কৃষিকাজে পুরুষকে ছাড়িয়েছে নারী

এক দশক আগেও দেশের কৃষিতে নারী শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৩৮ লাখ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ১ কোটি ৫ লাখ নারী কৃষির সঙ্গে যুক্ত। এ খাতে প্রতি বছর নারী শ্রমিক বেড়েছে ১৭ শতাংশ হারে। বিপরীতে ৩ শতাংশ হারে কমেছে পুরুষ শ্রমিকের সংখ্যা। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে দেশের কৃষি শ্রমিকের ৬৪ শতাংশই নারী। সম্প্রতি জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে আসে।

গত এক দশকে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তনটি এসেছে তা হলো, কৃষিতে নারী নেতৃত্ব। এ সময় কৃষি খাতে পুরুষ শ্রমিকের সংখ্যা যেমন কমেছে, তার চেয়েও বেশি বেড়েছে নারীর অংশগ্রহণ। সুযোগ তৈরির পাশাপাশি কৃষির বিভিন্ন পর্যায়ে শ্রমবিভাজন নারী শ্রমিকের চাহিদা বাড়িয়ে চলেছে দিন দিন। তুলনামূলক কম ভারী কাজ, বিশেষ করে ফসল বা খাদ্যশস্য কাটার পর এর বাছাই ও প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় নারীদের। অপেক্ষাকৃত বেশি সময় ধরে চলা কাজ, ফসলের ক্ষেত তদারকির কাজেও নারীর চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। সেচকাজের মাধ্যমেও স্বাবলম্বী হচ্ছেন নারী। তাছাড়া চাতাল শ্রমিকের সিংহভাগই এখন নারী।

যশোর সদরের চুড়ামনকাঠি উত্তরপাড়া গ্রামের মরিয়ম। এবারের শীত মৌসুমে পাঁচ বিঘা জমিতে মুলা ও দুই বিঘা জমিতে শিমের আবাদ করেছেন। জমি প্রস্তুত, ক্ষেতের পরিচর্যা থেকে শুরু করে সবজি তোলার আগ পর্যন্ত সব কাজ করছেন তিনি। শুধু বাজারে গিয়ে সবজি বিক্রির কাজটা করেছেন তার স্বামী। এভাবে স্বামীকে অন্য কাজে নিয়োজিত করে নিজের কাঁধেই সবজি আবাদের দায়িত্ব তুলে নিয়েছেন মরিয়ম। শুধু তিনি নন, কৃষির বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করে অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন একই গ্রামের খাদিজা বেগম, কাকলী বেগম কিংবা বাঘারপাড়ার মহিরণ গ্রামের সুখী বেগমসহ অসংখ্য নারী। আর কৃষিতে নারীদের এ ভূমিকা বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশকে দিয়েছে বিশেষ অবস্থান।

সম্প্রতি এফএওর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণের দিক দিয়ে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। দেশে এ খাতে শ্রমিকের প্রায় ৬৪ শতাংশই নারী। ‘এফএও স্ট্যাটিসটিক্যাল ইয়ারবুক-২০১৪’-এর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানে সর্বোচ্চ ৬৫ শতাংশ নারী কৃষিতে নিয়োজিত। এক্ষেত্রে শীর্ষ পাঁচের অন্য দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের পরই রয়েছে ভুটান, ভারত ও কম্বোডিয়া। এছাড়া ভিয়েতনাম ষষ্ঠ, ইন্দোনেশিয়া সপ্তম, শ্রীলংকা অষ্টম, থাইল্যান্ড নবম ও কম্বোডিয়া দশম স্থানে রয়েছে। শীর্ষ চারটি দেশের কৃষি খাতে নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ এখন ৬০ শতাংশের ওপর।

কৃষি খাতে নারীর এ অংশগ্রহণকে গুরুত্বসহকারেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে এশিয়ান সোসাইটি অব এগ্রিকালচারাল ইকোনমিস্টসের (এএসএই) সভাপতি ও ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালকের উপদেষ্টা ড. মাহবুব হোসেন বলেন, আগে নারীরা ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে বেশি নিয়োজিত থাকলেও এখন তা কৃষি খাতে স্থানান্তর হচ্ছে। আবার বেশির ভাগ পুরুষ অকৃষিকাজে নিয়োজিত হচ্ছেন কিংবা গ্রাম ছেড়ে পাড়ি জমাচ্ছেন শহরে অথবা বিদেশে। এ অবস্থায় কৃষিতে পুরুষ শ্রমিকের সংকট কাটাতে নারীরাই হাল ধরছেন। তবে কৃষিকাজে নারীর শুধু অংশগ্রহণ বাড়ানোয় যথেষ্ট নয়। তাদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আরো বেশি তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা প্রদান করতে হবে। তেমনি উত্পাদনশীলতা বাড়াতে সরকারি সুযোগ-সুবিধা এবং মজুরিবৈষম্য কমিয়ে আনতে হবে।

