জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে আবারো সগৌরবে বাংলাদেশ : টানা চতুর্থবার শীর্ষ স্থান অর্জন

কাগজ প্রতিবেদক : জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিয়ে টানা চতুর্থবারের মতো আবারো শীর্ষ স্থান অর্জন করেছে বাংলাদেশ। ২০১৪ সালে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেয়া ১২৩টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক বাংলাদেশি সদস্য দায়িত্ব পালন করায় এই সাফল্য এসেছে বলে গতকাল শুক্রবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন এক বার্তায় জানিয়েছে। এতে জানানো হয়, বর্তমানে বাংলাদেশের ৯ হাজার ৪০০ শান্তিরক্ষী বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ১০টি মিশনে কর্মরত রয়েছেন।

এদিকে, জাতিসংঘের ডিপার্টমেন্ট অব পিসকিপিং অপারেশনসের ওয়েবসাইট থেকে জানা গেছে, ২০১১ সাল থেকেই এই শীর্ষ অবস্থানটি বাংলাদেশের দখলে রয়েছে। ২০১৪ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের ৯ হাজার ২৭৫ জন সদস্য শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নিয়েছেন। এর পরেই রয়েছে ভারতের অবস্থান। ভারত ৮ হাজার ১৪১ জন শান্তিরক্ষী পাঠিয়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে। ৭ হাজার ৯২৬ জন পাঠিয়ে পাকিস্তান তৃতীয় এবং ৭ হাজার ৮১০ জন পাঠিয়ে ইথিওপিয়া চতুর্থ স্থানে রয়েছে। বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের মধ্যে ১ হাজার ৩১৪ জন পুলিশ, ৭১ জন সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তা ও ৭ হাজার ৮৯০ জন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য রয়েছেন। পুলিশ ও নারী শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবেও বাংলাদেশ শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।

বার্তায় বলা হয়, বিশ্বশান্তি রক্ষা ও স্থিতিশীলতা জোরদারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় প্রত্যয় এবং জাতিসংঘের আহ্বানের প্রতি ইতিবাচক সাড়া দেয়ার কারণে এ অর্জন সম্ভব হয়েছে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশ এ পর্যন্ত বিশ্বের ৩৯টি দেশের ৫৪টি শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নিয়েছে। এসব মিশনে ১ লাখ ২৭ হাজারের বেশি সদস্য অংশ নিয়েছেন।

উল্লেখ্য, বিশ্বশান্তি রক্ষায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘ব্লু-হেলমেট’ হিসেবে সমাদৃত। বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা মানবকল্যাণে সাড়া দেয়ার পাশাপাশি বিশ্ব সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করার মতো দক্ষতা অর্জন করেছেন। জাতিসংঘ মিশনে অংশগ্রহণ থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জিত হচ্ছে। বাংলাদেশে বিশ্বমানের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট রয়েছে। বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের পেশাদারিত্ব, দক্ষতা ও নিষ্ঠা বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রশংসিত। তারা ‘মডেল শান্তিরক্ষী’ হিসেবে পরিচিতিও লাভ করেছে।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ সম্মেলনে বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও রুয়ান্ডার সঙ্গে যৌথভাবে ‘শান্তিরক্ষায় উচ্চপর্যায়ের শীর্ষ সম্মেলন’ আয়োজন করে। যেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারপ্রধানরা অংশ নিয়েছিলেন।

এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ আগামী ২০ থেকে ২২ জানুয়ারি ঢাকায় ‘সেক্রেটারি জেনারেল’স হাই লেভেল ইনডিপেনডেন্ট প্যানেল অন ইউএন পিস অপারেশনস’-এর এশীয় আঞ্চলিক কনসালটেশনের প্রথম সভা আয়োজন করছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী এবং জাতিসংঘ মহাসচিবের হাই লেভেল প্যানেল সভাপতি, নোবেল বিজয়ী এবং তিমোর লেসবের সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসে রামোস হোরটা যৌথভাবে প্যানেল সদস্যদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। ২০ জন প্যানেল সদস্যের পাশাপাশি ৩১টি দেশের প্রতিনিধিরাও এতে অংশ নেবেন। জানা গেছে, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেয়াদের মধ্যে বাংলাদেশই একমাত্র রাষ্ট্র, যার সদস্যরা সামরিক ক্ষেত্রের তিনটি দিকেই ভূমিকা রেখে চলেছেন। এগুলো হচ্ছে কোৎ দাভোয়া (আইভরি কোস্ট) ও গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে (ডিআরসি) হেলিকপ্টার সার্ভিস এবং লেবাননে একটি ফ্রিগেট পরিচালনা। কঙ্গো, দক্ষিণ সুদান ও আইভরি কোস্টের মতো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাসহ ১১টি মিশনে স্থলবাহিনীর কার্যক্রম; চারটি মিশনে (কঙ্গো, আইভরি কোস্ট, লাইবেরিয়া ও দক্ষিণ সুদান) ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাটালিয়ন এবং আইভরি কোস্ট ও লাইবেরিয়ায় দুটি ফিল্ড হাসপাতাল পরিচালনা করেছেন বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী সদস্যরা। হাইতি মিশনে শুধু নারীদের নিয়ে গড়ে তোলা পুলিশ ইউনিট মোতায়েন করতে পেরেছে বাংলাদেশ। শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নিতে গিয়ে এ পর্যন্ত শতাধিক সদস্য আত্মত্যাগ করেছেন বলে জানা গেছে।

১৯৮৯ সালে এরশাদ সরকারের আমলে ইরাক-ইরানে সামরিক পর্যবেক্ষক হিসেবে প্রথম জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সদস্য পাঠানোর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়। বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী এ মিশনে দায়িত্ব পালন করে আসছে ১৯৯৩ সাল থেকে। পরে ১৯৯৯ সাল থেকে বাংলাদেশের পুলিশ সদস্যরা এ মিশনে অংশ নেন।