বিনা টিউশন ফিতে রাতেও চলছে স্কুলে ছাত্রদের পড়া তৈরি

সালেহ টিটু, বরিশাল ব্যুরো
যেখানে নগরীর নামিদামি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো মেধাবী শিক্ষার্থীদের নিয়ে ভালো ফল করে সুনাম কুড়াচ্ছে তখন নগরীর কলেজিয়েট মাধ্যমিক বিদ্যালয় কম মেধাবীদের ভালো ফল করানোর চ্যালেঞ্জ নিয়ে রাতে পাঠদান করাচ্ছে। দিনের নিয়মিত ক্লাসের পর সন্ধ্যার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীদের নিয়ে আসা হয় স্কুলে। সেখানে চলে নিয়মিত ক্লাসে শিক্ষকদের বেঁধে দেয়া পড়া তৈরির কাজ। একটানা ৫ ঘণ্টা পড়া শেষে শিক্ষার্থীরা ফিরে যায় বাসায়। এভাবে গত চার বছর ধরে জেএসসি এবং এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ভালো ফলে বিনা টিউশন ফিতে পাঠদান করাচ্ছেন শিক্ষকরা।
নগরীর মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে যখন নীরবতা ও রাতের অন্ধকার ভর করছিল তখন ৫০ বছরে পা রাখা নগরীর বিএম কলেজ রোড এলাকার কলেজিয়েট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চলছিল বিদ্যুতের আলোয় এসএসসির ১১০ পরীক্ষার্থীর পড়াশোনা আর পড়াশোনা তদারকি করছিলেন প্রধান শিক্ষক থেকে শুরু করে সহকারী শিক্ষকরা। এভাবে গত চার বছর ধরে দিনের নিয়মিত ক্লাসের পর জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার্থীদের রাতের বেলায় স্কুলে এনে পড়াশোনার ফলে শতভাগ পাসসহ জিপিএ-৫ পেয়েছে অনেকে। ২০১৪ সালে এসএসসি পরীক্ষায় ১০২ জন অংশ নিয়ে পাস করেছে সবাই। এদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪১ জন, ‘এ’ গ্রেড ৫৫ জন ও ‘এ মাইনাস’ পেয়েছে ৬ জন। ২০১৩ সালে জেএসসি পরীক্ষায় ১৫০ জন অংশ নিয়ে পাস করেছে শতভাগ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪৩ জন, ‘এ’ গ্রেড ৮৭ জন, এ মাইনাস ১৭ জন ও বি মাইনাস ৩ জন। এছাড়া সব নামিদামি মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে পেছনে ফেলে শিক্ষা অধিদফতরের জরিপে মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ২০১৩ ও ২০১৪ সালে বরিশাল সদর উপজেলার মধ্যে দ্বিতীয় এবং বরিশাল বিভাগে ৪র্থ স্থান দখলে করে কলেজিয়েট মাধ্যমিক বিদ্যালয়।  
এখন নামিদামি বিদ্যালয়ের সঙ্গে এ বিদ্যালয়ের নামটাও যোগ হয়েছে আর ভালো ফলের কারণে প্রতিবছর সেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বাড়ছে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে স্কুলের নিয়মিত ক্লাসের পর রাতের বেলায় স্কুলেই পড়া তৈরি এবং প্রতি সপ্তাহে পরীক্ষা নিয়ে পড়া যাচাই করা। দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় পড়াশোনা করানো হয় এখানে। বাসায় কোনো লেখাপড়া নেই ওই স্কুলের জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার্থীদের। কোনো ক্লাসের বিভাগ ছাড়াই ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত এ স্কুলে শিক্ষার্থী রয়েছে ৯২৮ জন। শিক্ষার্থী বৃদ্ধির কারণে ভবন নির্মাণ এবং সেকশন দেয়ার জন্য বারবার আবেদন নিবেদন করেও কোনো সাড়া মেলেনি স্কুল কর্তৃপক্ষের।
রাতে স্কুল কক্ষে পড়া তৈরি করা একাধিক শিক্ষার্থী জানায়, বাসায় থাকলে টেলিভিশন দেখা থেকে শুরু করে বিনা কারণে পড়ার টেবিল ছেড়ে অন্য কাজে মনোনিবেশন করায় পড়াশোনার ব্যাঘাত ঘটে। তাছাড়া পড়ায় কোন সমস্যা হলে বাসায় কারো কাছ থেকে তেমন কোনো সাহায্য পাওয়া যায় না। কিন্তু রাতে স্কুলে শিক্ষকদের কাছে বসে পড়া তৈরিতে তেমন সময় অপচয় হয় না। কোনো সমস্যা হলে তাৎক্ষণিক শিক্ষকদের সাহায্য নেয়া যায়।
একাধিক অভিভাবক জানান, বাসায় থাকলে টেলিভিশন থেকে শুরু করে বন্ধু ও বান্ধবীদের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলা এবং বিভিন্ন কাজে সময় ব্যয় করে। তাছাড়া অনেক দরিদ্র শিক্ষার্থীর পক্ষে টাকা দিয়ে প্রাইভেট পড়া সম্ভব হয় না। কিন্তু রাতে শিক্ষকদের সান্নিধ্যে থেকে পড়া তৈরিকালে অন্য কাজে সময় দেয়ার সুযোগ পায় না সন্তানরা। একইভাবে বিনা টাকায় দরিদ্র শিক্ষার্থীরাও শিক্ষকদের সাহায্যে পড়া তৈরি করতে পারছে।
সহকারী শিক্ষকরা জানান, অভিভাবকরা ব্যস্ত থাকায় সময় দিতে না পারায় সন্তানরা লেখাপড়ার গতি হারিয়ে ফেলে। যার ফলে পরীক্ষার ফল খারাপ হয়। এ কারণে বোর্ড পরীক্ষার পূর্বে জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার্থীদের রাতে স্কুলে এনে পড়া তৈরি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।  
কলেজিয়েট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক তোফায়েল আহমেদ জানান, নগরীর নামিদামি স্কুলে ভর্তির পর যারা অবশিষ্ট থাকে তারা কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হয়। ভর্তিকৃত অমেধাবীদের মেধাবী করে গড়ে তুলতেই বোর্ড পরীক্ষায় অংশ নেয়ার পূর্বে রাতে স্কুল কক্ষে পড়ার ব্যবস্থা করেছি, সফলতাও পাচ্ছি। তিনি বলেন, অমেধাবী বলতে কিছু নেই। সব শিক্ষার্থীর মধ্যে মেধা রয়েছে এর জন্য সময় দিতে হবে।
রাতে পড়া তৈরিতে কলেজিয়েট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভালো ফলের বিষয়টি স্বীকার করে মাধ্যমিক উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর উপ-পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, এভাবে অন্য বিদ্যালয়েরও উচিত শিক্ষার্থীদের পাঠদানে অতিরিক্ত ক্লাস নেয়া। তাহলে সব বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভালো ফল করতে পারবে।