হুমায়ুনের রুটি মেকার

মিনিটে ১২ থেকে ১৫টি রুটি বানাতে সক্ষম এমন একটি যন্ত্র বানিয়ে দেশে-বিদেশে সাড়া ফেলেছেন মাগুরার শালিখা উপজেলার বুনাগাতি গ্রামের হুমায়ুন কবির। বাজারে পাওয়া নামিদামি রুটি মেকারের চেয়ে এটি একেবারেই ভিন্ন হওয়ায় স্বল্প সময়ে এটির চাহিদা বেড়েছে ব্যাপকভাবে। আর ব্যতিক্রমী এ কাজের স্বীকৃতি দেশ-বিদেশে তাকে এনে দিয়েছে অন্যরকম সুখ্যাতি ও পরিচিতি। অনেকেই তাকে চেনেন রুটি মেকার হুমায়ুন বলে।

 


হুমায়ুন জানান, ১৯৮৬ সালের কথা। বাবার পুলিশ চাকরির সুবাদে হুমায়ুন কবির তখন মেহেরপুরে সরকারি বালক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণীতে অধ্যয়নরত। সরকারি রেশনে নিয়মিতভাবে আটা পাওয়ায় মেহেরপুরের বাসায় রুটিই ছিল সকালের নাশতার প্রধান খাবার। যেটি তৈরি করতেন তার মা। একদিন মা অসুস্থ হয়ে পড়ায় সকালের নাশতা তৈরি নিয়ে বিপাকে পড়েন পরিবারের সবাই। সে সময় বাবা হুমায়ুন প্রচলিত পিঁড়ি-বেলুনে নিজে রুটি তৈরির চেষ্টা করেন। কিন্তু রুটির আকার একদিকে যেমন এবড়োত্থেবড়ো হলো, অন্যদিকে সময়ও লাগল দ্বিগুণ। পরের দিন সময় বাঁচাতে হুমায়ুন আটার গোলায় তেল মিশিয়ে একটি পিঁড়ির ওপর রেখে আরেকটি পিঁড়ি দিয়ে চাপ দিলেন। সেদিন রুটি হলো বটে, তবে ছিঁড়ে গেল। এই রুটি বানানোর চেষ্টা সেদিন কিশোর মনে সুপ্ত হয়ে থাকে। যেটির পুনরাবৃত্তি হলো হুমায়ুন কবিরের ব্যক্তিগত জীবনে ২০১১ সালে। স্ত্রী অসুস্থ হওয়ায় ঢাকার বাসায় সকালের নাশতায় রুটি বানাতে আবারও বিপাকে পড়লেন তিনি। স্কুল জীবনের সেই অভিজ্ঞতা আবারও কাজে লাগানোর চেষ্টা করলেন; কিন্তু ফল একই। এবার ছুটলেন বাজারে। ঢাকার নিউমার্কেটসহ নামিদামি শো-রুম থেকে সংগ্রহ করলেন নানা ডিজাইনের রুটি মেকার। মেকারের সঙ্গে দেওয়া নির্দেশিকা পড়ে রুটি বানাতে সফল হলেন বটে; কিন্তু খটকা থেকে গেল একখানে। সেটি হচ্ছে, এটি একদিকে যেমন বিদ্যুৎনির্ভর অন্যদিকে বেশ জটিল। এ ছাড়া এটিতে শুধু কাঁচা আটার রুটি হয়। সিদ্ধ আটা ও অন্য ধরনের রুটিসহ ফুচকা, লুচির আকারে বানানো সম্ভব নয়। অন্যদিকে রুটির স্বাদ যায় বদলে। এবার শুরু হলো গবেষণা। হুমায়ুন কবির চাইছিলেন এমন একটি রুটি মেকার, যেটিতে সব ধরনের রুটি বানানো যাবে সহজ ও স্বল্প সময়ে। প্রথমে কয়েকজন কাঠমিস্ত্রির সহযোগিতা নেন তিনি। তার দেখা ডিজাইনে তারা মোটামুটি একটি রুটি মেকার বানিয়ে দিলেন। যেখানে রুটি হলো কিন্তু পুরোপুরি গোলাকার হলো না। এ ছাড়া সময় লাগল বেশ। এবার নতুন গবেষণা। গুগলসহ বিভিন্ন সাইট থেকে তথ্য-উপাত্ত নিয়ে রুটি মেকারে সংযোজন করলেন স্বাস্থ্যসম্মত পিচ্ছিল এক ধরনের পেপার। যেটি দেখতে অনেকটা পলিথিনের মতো। এ পিচ্ছিল পেপার সংযোজনের সঙ্গে সঙ্গে পুরো অবস্থা গেল পাল্টে। ঠিক হুমায়ুন যেভাবে চাইলেন সেভাবেই তৈরি হলো রুটি। হুমায়ুন কবিরের ৩ বছরের গবেষণার এ সফলতাই পরবর্তী সময়ে তাকে উদ্যোগী করল এটির বাণিজ্যিক উৎপাদনে।
