী নির্যাতন এবং বাল্যবিয়ে রোধে এখন সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন জোরদার হচ্ছে নারীদের ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততায়। তারপরও অাঁধার দেখা যায় যেসব কারণে, সেগুলো নির্মূল করতে হবে বুদ্ধি, যুক্তি, বিবেচনা, ধৈর্য ও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রতি আন্তরিক কল্যাণকর কাজের মাধ্যমে।
ঝগড়া, হানাহানি, ক্ষমতার লোভ এবং সৎজীবন চর্চার অভাব থাকলে পথচলা কঠিন হবে। মহিলা, মানে মা বোন ও নেতাকর্মীদের মনে রাখতে হবে, মহিলারা মূলত মায়ের জাত। জননীর অন্তর্গত গুণাবলিকে লালন ও কর্ষণ করতে হবে। শুধু উচ্চশিক্ষা, রাজনীতি বা অর্থনীতি কিন্তু জীবনকে সুন্দর করতে পারবে না। থাকতে হবে নির্মোহ মানবতা। শীর্ষে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে মহীয়ান মানবিক জীবন। স্বাধীন দেশের শ্রেষ্ঠ অর্জন এটাই।