গোলপাতার গুড়

নোনাজলে জন্ম, নোনা সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। অথচ এর ডগা (ডাণ্ডি) থেকে বেরিয়ে আসছে মিষ্টি রস। সেই রস দিয়ে তৈরি হচ্ছে গুড় (মিঠা)। সুস্বাদু এই গুড়ের চাহিদাও রয়েছে ব্যাপক। মুখে নিলেই অভিজ্ঞরা বুঝতে পারেন এর স্বাদের ভিন্নতা। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার চারটি ইউনিয়নের অন্তত ৩০টি পরিবার কয়েক বছর ধরে এই গুড় তৈরি করছে। এখানে গোলপাতার চাষও করা হয়।

কলাপাড়া-কুয়াকাটা সড়কটি নীলগঞ্জ ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে বরাবর চলে গেছে বঙ্গোপসাগরের সৈকতের দিকে। সড়কটি ধরে দক্ষিণে চলতেই রাস্তার ধারে একাধিক স্থানে চোখে পড়ে গোলপাতা গাছের বহর (বাগান)। এমন একটি বহর থেকে রস সংগ্রহ করছেন নীলগঞ্জের ঘুটাবাছা গ্রামের হাবিবুর রহমান আকন। সকাল-বিকেল দুই বেলা চলে তাঁর গোলপাতা গাছের ডগা কাটার কাজ। আলাপচারিতার সময় হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আমি বিভিন্ন মাছের রেণু থেকে পোনা উৎপাদন কারে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বিক্রি করে সংসার চালাতাম। এই ব্যবসা বর্ষাকালীন হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে ঘরে বসে আমানতের টাকা খরচ করে সংসার পরিচালনা করতে হতো। এ বছর থেকে আমার চাচা আ. গণি আকনের কাছ থেকে ঘুটাবাছা খালের পাড়ে জন্ম নেওয়া তাঁর এক একর জমির গোলবাগান বর্গা নিয়েছি। আমি ও আমার স্ত্রী জাহানারা বেগম দুজনে মিলে দিনরাত পরিশ্রম করে বাগানের ৭০টি গোলের ডাণ্ডা থেকে প্রতিদিন প্রায় তিন কলস রস দিয়ে প্রায় পাঁচ কেজি গুড় তৈরি করছি। এগুলো কলাপাড়া বাজারে ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করে চলে আমাদের সংসার। তবে আশা করছি, এ বছর প্রায় এক লাখ টাকা আয় হবে গুড় বিক্রি করে।’

নবীপুর গ্রামের গোলবহরে গেলে বহর মালিক নিখিল চন্দ্র হাওলাদার জানান, আষাঢ় মাসে গোল গাছের ডাণ্ডিতে গাবনা ফল হয়। পৌষ মাসে ফলসহ মাটিচাপা দিয়ে ডাণ্ডি নুয়ে দেওয়া হয়। অগ্রহায়ণ মাসে ডাণ্ডিটি মানুষের পায়ের আলতো লাথি দিয়ে দক্ষতার সঙ্গে রসে ভার করার জন্য দোয়ানো হয়। ১৫ দিন এভাবে দোয়ানোয় পর গাবনা ছড়ার আগাছা পরিষ্কার করে ডগার মাথা থেকে গাবনা ফলের থোকা ধারালো দা দিয়ে এক কোপে কেটে ফেলা হয়। এরপর ডাণ্ডির কাটা অংশ তিন দিন শুকিয়ে নেওয়ার পর সকাল-বিকেল দুইবেলা পাতলা করে (একসুত পরিমাণ) কেটে ফেলা হয়। এভাবে চলে আরো ১৫ দিন। এরপর প্রতিদিন বিকেলে একবেলা ডাণ্ডার মাথা দিয়ে কিঞ্চিত অংশ কেটে রশির সঙ্গে একটি ছোট্ট হাঁড়ি বেঁধে রাখা হয়। পরদিন খুব ভোরে রস সংগ্রহ করা হয়। প্রতি বছর পৌষ থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত চলে রস সংগ্রহ করা। প্রতিটি ডাণ্ডি থেকে ২৫০-৫০০ গ্রাম পর্যন্ত রস পাওয়া যায়। এ বছর তাঁরা এক একর জমির বাগানের ১৫০টি ডাণ্ডি থেকে প্রতিদিন রস সংগ্রহ করছেন চার কলসি। প্রতি কলসিতে রস ধারণক্ষমতা ২৫ থেকে ৩০ লিটার। এভাবে প্রতিদিন ১০০ লিটার রস সংগ্রহ করেন। তরল রস আগুনে জ্বাল দিয়ে প্রতি কলসিতে প্রায় সাড়ে তিন কেজি গুড় উৎপাদন করা হয়। এ ছাড়া গাছের তিন-চার ফুট লম্বা পাতা দিয়ে তৈরি হয় ঘরের ছাউনি। ১০০ পিস ছাউনি বিক্রি করা হয় ৬০০ টাকায়। প্রায় ১০ থেকে ২০ ফুট লম্বা ডাণ্ডাসহ গোলপাতা ৮০ পিস বিক্রি করা হয় ৪০০ টাকায়। আরেক গোলবহরের মালিক বিপুল হাওলাদারের স্ত্রী কল্পনা রানী হাওলাদার বলেন, ‘লাকড়ি হিসেবে গোলপাতা বাগানের মরে যাওয়া মুথা (ডাটা) ব্যবহার করা হয়। এই মুথা দিয়ে পুরো বছর ধরে চলে রসসহ আমাদের সংসারের রান্নার কাজ।’