গত বছর থেকে নিজ গ্রামের বাড়ি মাগুরা সদর উপজেলার বুনাগাতিতে নিজ উদ্ভাবিত রুটি মেকারের কারখানা চালু করেছেন হুমায়ুন কবির। মাগুরা জেলা সদর থেকে এলাকাটির দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার। সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, এখানে কাঠ মিস্ত্রিসহ মোট ১৭ কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিরলস পরিশ্রমে প্রতিদিন ৮ থেকে ১০টি রুটি মেকার তৈরি করছেন, যার মূল উপকরণ কাঠ। সহযোগী উপকরণ হিসেবে আছে কিছু হার্ডওয়্যার সামগ্রী ও পলি পেপার। প্রথমে বিভিন্ন ধরনের কাঠ ৭ ইঞ্চি পুরুত্ব রেখে ২০ ইঞ্চি দৈর্ঘ্য ও ৮ ইঞ্চি প্রস্থের সাইজে কাটা হচ্ছে। তারপর এটি মসৃণ করে মুখোমুখি অবস্থানে কব্জা দিয়ে আটকানো হচ্ছে। পরে হাতল বসিয়ে একটি নির্দিষ্ট ডিজাইনে আনা হচ্ছে। উপরে-নিচে মুখোমুখি বসানো কাঠ দুটি এই মেকারের মূল অংশ। এটির মাঝখানেই আটার গোলা রেখে রুটির আকার আসবে। এটি অনেকটা একটি পিঁড়ির ওপর আরেকটি পিঁড়ি বসানোর মতোই। কাঠের গোটা কাজ শেষ হলে এটিতে রঙ করে শুকানো হচ্ছে। সব শেষে পাটাতনের মতো দেখতে মূল অংশের মাঝখানে পলি পেপার পেস্ট করে শেষ হচ্ছে রুটি মেকারের মূল কাজ। দামের পার্থক্য আনতে পাটাতনের কাঠের সাইজ বদল করে রুটি মেকারকে ছোট-বড় সাইজে আনা হচ্ছে। গ্রামের বাড়ির এ কারখানা এবং এখানে উৎপাদিত মেকার বিপণনের জন্য ঢাকায় খোলা হয়েছে একটি প্রধান কার্যালয়। দুটো অফিসই নিয়ন্ত্রণ করেন হুমায়ুন কবীর নিজে।
হুমায়ুন কবিরের রুটি মেকার বিক্রি হচ্ছে ৪টি পৃথক দামে। সবচেয়ে ছোট আকারের রুটি মেকারের দাম ৩ হাজার ৮৫০ টাকা। পরবর্তীগুলো যথাক্রমে ৪৬৫০, ৫৫০০ ও ৮০০০ টাকা। বাসা-বাড়ির জন্য তৈরি প্রথম ৩ প্রকার রুটি মেকারের সঙ্গে সর্বনিম্ন ৩ বছর থেকে সর্বোচ্চ ৫ বছর ব্যবহার উপযোগী পেপার যেটি ১৫ দিন অন্তর বদলের প্রয়াজন হয় সেটি সরবরাহ করা হয়। খাবার হোটেলের জন্য উপযোগী আকারে অনেক বড় সর্বশেষ সাইজের রুটি মেকার যেটির মূল্য ৮ হাজার টাকা সেটির সঙ্গে ১ বছরের প্রয়োজনীয় পেপার সরবরাহ করা হয়। বাজারে পাওয়া অন্য রুটি মেকারের দাম এগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। হুমায়ুন কবীর জানান, যেহেতু হোটেলে প্রচুর রুটি বানানোর প্রয়োজন হয় ও এ ধরনের রুটি মেকার আকারে অনেক বড়। সে ক্ষেত্রে অনেক পেপার প্রয়োজন হওয়ায় মেকারের সঙ্গে সরবরাহকৃত ৩০০ থেকে ৫০০ স্কয়ার ফিট পেপার ১ বছরের মধ্যেই ফুরিয়ে যাবে। বাসা-বাড়িতে যা অনেক বছর চলবে। তিনি জানান, তার কাছে রুটি পেপার হিসেবে পরিচিত এ পেপারই রুটি মেকারের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উপকরণ। এটির মাধম্যেই রুটি যথাযথ আকার পায়। এটি অত্যন্ত ভালো মানের হওয়ায় স্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি হয় না। এটি পলিথিনের মতো দেখতে কিন্তু পলিথিন নয়। অনেক গবেষণা করে তিনি এটি খুঁজে পেয়েছেন, যা সরাসরি জাপান থেকে সংগৃহীত হয়। এটি