বাকৃবি গবেষকদের সাফল্য

হাঁস-মুরগির রানীক্ষেত রোগের নতুন টিকা উদ্ভাবন করিয়াছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) মাইক্রোবায়োলজি ও হাইজিন বিভাগের একদল গবেষক। বাংলাদেশের বিজ্ঞান বিষয়ক গবেষণার ক্ষেত্রে ইহা একটি যুগান্তকারী সাফল্য। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে উদ্ভাবিত হইয়াছে এই টিকা। ইহাতে নেতৃত্ব দান করিয়াছেন অধ্যাপক ড. বাহানুর রহমান। দীর্ঘ তিন বত্সর গবেষণার পর এই সাফল্য আসিয়াছে। এই গবেষণায় আরও যাহারা কাজ করিয়াছেন তাহারা হইলেন ড. মারজিয়া রহমান, মোহাম্মদ ফেরদৌসুর রহমান খান, আল এমরান, লিয়াকত হোসেন, সুলতান আহমেদ, সফিউল্লাহ প্রমুখ। তাহাদেরকে আমরা উষ্ণ অভিনন্দন ও আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই।
আমরা জানি, রানীক্ষেত রোগটি হাঁস-মুরগির জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। এই রোগের ফলে খামারের শতভাগ হাঁস-মুরগি আক্রান্ত হইতে পারে। আর ইহাতে ৭০ হইতে ৮০ ভাগ হাঁস-মুরগিই মারা যায়। শুধু আমাদের দেশেই নহে, প্রতি বত্সর সারাবিশ্বে এই রোগের প্রাদুর্ভাবে লক্ষ লক্ষ হাঁস-মুরগি মারা যায়। সাধারণত এই রোগের লক্ষণ হইল- কাশি, পেশির কম্পন, ডানা ঝুলিয়া পড়া, মাথা ও ঘাড় মোচড়ানো, পক্ষাঘাত, চোখের চারিপাশের টিস্যু ফুলিয়া উঠা, সবুজাভ পাতলা পায়খানা, ডিমের খোসা পাতলা হওয়া ইত্যাদি। ইহাতে ডিমের উত্পাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়া যায় এবং বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হইতে হয়। উল্লেখ্য, এই রোগটি ১৯২৬ সালে ইন্দোনেশিয়ার জাভায় প্রথম শনাক্ত করা হয়। তবে ভারতের রানীক্ষেত নামক স্থানে ১৯২৮ সালে প্রথম এই রোগ ধরার পর দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ায় রোগটি ‘রানীক্ষেত’ নামেই অধিক পরিচিত। ইহা আসলে একটি ভাইরাসজনিত রোগ। ইহার চিকিত্সায় প্রতিষেধকই প্রধান ভরসা। প্রচলিত পদ্ধতিতে এই রোগে বিসিআরডিভি, আরডিভি, বাংলা বিসিআরডিভি টিকা ব্যবহার করা হয়। তাহার মানে রানীক্ষেতের টিকা একেবারে নাই তাহা নহে। তবে নূতন উদ্ভাবনের কার্যকারিতা বেশি। প্রচলিত প্রতিষেধক জীবিত জীবাণু দিয়া তৈরি। ফলে মিউটেশনের মাধ্যমে রোগের সংক্রমণ ঘটানোর ঝুঁকি থাকে। তবে টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে টিকা উত্পাদনে মৃত জীবাণু ব্যবহার করায় এই ঝুঁকি কমিয়া যায়। তাহাছাড়া প্রত্যন্ত অঞ্চলের পোল্ট্রি খামারে প্রচলিত টিকা বহন ও রক্ষণাবেক্ষণের সুযোগ কম। আর নূতন উদ্ভাবিত টিকা ৪ হইতে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সহজে রক্ষণাবেক্ষণ সম্ভব বলিয়া জানা যায়। এখানেই ইহার গুরুত্ব সমধিক।
সংশ্লিষ্ট গবেষকগণ আশা করিতেছেন যে, এই উদ্ভাবিত টিকার মাধ্যমে হাঁস-মুরগির চিকিত্সার ব্যয় অর্ধেকে নামিয়া আসিবে। বাঁচিবে দ্বিগুণ সময় এবং উত্পাদন ক্ষমতা বাড়িয়া যাইবে তিনগুণ। বাংলাদেশে প্রতি বত্সর এই সংক্রান্ত ২৬ কোটি ডোজ টিকার প্রয়োজন হইয়া থাকে। অথচ সরকারি-বেসরকারিভাবে উত্পাদিত হয় মাত্র ৩ কোটি ডোজ। বাকি ২৩ কোটি ডোজ আমদানি করিতে হয়। তাই এই টিকা ব্যয়সাশ্রয়ী হিসাবে মূল্যবান অবদান রাখিতে পারে। আমাদের দেশে প্রাণিজ আমিষের ঘাটতি আছে। দেশে জনসংখ্যার হার যেভাবে বাড়িতেছে তাহাতে আমিষের চাহিদা পূরণ চ্যালেঞ্জকর হইয়া পড়িয়াছে। এই টিকা এক্ষেত্রে বিপ্লব ডাকিয়া আনিতে পারে। আমরা টিস্যু কালচারের মাধ্যমে উদ্ভাবিত রানীক্ষেত রোগের এই টিকার সাফল্য কামনা করি।