গোল গাছের গুড় বিক্রির জন্য চলছে প্রস্তুতি।

বেশি লাভ

গোলবহরের মালিক নিঠুর চন্দ্র বলেন, ‘গোলবাগান থেকে যে লাভ হয় তা সরল জমিতে ধানচাষ করে হয় না। এক একর জমিতে ধান পেতাম সর্বোচ্চ ২৫ মণ। ৭০০ টাকা মণ দরে বাজারে ধান বিক্রি করে প্রতি বছর সাড়ে ১৭ হাজার টাকা আয় হতো। কিন্তু ওই জমিতে সৃষ্টি হওয়া গোলগাছের বাগান দিয়ে প্রতি বছর আমার আয় হয় প্রায় এক লাখ টাকা। এভাবে সাড়ে তিন মাস রস দিয়ে গুড় তৈরি করি। শুধু গুড় দিয়ে প্রায় এক লাখ টাকা আয় হয়। গোলপাতা দিয়ে আরো ২০ হাজার টাকা আয় হয়। কলাপাড়া পৌর শহরে বিক্রি হয়। আমার দাদা বিদ্যানন্দ হাওলাদারের যুগ থেকে রস সংগ্রহ করে আসছি। তবে সরকারি উদ্যোগে আন্ধারমানিক নদের তীরে জেগেওঠা চরে গোলগাছ রোপণ করার সুযোগ করে দেওয়া হলে প্রচুর অর্থ আয় হতো বন বিভাগের। রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচর্যার জন্য আমাদেরও অর্থ আয় হতো। নিজ উদ্যোগে নদীর চরে গোলবাগান করার চেষ্টা করা হলেও স্থানীয় প্রভাবশালীদের গরু-মহিষের অত্যাচারে তা নষ্ট অইয়া যায়।’

গোলপাতার রস খাওয়ার উপকারিতা বিষয়ে কলাপাড়ার ভেষজ চিকিৎসায় অভিজ্ঞ তরণী রঞ্জন হাওলাদার বলেন, ‘গোলের রস খেলে পেটের কৃমি দমন হয়। মানুষের শরীরের পানিশূন্যতা দূর করে, কর্মক্ষমতা বাড়ায়। আখের রসে শর্করা থাকে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। গোলগাছের রসে শর্করা থাকে ১৪ থেকে ১৮ শতাংশ।’

উপজেলা বন কর্মকর্তা মো. বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ, মিঠাগঞ্জ, চাকমাইয়া, টিয়াখালীসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে কমপক্ষে ৩০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বেড়িবাঁধের খাদায় কিংবা খালের তীরে গোলবহর রয়েছে। ১৯৬০ থেকে ১৯৮০ সালের দিকে বন বিভাগের উদ্যোগে প্রথমে সুন্দরবন থেকে গোলবহরের বীজ (গাবনা) সংগ্রহ করে রোপণ করে বাগান তৈরি করা হয়। এরপর থেকে স্থানীয়রাও নিজ উদ্যোগে কৃষি জমির অভ্যন্তরের খালের তীরে গাবনা রোপণ করে বাগান তৈরি করেন। কলাপাড়াসহ উপকূলীয় এলাকায় গোলগাছের গুড়ের চাহিদা রয়েছে অনেক। এটি এ অঞ্চলের জনপ্রিয় একটি খাবার হিসেবে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি গোলগাছ পাতাসহ উচ্চতা হয় ১২ থেকে ১৫ ফুট পর্যন্ত। এর ফুল হয় হলুদ এবং লাল। ফুল থেকে গাবনা পরিপক্ব হলে সেটি তালগাছের আঁটির মতো কেটে শাস খাওয়া যায়। এ গাছ নোনাজলে জন্মায় এবং সুস্বাদু গাবনা দিয়ে গাছ গজায়।’

থানা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আবদুর রহিম বলেন, ‘আমি গোলপাতার গুড় খেয়েছি। এটা বেশ সুস্বাদু।’ পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যান তত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘বাংলায় পরিচিত গোলপাতার ইংরেজি নাম Nypa palm এবং বৈজ্ঞানিক নাম fruticans, family-palmae। গোলগাছের গুড় ও রসে নানা গুণ আছে। সরকারি উদ্যোগে নোনা অধ্যুষিত দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন নদীর তীর ও খালের চরে গোলগাছের বাগান তৈরি করা হলে প্রচুর রাজস্ব আয় হতো।’