তাদের মাধ্যমে খুব সহজে যে কোনো গ্রহীতা সংগ্রহ করতে পারবেন বিধায় এটি নিয়ে কোনো জটিলতা নেই। হুমায়ুন কবির তার একমাত্র সন্তান ছোট্ট শিশুকন্যার নামে এ রুটি মেকারের নাম দিয়েছেন ‘লাইবা’ রুটি মেকার। বর্তমানে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে এটি পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া আমেরিকা, ইংল্যান্ড, দুবাই, ভিয়েতনাম, কানাডাসহ বেশকিছু দেশে এটির চাহিদা তৈরি হয়েছে। এসব দেশে বেশকিছু মেকার ইতিমধ্যে সরবরাহ করা হয়েছে ও ব্যাপক সাড়া মিলেছে।
হুমায়ুন কবির মনে করেন এ ধরনের রুটি মেকার অদ্বিতীয়। বাজারে পাওয়া রুটি মেকারে শুধু কাঁচা আটার রুটি হয়। এই রুটি মেকারে সিদ্ধ ও কাঁচা উভয় আটার রুটি হয়। এ ছাড়া ফুচকা, লুচি, মাস কলাই গুঁড়ার রুটি, চালের রুটি, গার্লিক রুটি, কালিজিরা রুটি, দিলি্লকা রুটি, গোবি পরাটা, ভেজিটেবল টোস্টসহ বিভিন্ন ধরনের কমপক্ষে ৫০ প্রকার রুটি ও আটা ময়দা জাত গোলাকার কিংবা অন্য আকারের খাবার তৈরি করা যায়। যা অন্য রুটি মেকারে সম্ভব নয়। এটি প্রাকৃতিক ও ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে তৈরি হওয়ায় এখানে তৈরি রুটি পরবর্তী সময়ে আগুনে সেঁক দেওয়ার পর স্বাদ অপরিবর্তিত থাকে, যা ইলেকট্রিক মেকারের ক্ষেত্রে ঘটে না। বরং সেটি বিদ্যুৎ নির্ভর হওয়ায় ব্যয়বহুল। হুমায়ুন কবিরের এই মেকারে প্রতি মিনিটে ৭ ইঞ্চি ও ১১ ইঞ্চি বর্গাকৃতির সাধারণ সাইজের রুটি হয় ১২ থেকে ১৫টি। আকারে ছোট হলে যা আরও বেশি। হুমায়ুনের এ রুটি মেকার তৈরিকে এলাকাবাসী অত্যন্ত ইতিবাচক কাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বিশেষ করে কারখানা স্থাপনের কারণে এলাকার অনেকের কর্মসংস্থান হওয়ায় তারা আনন্দিত। এখানে কাজ করে শ্যামল কুমার মিত্র, সুফিয়া খাতুনসহ অনেকে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা আয় করছেন। তবে মাজেদা খাতুন, সেলিনা হোসেনসহ গৃহবধূদের অনেকের সঙ্গে আলাপকালে তারা এটির দাম আরও কম হলে ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়ত বলে দাবি করেছেন।  
এ প্রসঙ্গে হুমায়ুন কবির বলেন, ঢাকায় আইটি পেশা ছেড়ে তিনি গ্রামে এসে এ কারখানা চালু করেছেন। শুরু থেকে বর্তমান অবস্থা পর্যন্ত তিনি নিজের অর্থায়নেই এগিয়ে চলেছেন। তবে তার তৈরি রুটি মেকারের দেশে-বিদেশে যে ব্যাপক চাহিদা সৃৃষ্টি হয়েছে, অর্থনৈতিক কারণে চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারছেন না। সহজ শর্তে ঋণের জন্য স্থানীয় ব্যাংকে যোগাযোগ করেছেন। কিন্তু নিজের নামে জমি না থাকায় জামানতের অভাবে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ লোন দিচ্ছে না। সহজ শর্তে ব্যাংক থেকে বা সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ কাজের বিস্তৃতি বাড়ানো সম্ভব হতো। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পাশাপাশি রুটি মেকারের দামও কমে আসত।