ব্র্যাকের এক গবেষণা বলছে, গত পাঁচ বছরে নারী শ্রমিক বেড়েছে ২০ শতাংশের বেশি হারে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোয় কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম। তবে উত্তরবঙ্গের বেশ কয়েকটি জেলা বিশেষ করে রংপুর, পঞ্চগড়, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধায় নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ দ্রুতহারে বাড়ছে। তাদের এ খাতে অংশগ্রহণ বাড়ছে নানা প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করেই। একদিকে যেমন তারা মজুরিবৈষম্যের স্বীকার, তেমনি বঞ্চিত হচ্ছেন সরকারি সহায়তা প্রাপ্তি থেকে। শর্তের বেড়াজালে কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড (এআইএসি) পাচ্ছেন না নারীরা।

এ বিষয়ে উন্নয়ন বিকল্পের নীতিনির্ধারণী গবেষণার (উবিনীগ) নির্বাহী পরিচালক ফরিদা আখতার বলেন, বাংলাদেশের কৃষক বলতে এখনো পুরুষদেরই বোঝানো হচ্ছে। অথচ দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি কৃষি খাতের হাল নারীরা ধরলেও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিও দেয়া হচ্ছে না। এটি খুবই পরিতাপের বিষয়।

কৃষিকাজে নিয়োজিত নারীদের এখনো একটি বড় অংশ দরিদ্র এবং প্রয়োজনের তাগিদ নিয়েই কাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, এ খাতে সরকারি সহায়তা এবং এমন কোনো প্রযুক্তি নিয়ে আসা উচিত হবে না, যা তাদের ক্ষতিগ্রস্ত বা নিরুত্সাহিত করে!

অনেকটা একই সুরে কথা বলেছেন পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নয়াপাড়া গ্রামের নারী কৃষক ও সংগঠক মর্জিনা। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘সংসারের কাজের পাশাপাশি এখন ঘরের বাইরে কাজ করছি পুরুষের প্রায় সমানতালে। কাজের ক্ষমতা অনুসারে কিছুটা বৈষম্য মেনে নেয়া যেতে পারে। তাই বলে ১০০ টাকার তফাত থাকতে পারে না। নারী কৃষকদের এখনো সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে না। নারী কৃষকদের নিরাপত্তা ও উত্সাহমূলক কার্যক্রম না নিলে তাদের এ খাতে ধরে রাখা যাবে না।’

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আরডিআরএসের ২০১৩ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, উত্তরবঙ্গের ছয়টি জেলায় পুরুষের মজুরি প্রতিদিন গড়ে ২৩৯ টাকা; অন্যদিকে নারীদের মাত্র ১৯৪ টাকা। তবে সবচেয়ে বেশি মজুরিবৈষম্য পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলায়। সামনের দিনে এ খাতে নারী শ্রমিককে স্থায়ীভাবে ধরে রাখতে হলে অবশ্যই এ ধরনের বৈষম্য কমিয়ে আনতে হবে।

এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও গ্রামীণ জীবনযাত্রার স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের জন্য প্রচারাভিযানের (সিএসআরএল) সাধারণ সম্পাদক শরমিন্দ নীলোর্মি জানান, উচ্চ মজুরিবৈষম্য অর্থনীতির জন্য মঙ্গলজনক নয়। তাই মজুরির একটি নির্দিষ্ট হার নির্ধারণ যেমন জরুরি, তেমনি তাদের পুরুষদের মতো সুযোগ-সুবিধা প্রদান করতে হবে। সেক্ষেত্রে কারখানা বা তৈরি পোশাক খাতের মতো প্রতিযোগিতামূলক মজুরি প্রদান এবং তাদের কাজকে সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেয়ার সুপারিশ করেন তিনি।